জঙ্গলমহল আগলে রাখত মালতী-সরস্বতীরা

Ladly Mukhopadhaya
৪ মিনিট
জঙ্গলমহল আগলে রাখত মালতী-সরস্বতীরা

স্মৃতি সবসময়ই ব্যক্তিজীবনের প্রলাপ নয়। তা কখনও কখনও ইতিহাসের প্রচ্ছায়ায় ও সমাজ-সংকীর্তনের ধারায় বিস্তৃতি পায়। পুরনোকে নতুন করে পাওয়ার এক গলিপথও বলা যায়। তেমনই কোনও বাঁকের মুখে ফেলে আসা দিন-রাত্রি, কাজ-কাম, বোঝাপড়া আর দেখাশোনার মধ্য দিয়ে খণ্ড জীবনের ছেঁড়া পাতা কিংবা নষ্ট ফ্রেমের কথা মনে পড়ে। যা শুধু ব্যক্তিগত স্মরণ নয়। তা একটা আস্ত সংগ্রাম-সাধনা আর সমাজ-বাস্তবতার মিলিত ক্ষেত্রফল। তার ডাকনাম আমরা স্মৃতি থেকে ইতিহাস, যা খুশি দিতে পারি। আসল উপজীব্য হলো, সেই কথা-ছবি-লেখা কোনও নির্দিষ্ট অবস্থার দিকনির্দেশন করতে পারছে কি না। সেটাই, সেটাই আদতে কথা।

হয়তো কিছুটা বেফিকির দার্শনিকতার মুদ্রাদোষে ভারী শব্দ আর জটিল বাক্যবিন্যাসে খানিকটা দুরূহ মনে হতে পারে। কিন্তু না, এভাবে ছাড়া শুরু করা যাচ্ছিল না বলেই এমত লেখা। আসলে, একটা গল্প বা ঘটনা প্রকাশ করতে গেলে একটা ভাবনার প্রেক্ষাপট চাই। আর তা লঘু হলে চলবে কেন? তাই এই গুরুত্বপূর্ণ লেখার শুরু হবে অনন্যসাধারণ এক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে। তিনি বিনয়কৃষ্ণ চৌধুরী। একজন গান্ধীবাদি স্বাধীনতাসংগ্রামী। যিনি পরবর্তীতে কমিউনিস্ট রাজনীতিতে দীক্ষিত হবেন, হবেন পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বিশিষ্ট মন্ত্রী।

পারিবারিক সূত্রেই বিনয়বাবুর সঙ্গে আলাপ-পরিচয় ছিল। ছোটবেলা থেকেই তার গল্প শুনেছি। সমাজবিজ্ঞাননির্ভর তার বৌদ্ধিক ভাবনাচিন্তার আমি ছিলাম ভক্ত, অনুরক্ত। মিডিয়ায় কাজ করার সুবাদে পরবর্তীকালেও তার সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। প্রায়শই দেখাসাক্ষাৎ হত। তাঁর অসাধারণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণের আমি ছিলাম গুণমুগ্ধ শ্রোতা। পশ্চিমবঙ্গের ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা, পার্টি লাইনের বিরুদ্ধে না গিয়েও অকপট থাকা, আর অতি-সাধারণ জীবনযাপন আমাকে মুগ্ধ করেছিল। এরকম অসংখ্য গুণাগুণের অধিকারী এক ক্রান্তিপ্রিয় মানুষ ছিলেন বিনয়কৃষ্ণ চৌধুরী, সেসব আর বিশদে লিখতে চাই না।

তা আমার সেসময় মনে হলো, একটা ছবি করব বিনয়বাবুর ওপর। ততদিনে তিনি 'বিনয়দা' হয়ে উঠেছেন আমার কাছে। অকুতোভয় আমি, প্রস্তাবটা একদিন পেড়েই ফেললাম। বিনয়দা শুনে বললেন, "তা কখনও হয় না কি? আমাদের পার্টিতে এসব হয় না।"

আমি খানিকটা ঢোক গিলে বলার চেষ্টা করলাম, বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের মৃত ও জীবিত নেতাদের নিয়ে যত ছবি হয়েছে... আমার কথায় বিন্দুমাত্র আমল না দিয়ে বললেন, "ওঁরা নেতা, পথিকৃৎ। আমরা কর্মী। পার্টির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। যা করছি, তা দলেরই দেওয়া কাজ।"

আমি খানিকটা হতোদ্যম! ও প্রশ্নে আর যাওয়াই যাচ্ছে না। কিন্তু না, উনিই প্রশ্ন করলেন, অমুক দিন কী করছি?

