যৌনতার সঙ্গে নিবিড় যোগ! জানেন, কেন তৈরি হয়েছিল স্টিলেটো?

History of Stiletto: ব্লক হিল এবং প্ল্যাটফর্ম হিল গ্রিকদের সময় থেকেই পরা হতো কিন্তু পাতলা স্টিলেটো বিশ শতকের আবিষ্কার।

Madhurima Dutta
৩ মিনিট
যৌনতার সঙ্গে নিবিড় যোগ! জানেন, কেন তৈরি হয়েছিল স্টিলেটো?

হাঁটা চলা হবে সহজ গতিতে। ফলে পায়ের উপর কোনও চাপ পড়া চলবে না। দৌড়ে বাস ধরো, গুঁতোগুঁতি করে মেট্রো চাপো, সাততলা সিঁড়ি ভাঙো! জুতো যদি মানানসই না হয়, হোঁচট খেয়ে, মুখ থুবড়ে দফা রফা। এত কিছু সত্ত্বেও মহিলাদের হিলপ্রেম কমে না। ফ্ল্যাট হিল না হয় তাও শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখল, তাবলে স্টিলেটো? ওরম পেনসিলের মতো সূঁচালো হিল পরে কীভাবে সম্ভব হাঁটাচলা? কীভাবেই বা সারা শরীরের ভার ধরা থাকবে ওই সরু কাঠির উপর? চল্লিশের দশকের শেষের দিকে এবং পঞ্চাশের দশকের শুরুতে জুতোশিল্পে প্রযুক্তিগত উন্নতির ফল এই স্টিলেটো। তারপর থেকে স্টিলেটো হয়ে উঠল মহিলাদের ফ্যাশনের এক অঙ্গ। আসলে যৌনতা ও নারী- বিষয়টি পালে হাওয়া পেল নানাভাবেই। সত্তরের দশকে চারদিকে কঠিন সমালোচনার মুখে পড়ল স্টিলেটো, মহিলাদের স্বাভাবিক চলাফেরার ক্ষমতাকে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠল এই জুতোর বিরুদ্ধে। আশির দশকে সেই স্টিলেটোই হয়ে উঠল নির্দিষ্ট গোত্রের কর্মজীবী মহিলাদের ব্যক্তিত্বের অংশ। তারপর থেকে স্টিলেটোকে আর ফ্যাশনের অংশ থেকে আলাদা করা যায়নি কখনই।

স্টিলেটো পরতেন পুরুষরা

উঁচু জুতো মানেই তা ঐতিহ্যগতভাবে আভিজাত্য, ক্ষমতা এবং সম্পদের প্রতীক। ১৬ শতকে ভেনিসের বড়লোক মহিলারা তাদের স্কার্টে যাতে কাদা না লাগে, সেই জন্য উঁচু জুতো পরতেন। ১৭ শতকে পশ্চিম এশিয়ায় ঘোড়ার পিঠে যুদ্ধরত সৈন্যরা হিল পরতেন যাতে তাদের পা নিরাপদ থাকে। ১৮ শতকে, ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুই তাঁর কর্তৃত্বের প্রতীক হিসাবে লাল হিল পরতেন। ১৮ শতকের শেষ অবধি লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই হিল পরতেন। তারপর থেকে ধীরে ধীরে মহিলাদের সৌন্দর্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায় হিল বিষয়টি। পুরুষদের ক্ষেত্রে যেহেতু 'সৌন্দর্য' বিষয়টি তত গুরুত্বই পায়নি কখনও তাই ফ্যাশন বিষয়টি হয়ে ওঠে মহিলাদের একান্ত নিজস্ব। হিল ক্রমেই আরও উঁচু হয়ে ওঠে। মহিলারাও নিজেকে যৌনভাবে আকর্ষণীয় প্রমাণের দায় এড়াতে পারেন না কিছুতেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিড়ালের চোখ হয়ে উঠল চশমা! যেভাবে জন্ম নিল ক্যাট আই গ্লাসেস

Cat Eye Glasses History: শিনাসির নকশা দেখে নাক সিঁটকোলেন অনেকেই। বিশ্ববিখ্যাত সব চশমা নির্মাতারা (যেমন রে ব্যান) এই নকশার চশমা বানাতেই চাইলেন না।

