এবার ভারতে হানা নরোভাইরাসের! কতটা ভয়াবহ এই ভাইরাস, কীভাবে সংক্রমণ?

নরোভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর শারীরিক অবস্থা যদি খুব খারাপ না হয়, সেক্ষেত্রে বাড়িতেই শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের চিকিৎসা করা যায়।

Madhurima Pattanayak
৪ মিনিট
এবার ভারতে হানা নরোভাইরাসের! কতটা ভয়াবহ এই ভাইরাস, কীভাবে সংক্রমণ?

৫ জুন কেরলের তিরুবনন্তপুরমে দুই শিশু নরোভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। নরোভাইরাসে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ডায়েরিয়া-সৃষ্টিকারী রোটাভাইরাসের মতো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য, দু'টি ভাইরাস আলাদা হলেও, পৃথিবীজুড়ে শিশুদের মধ্যে গ্যাস্ট্রোএনটেরাইটিসের অন্যতম কারণ এই দু'টি ভাইরাস। গ্যাস্ট্রোএনটেরাইটিস হলে ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রদাহ হয়, যার ফলস্বরূপ পেটে ব্যথা ও ডায়েরিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

সারা পৃথিবীতে, বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলিতে ডায়েরিয়া শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ। রোটাভাইরাসের তুলনায় নরোভাইরাস কম ক্ষতিকর এবং তুলনামূলকভাবে হাসপাতালে ভর্তির হার নরোভাইরাসের ক্ষেত্রে কম হলেও, প্রতি বছর সারা বিশ্বে ৬৮৫ মিলিয়ন মানুষ নরোভাইরাসে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় দুই লাখ মানুষ মারা যান।

২০১৬ সালে ভেলোর ক্রিশ্চান কলেজের গবেষিকা গগনদীপ কংগ-এর তত্ত্বাবধানে PLOS One জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় জানা যাচ্ছে, দক্ষিণ ভারতে শিশুদের মধ্যে গ্যাস্ট্রোএনটেরাইটিসের একটি অন্যতম কারণ হলো নরোভাইরাস। দক্ষিণ ভারতে এই রোগের প্রকোপ কম হলেও, শিশুদের মধ্যে এই রোগে একাধিকবার সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে।

নরোভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ কী কী?

শিশু ছাড়াও নরোভাইরাসে যে কোনও বয়সের মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের তরফ থেকে জানা যাচ্ছে, নরোভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই সাধারণত রোগের লক্ষণগুলো দেখা যায়।

ডায়েরিয়া ও পেটে ব্যথা ছাড়াও নরোভাইরাসের অন্যতম লক্ষণ হল বমি, মাথা যন্ত্রণা, শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা, জ্বর হওয়া ইত্যাদি। নরোভাইরাস-সংক্রমিত কোনও রোগীর সংস্পর্শে এলে, তার শরীরের কোনও অংশে লেগে থাকা ভাইরাস থেকেও সংক্রমণ হতে পারে। তার মানে কিন্তু এই নয়, এটি ছোঁয়াচে রোগ।

নরোভাইরাস সংক্রমণের ফলে বারেবারে বমি ও মলত্যাগের ফলে শরীরে ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য (Electrolyte balance) ব্যহত হয়ে ডিহাইড্রেশন দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে ইলেকট্রোলাইট সলিউশন, যেমন ORS, স্যালাইন ইত্যাদি প্রয়োগ করা প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি ডিহাইড্রেশন রুখতে প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে জল ও ফলের রস পান করা।

কীভাবে ছড়ায় নরোভাইরাস?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মানসিক চাপ, অভ্যেস... কীভাবে ছাড়বেন ধূমপান?

