পান্তা ভাত

By: Amit Patihar

September 22, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

কথায় আছে বারো মাসে তেরো পার্বণ, বাঙালির হুজুগ বেশি, উৎসব বেশি এবং সেই উৎসবের উদযাপনও যথারীতি বেশি। এরই মধ্যে দুটি উৎসব এমন রয়েছে যাতে আমাদের পরম প্রিয় পান্তা ভাত পরিবেশন করাটাই প্রাচীন সময় থেকে বাঙালির উৎসবমুখর জীবনকে আলাদা স্বাদ যোগ করে দিয়েছে। তার একটি হল পয়লা বৈশাখ, অন্যটি রান্না পুজো। ঐতিহাসিক তপন কুমার সান্যাল একবার লিখেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ দিনে একবার রান্না করতেন, সেই থেকে পান্তা ভাতের প্রচলন শুরু হয়েছিল। মোঘলদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যখন সারাদিন ধরে নাচ, গান বা অন্যান্য আয়োজন থাকতো তখন পান্তা ভাত পরিবেশন করা হতো রাজদরবারের সদস্যদের সামনে। ১৭ শতাব্দীতে ফ্রে সাবাস্টিয়ান ম্যানরিক বাংলা ভ্রমণে এসে লিখেছিলেন, সেই সময় অধিকাংশ বাংলার মানুষ ভাত খেতে ভালবাসতেন, যার মধ্যে অনেক সময়ই তারা পান্তা ভাত, লেবু, কাঁচা লঙ্কা, পেঁয়াজ সহযোগে খেতেন। পান্তা ভাত শুধু বাংলায় নয় , একইরকম ভাবে জনপ্রিয় আসাম, ত্রিপুরা, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, তামিলনাড়ু এবং সম্পূর্ন বাংলাদেশে। ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্রিশগড়ে যেখানে দই দিয়ে বেশিরভাগ সময় পান্তা তৈরি করা হয় বলে একে পখালা, পখল, পখালো বা পখল ভাত বলা হয়, তামিলনাড়ুতে আবার এই পান্তা ভাতকেই বলা হয় পাজেধু সাধাম। আবার চিনে ঠিক পান্তা ভাতের সমগোত্রীয় খাবারকে জিউনিয়াং বলা হয়। ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চার ইনস্টিটিউটের ভাত বিশেষজ্ঞ মেহবুব হোসেইন বলেন, অতীতে যারা ক্ষেতে কাজ করতেন তারা ব্রাউন রাইস বেশি ব্যবহার করতেন যা পান্তা ভাত খাওয়ার উপযোগী, তার ওপর এর জৈব মূল্য বা নিউট্রিশন ভ্যালু তুলনামূলক ভাবে বেশি। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ১০০ গ্রাম ভাতে ১২ ঘণ্টার জল ঢেলে রাখার পর যখন পান্তায় পরিণত হয়, তাতে আনুমানিক ৭৩ মিলিগ্রাম আয়রন, ৩০০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ১৫০০ মিলিগ্রামের ওপরে পটাশিয়াম এবং ক্যালসিয়াম থাকে। পান্তা ভাত গরম কালে শরীরে জলের অভাব দূর করে এবং শারীরিক তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। পান্তা ভাত পেটের রোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