ক্ষুরধার হিলের জন্ম

ব্লক হিল এবং প্ল্যাটফর্ম হিল গ্রিকদের সময় থেকেই পরা হতো কিন্তু পাতলা স্টিলেটো বিশ শতকের আবিষ্কার। সূঁচালো এই স্টিলেটো নামটি আসে একটি ইতালিয় ছুরির নাম থেকে। ১৯৫০-এর দশকে বিমানবাহী জাহাজের নতুন উপকরণ এবং কৌশলগুলি জুতো নির্মাণেও প্রয়োগ করা হয়, তখন এই হিলের জন্ম। ধাতু এবং প্লাস্টিককে মেশানো হলো। ছাঁচনির্মাণ করে হিলকে লম্বা করা হলো আরও। উদ্দেশ্য ছিল পায়ের পাতাটিকে ধরে রাখার উপায় খুঁজে বের করা, পায়ের আঙ্গুল এবং গোড়ালি থেকে চাপ সরিয়ে নেওয়া।

স্টিলেটো সাধারণত এক থেকে পাঁচ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। ডিজাইনার সালভাতোর ফেরগামো, রজার ভিভিয়ের এবং আন্দ্রে পেরুগিয়া স্টিলেটো উদ্ভাবনের নেপথ্যে রয়েছেন। কিন্তু স্রষ্টার সৃষ্টিকে বাজারখ্যাত করলেন নায়িকারাই। ১৯৫০-এর দশকে, মেরিলিন মনরো চার ইঞ্চি ফেরাগামো স্টিলেটো পরে যে মোহময়ী চলনকে তুলে ধরলেন, তারপর থেকেই স্টিলেটোর খ্যাতিকে রোখা দায়! হলিউডের সিনেমায় একের পর এক নায়িকা বেছে নিলেন স্টিলেটোকে। সেলিব্রিটি ফ্যাশনে জুড়ে গেল হাই হিল! আসলে স্টিলেটো জুড়ে গেল মহিলাদের শরীরি আকর্ষণের সঙ্গে। মহিলাদের দেহসৌন্দর্যকে আরও গুছিয়ে সাজিয়ে দিল এই জুতো। স্টিলেটো পা-কে লম্বা করে এবং বুকের অংশকে সামনের দিকে এবং নিতম্বের ভারকে আরও পিছনের দিকে ঠেলে ভারসাম্য রাখে, যাতে মহিলাদের শরীরের নানা ভাঁজ আরও স্পষ্ট হয়। এই হিল পরে বড় বড় পা ফেলা সম্ভব না। ছোট পদক্ষেপে আরও মোহময়ী হলেন মহিলারা। গতি কমল, কিন্তু পুরুষদের মতিকে নিজের দেহের দিকে টানা গেল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ছিল ধনীদের বিলাস! কীভাবে মধ্যবিত্ত মহিলাদের 'জাতীয় পোশাক' হয়ে উঠল নাইটি?

Evolution of Nightie: বেবিডল তো আর আপামর জনজাতির চাহিদা নয়, চাহিদা হচ্ছে পাতলা সুতির নরম নাইটির।

কর্মজীবী মহিলাদের কী হবে?

১৯৭০-এর দশকে একটি পাল্টা সংস্কৃতি আসে যা স্টিলেটোকে প্রত্যাখ্যান করে। এর অদ্ভুতুড়ে গড়ন, সহজে হাঁটাচলা না করতে পারা, সব কিছুর জন্যই সমালোচিত হতে হয় স্টিলেটোকে। কিন্তু ১৯৮০-র দশকে 'পাওয়ার ড্রেসিং’-এর আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে স্বমহিমায় ফেরে স্টিলেটো। স্টিলেটোকে আরও আরামদায়ক এবং আকর্ষণীয় করা হয় যাতে এক বিশেষ শ্রেণির কর্মজীবী মহিলাদের কাছে তা চূড়ান্ত ফ্যাশন স্টেটমেন্টে পরিণত হয়।

পপ সংস্কৃতির ইতিহাসে স্টিলেটো

১৯৯০ এবং ২০০০-এর দশকের শুরুতে স্টিলেটো ফের ফিরে আসে 'সেক্স অ্যান্ড দ্য সিটি'-র হাত ধরে। আমেরিকার এই শোয়ের (যা ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত চলেছিল) ৯৪টি পর্ব জুড়ে স্টিলেটোর ব্যবহার একে আবার মূলধারায় নিয়ে আসে। স্টিলেটো ক্যাটওয়াকের প্রধান অংশ থেকে ধীরে ধীরে আমজনতার দুর্গাপুজোর ফ্যাশনেও ঢুকে যায়। যৌনতা এবং নারী- বিষয়টিকে গুলে মেখেই তো স্টিলেটোর জন্ম। দেহসৌন্দর্যের বাইরে কোনওদিনই মূলধারার ফ্যাশন তাকায়নি। স্টিলেটোও না।

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।