বললাম, তেমন কিছু না। বিনয়দা বললেন, বাঁকুড়ার ঝিলিমিলিতে চলে এসো। আমি তোমাকে সিনেমার গল্প দেখাব।

আর বেশি কথা হয়নি। কিন্তু নির্ধারিত দিনে পৌঁছে গেছি ঝিলিমিলি। বিনয়দা আগেই পৌঁছেছেন। দেখি, একজনের দাওয়ায় বসে লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে মিটিং করছেন। সামনে রয়েছে ধামায় ভরা মুড়ি এবং নারকেল। আমি পৌঁছতে সেখানেই বসতে বললেন। বললেন, "মিটিংটা সেরে নিয়ে তোমার সাথে কথা বলব। মিটিংটা শোনো, তোমার কাজে লাগবে।"

সেখানেই আমি শনাক্ত করি দু'জন নেত্রীকে। তাঁদের কথায় আসছি। এই মিটিংয়ে দেখলাম, সমস্ত মহিলা মন্ত্রীকে তুই বলছে আর একই সম্বোধনে মন্ত্রীও কথা বলে চলেছেন। তা সে মিটিং শেষ হলো। এবার বিনয়দা আমাকে সিনেমার গল্প দেখাতে চেয়ে শুরু করলেন তাঁর কথা।

সেই দীর্ঘ কথালাপের পুঙ্খানুপুঙ্খ আজ আর সবটা মনে পড়ে না। কিন্তু বিনয়দার গল্প আসলে ওই মিটিং থেকে উঠে আসা ওই মহিলাদের গল্প, লড়াইয়ের গল্প। আজ এরা অনেকটাই ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু এমন দিন ছিল না তখন। এখানকার আদিবাসীদের পেটের দায়ে অপেক্ষাকৃত ধনী জেলাগুলিতে নামাল খাটতে যেতে হত চাষের মরশুমে। সেখানে উদয়াস্ত খেটে পেত এক খালি (ছোট বাটি) চাল, সামান্য তেল আর এক টাকা পঁচিশ পয়সা নগদ। বাড়িতে বাচ্চাকাচ্চাদের ঘরে রেখে দরজার সামনে কাঁটা দিয়ে যেত নামাল খাটতে। ফিরে এসে সবাইকে জীবিত দেখত না। কিন্তু যেত, ফি বছর যেত।

এই গ্রামের দুই লড়াকু মহিলার নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম-সাধনায় তা বন্ধ হয়েছে।

মালতী আর সরস্বতী এখানেই থেমে থাকেননি।

তাঁরা মহিলাদের জঙ্গল রক্ষীবাহিনী তৈরি করেন। নিজেদের সংগঠনের উদ্যোগে বাবুই দড়ি ও শালপাতা থালাবাটি তৈরি করে শহর অবধি তা পৌঁছে দেন। সেসময় তাঁরা গ্রামীণ মহিলাদের জন্য নানা ধরনের মডেল প্রকল্প তৈরি করেছিলেন। যার ফলে মালতী আর সরস্বতী ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিও-তে ডাক পান। ডাক পান আমেরিকা ও ইউরোপের নানা দেশ থেকে, ওঁদের কর্মকীর্তির অভিজ্ঞতা শোনাতে। মোটামুটি এরকম একটা সাফল্যের কাহিনির প্রেক্ষাপটে এক কঠিন বাস্তবের টাঁড় মাটিতে বিনয়দা আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। বিনয়দা তাঁর গল্প উপস্থাপন করলেন সেইসব মহিলাদের উপস্থিতিতে, তাঁদেরই সঙ্গে গল্প করতে করতে। আমাকে গল্প দেখালেন।