যাঁরা ধূমপান করেন, তাঁদের দিকে আঙুল না তুলে, আসুন না, আমরা সবাই মিলে তাঁদের মনটা একটু জানার চেষ্টা করি‌।

কেরলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভিনা জর্জ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নরোভাইরাস খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর সংক্রমণ রুখতে গেলে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

এই ভাইরাস মূলত সংক্রমিত হয় জল এবং খাবার থেকে। তাই এদের জলবাহী (Waterborne) ও খাদ্যবাহী (Foodborne) ভাইরাস বলে। স্বাভাবিকভাবেই সঠিক স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চললে, নরোভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়বে। তবে জল ও খাবার ছাড়াও, কোনও বস্তুর পৃষ্ঠতল থেকেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে (Surface contamination)। অর্থাৎ, নরোভাইরাস উপস্থিত যেখানে, সেইরকম কোনও জিনিসে হাত দেওয়ার পর, সেই হাত যদি মুখে যায়, সেক্ষেত্রেও সংক্রমণের সম্ভাবনা প্রবল।

জানা যাচ্ছে, কেরলের এই দুই শিশুর অবস্থা এখন স্থিতিশীল। তাদের নরোভাইরাস সংক্রমণের কারণ হিসেবে অস্বাস্থ্যকর খাবারই দায়ী, এমনই জানা গেছে একটি সরকারি গবেষণাগার থেকে খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করে দেখার পর। সেই খাবার এই শিশুদু'টি স্কুলেই খেয়েছিল বলে জানানো হচ্ছে গবেষণাগারটির তরফ থেকে।

নরোভাইরাস কত প্রকার ও কী কী?

২০১৩ সালে নেদারল্যান্ডের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ পাব্লিক হেলথ অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্ট-এর (National Institute of Public Health and the Environment) প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, জিনগত গঠনের পার্থক্যের জন্য নরোভাইরাসকে কতগুলি গোষ্ঠী বা গ্রুপে ভাগ করা যায়। জিনের গঠনের তারতম্যের জন্যই এই গোষ্ঠীগুলিকে জেনোগ্রুপ (Genogroup) বলা হয়। নরোভাইরাসকে পাঁচটি জেনোগ্রুপে ভাগ করা যায়। এগুলি হলো জেনোগ্রুপ I (G I), G II, G III, G IV, এবং G V।

বিশ্বজুড়ে, এদের মধ্যে সব থেকে বেশি আধিক্য দেখা যায় G II-এর, আর তারপরেই G III -এর। তবে কেরলের এই দুই শিশু নরোভাইরাসের কোন জেনোগ্রুপে আক্রান্ত, তা এখনও জানা যায়নি।

নরোভাইরাস প্রতিরোধের জন্যে কী কী করণীয়?

কেরলের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতে, নরোভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ করা যেতে পারে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজি়জ় কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (Centre for Disease Control and Prevention) বা সিডিসি-র (CDC) তরফ থেকে জানা যাচ্ছে, নরোভাইরাস প্রতিরোধ করার জন্য সবার আগে প্রয়োজন, হাত ঘনঘন পরিষ্কার করা এবং পরিশ্রুত পানীয় জল বা অন্তত ফোটানো জল গ্রহণ করা। ফল এবং সবজি পরিশ্রুত জলে ধুয়ে তবেই খাওয়া প্রয়োজন।

এর পাশাপাশি শৌচালয় ব্যবহার করার পর ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে। যেহেতু এটি জলবাহিত রোগ, বাড়িতে নরোভাইরাসে আক্রান্ত রোগী থাকলে, শৌচালয় পরিষ্কার রাখা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়।

নরোভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে, অন্তত দুই দিন বাড়িতে বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। এবং সংক্রমিত ব্যক্তি যাতে কোনওমতেই অন্যের জন্য খাবার না তৈরি করেন, সেই দিকে নজর রাখা।

নরোভাইরাসে সংক্রমিত হলে কী চিকিৎসার প্রয়োজন?

ব্রিটেনের ন্যাশাল হেলথ সার্ভিসের (National Health Service or NHS) তরফ থেকে জানা যাচ্ছে, নরোভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর শারীরিক অবস্থা যদি খুব খারাপ না হয়, সেক্ষেত্রে বাড়িতেই শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের চিকিৎসা করা যায়। তার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে জল, ফলের রস, ইলেক্ট্রোলাইট সলিউশন পান করা।

তবে শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। অবস্থার অবনতি ঘটতে শুরু করলে, যত দ্রুত সম্ভব নিকটবর্তী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে রোগীকে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

সাধারণত দুই থেকে তিনদিনের মধ্যেই নরোভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।