পান্তা ভাত

চিত্রঋণ : Google

এবার আসি কিছু মজাদার তথ্যে, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে এটি পয়লা বৈশাখ উৎসবের একটি অংশ।  সাধারণত পান্তা ভাত সকালে পরিবেশন করা হয় এবং জায়গা বিশেষে পান্তা ভাতের সাথে বিভিন্ন রকম খাওয়ার পরিবেশন করার চল আছে। বাঙালিদের মধ্যে এটি রান্না পুজোর সময়ও খাওয়া হয়।  রান্না পুজোর সময় মনসা দেবীর কাছে ভাজা শাকসব্জী, চালতার চাটনি, তেল পোড়া লঙ্কা এবং ইলিশ ভাজার সঙ্গে সাজিয়ে দেওয়া হয়। দুর্গাপুজোয় বিজয়াদশমীর দিন দেবী দুর্গার জন্য পান্তা ভাত বরাদ্দ হয়, কথায় বলে দেবী দুর্গা ঘরের মেয়ে, তার যাওয়ার আগের দিন ঘরের মা, বাবা দুঃখে বিহ্বল হয়ে পড়েন, তাই তাদের আর রান্না করা হয় না। তাই বিদায়ের সময় মেয়ে পান্তা ভাত খেয়ে এতটা পথ ফিরে যান। তাতে শারীরিক সমস্যাও এড়িয়ে যাওয়া যায়। আবার অনেকে বলেন, মহাদেব শ্মশানে থাকেন, তাই তার ছেলে মেয়ে বাড়ি ফিরে যাতে বিলাসবহুল খাওয়া দাওয়ার গল্প না করে তাই তাদের পান্তা ভাত পরিবেশন করা হয়। আসামে দুধ পান্তা পরিবেশন বৈবাহিক অনুষ্ঠানের একটি অংশ। উত্তর-পূর্ব ভারতে কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন যে পান্তা ভাত খেলে বাঘের অনুরূপ শক্তি পাওয়া যায়। পান্তা ভাত বাংলাদেশের মানুষদের মধ্যেও একই রকম ভাবে জনপ্রিয় কারণ এটি সহজেই কেবল নুন দিয়ে বা পেঁয়াজ বা ভাজা বা কাঁচা লঙ্কার সাথে খাওয়া যায়, অন্য কিছুই প্রয়োজন হয় না। বাংলাদেশের অনেক অনুষ্ঠানে পান্তা ভাত ইলিশ মাছের সাথে পরিবেশন করা হয়, ২০১৪ সালে এমনই এক পয়লা বৈশাখের দিন পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা পান্তা ইলিশ পরিবেশন না করার কারণে কলেজ চত্বরে বচসা করেছিলেন। এরপর ২০১৬ সাল থেকে পয়লা বৈশাখ অনুষ্ঠানের সময় ইলিশ মাছ ধরা সম্পূর্ণরূপে বেআইনি ঘোষণা করেন বাংলাদেশ সরকার, এবং সরকারি মাধ্যমে এই সময় ইলিশ মাছ ছাড়াই পান্তা ভাত খাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। নদিয়ার কৃষ্ণনগরে, এনএইচ ৩৪ এর বেশিরভাগ রেস্তোঁরাগুলিতে গরম কালে কাসুন্দি, সরষার তেল, কাঁচা লঙ্কা, কাটা পেঁয়াজ, আলুর ভর্তা, বেগুন ভর্তা, আলুর চোখা, আলু ঝুরি ভাজা, আমের চাটনি, টক দই এবং মিষ্টি পান রেস্তোরাঁর মেনু তে যোগ করা হয়। ওড়িশায় বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পান্তা ভাতকে ঈশ্বরের জন্য তুলে রাখা হয়। ওড়িশার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় পান্তা ভাতের সাথে কুমড়ো ফুলের বড়া, দই এছাড়া পেঁয়াজি, বিভিন্ন ভাজা, নিরামিষ তরকারি সহযোগে পরিবেশন করা হয়। হায়দ্রাবাদের বাঙালি মালিকানাধীন একটি রেস্তোরাঁয়  সারা বছর পান্তা ভাত পরিবেশন করা হয়।

এবার আসি আরও একটি মজাদার তথ্যে, সম্প্রতি কিশ্বর চৌধুরী নামের একজন মহিলা অস্ট্রেলিয়ান মাস্টারসেফে অংশগ্রহণ করেন, এবং ফাইনালের দিন তিনি সারা পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে পান্তা ভাত তৈরি করেন। এই অনুষ্ঠানে পান্তা কে গরীব মানুষের খাবার হিসেবে তুলে ধরেন কিশ্বর, এবং খুব সাধারণ ভাবে শুধু মাত্র আলু সেদ্ধ মাখা এবং সার্ডিন মাছ ভাজার সাথে উপস্থাপন করেন। কিশ্বর এই অনুষ্ঠানে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। অতএব যতই নুন আনতে, পান্তা ফুরিয়ে যাক, পান্তা ভাতের গুরুত্ব এবং জনপ্রিয়তা কিন্তু ফুরোনোর নয়। বাঙালি, ওড়িয়া, তামিল বা অসমীয়া মানুষ আবার যেকোনও গরমের দুপুরে পান্তা নিয়ে বসে পড়বেন। শুধু বদলে যাবে সাইড ডিস।

 

তথ্য সূত্র :

  • https://en.m.wikipedia.org/wiki/Panta_bhat
  • https://www.google.com/amp/s/www.thehindu.com/life-and-style/food/panta-bhaat-fermented-rice-dish-masterchef-australia-recipe-combinations/article35319214.ece/amp/
  • https://www.bongodorshon.com/home/story_detail/story-of-pantavat

More Articles

error: Content is protected !!