একটা সময় বিনয়দা সরাসরি বললেন, "এদের ওপর ছবি করো। সর্বত্র দেখাও। তবেই তো এই পৃথিবীর নানা প্রান্তে থাকা প্রান্তিক মানুষ জানতে পারবে, বুঝতে পারবে, কাকে বলে লড়াই, কাকে বলে দিকনির্দেশ। সত্যি বলছি, বিনয়দার সেই তাৎপর্যপূর্ণ সীমিত বক্তব্যে মনে হলো, এখনই কিছু একটা করে ফেলতে হবে।"

না, সঙ্গে সঙ্গে পারিনি। কিন্তু দীর্ঘদিন ওঁদের সঙ্গ করে পরবর্তী সময় দু-দুটো ছবি করেছিলাম। একটি তথ্যচিত্র, আরেকটি কাহিনিনির্ভর।

দু'টি ছবিরই নাম ছিল 'দুই কন্যা'!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, বেঁচে থাকবে এই দুর্গশহর?

হঠাৎ মেলানিয়া কফি নিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বলে , "তুমি কি জানো, স্টিভেন স্পিলবার্গ দিনসতেরো এই পুইভার্টে রেকি করে তারপর এগারো দিন লোকেশন শুটিং করেছিলেন?"

যাযাবর, অচ্ছুৎ, 'আধা-বেশ্যা'! যেভাবে বাঁচে রাজস্থানের কালবেলিয়ারা

একদিন হয়তো প্রকৃত সমাদর পাবে এই ভেবে নিজেদের প্রস্তুত রাখছে কালবেলিয়ারা।

এই শহরের গোপন গুহা থেকেই লড়াই শুরু স্পার্টাকাসের

রোমান শাসকদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে বিদ্রোহী দাসেরা ও পরে খ্রিস্টানরা এইসব গুহায় লুকিয়ে থাকত।

'বড্ড গরম, হিমালয়ে যাই', বলেই চিরতরে নিরুদ্দেশ হলেন সেই বাউল

এমন বহু বাউল-ফকিরের সঙ্গে দেখা হয়েছে, যাঁরা গান করেন না, ছবি আঁকেন কিংবা পদ লেখেন বা কিছুই করেন না সেভাবে, তাঁরা শুধুই তত্ত্বসাধনায় মশগুল।

উপাস্য দেবতা 'কালী', সাহেবদের চোখে চোর হয়েও যেভাবে বাঁচে জিপসিরা

জিপসিদের আদি খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে যে, কোনও এক সময় দক্ষিণ এশিয়া থেকে এই যাযাবর সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকায় ভ্রাম্যমান হয়।

ধর্মে মুসলমান, কণ্ঠে শিবের গীত, রাজস্থানের আশ্চর্য জাতি মাঙ্গানিয়ার

পশ্চিম রাজস্থানের মরুপ্রান্তরে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা বারমের ও জয়সলমিরের নানা স্থানে মাঙ্গানিয়ার লোকশিল্পীদের এক একটা গ্রাম। সেখানে তাদের গান ও জীবনযাপন ছিল আমাদের কাজের উপজীব্য বিষয়।

বইমেলা থেকে নিষিদ্ধপল্লি- সব একাকার ছিল কলেজস্ট্রিটের এই আড্ডায়

আমার দেখা অপরাজেয় আড্ডাধারী ছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু ওপরে যত লেখক-শিল্পীদের নাম লিখেছি, তার অধিকাংশই সন্দীপনদাকে অপছন্দ করতেন। তিনি ছিলেন স্বভাব-রসিক। একবার অরূপরতন সম্পর্কে আমায় বলেছিলেন যে, 'আচ্ছা বলো তো, অরূপ তারকোভস্কির মতো গল্প লেখে কিন্তু সুখেন দাশের মতো ছবি করে কি করে?'

পৃথিবীর প্রাচীনতম ফ্লাইওভার এই শহরে, ভবঘুরের ঠিকানা ফ্লোরেন্স

ভাসারির দু'পাশ সারারাত মাতিয়ে রাখে নাম না-জানা মিউজিসিয়ান, কোনও অন্ধ বাদ্যযন্ত্রী আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গানবাজনার দল। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার এই শহরে কিন্তু অসংখ্য ভবঘুরের যাতায়াত।