গরমে হাঁসফাঁস, প্রাণজুড়োনো কলকাত্তাইয়া সরবতের সেরা ঠিকানা

এছাড়াও কলকাতার আনাচ-কানাচে ছড়িয়ে আছে এমন বহু দোকান, যাদের সরবৎ যে কোনও নামকরা দোকানের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।

rudranjan
৩ মিনিট
গরমে হাঁসফাঁস, প্রাণজুড়োনো কলকাত্তাইয়া সরবতের সেরা ঠিকানা

গরমে নাজেহাল অবস্থা কলকাতাবাসীর। এই অবস্থায় দু'দণ্ড শান্তির মতোই যেন দাঁড়িয়ে আছে কলকাতার সরবতের দোকানগুলো। কলকাত্তাইয়া সরবতের সেরা স্বাদ গ্রহণ করতে গেলে সরবৎ-প্রেমীদের পৌঁছে যেতে হবে সে সমস্ত ঠিকানায়।

প্যারামাউন্ট: প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টোদিকের রাস্তা ধ‍রে কিছু দূর এগোলেই বাঁহাতে পড়বে কলেজ স্কোয়ার। তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একশো বছরের পুরনো দোকান ‘প্যারামাউন্ট’। গরমের দিনে এই ছোট্ট সরবতের দোকানে বসার জায়গা পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার। অষ্টপ্রহর সেখানে কলেজপড়ুয়া থেকে আরম্ভ করে পথচলতি মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। ১৯১৮ সালে পূর্ববঙ্গের বরিশাল থেকে নীহাররঞ্জন মজুমদার নামে এক ব্যক্তি কলকাতা এসেছিলেন জীবিকার সন্ধানে। প্রথম জীবনে নীহারবাবু অনুশীলন সমিতির সদস্য ছিলেন। বরিশাল থেকে কলকাতা এসে তিনি একটা সরবতের দোকান খুললেন। সেই দোকানের নাম দিলেন ‘প্যারামাউন্ট’। সরবৎ বিক্রির পাশাপাশি এই দোকানের পিছনদিকের একটা ঘরে সেসময়ে বিপ্লবীদের গোপন বৈঠক চলত। আজকের দিনেও ‘প্যারামাউন্ট’ সেই ইতিহাস সযত্নে বহন করে চলেছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই দোকানের ‘ডাব মালাই’-এর স্বাদ গ্রহণ করতে আসে। যুগ যুগ ধরে 'প্যারামাউন্ট' হয়ে এসেছে বাংলার বহু কবি-সাহিত্যিকের পছন্দের ঠিকানা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাঙালি ভুলেছে ঢাকাই পরোটার স্বাদ, রইল তার সেরা ঠিকানাগুলো

সাধারণত হিঙের স্বাদযুক্ত ছোলার ডালের সঙ্গেই পরিবেশন করা হয় এই পরোটা।

চারু মার্কেটের চকোলেট চা: দুপুরের রোদে ফাঁকা হয়ে আসে 'ভবানী' সিনেমার সামনেটা। টিপু সুলতান শাহি মসজিদের দিক থেকে ভেসে আসে ‘ধূসর শূন্যের আজান গান।’ তারই মধ্যে রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনের প্রবেশদ্বারের পাশে ছোট্ট একটা দোকানে দেদার বিক্রি হয় চকোলেট চা। এই দোকানের কোনও নাম নেই। মানুষ একে ‘চকোলেট চায়ের দোকান’ হিসেবেই চেনে। চকোলেট চা ছাড়াও এই দোকানে পাওয়া যায় নানা ধরনের কফি এবং লস্যি। এর আগে লস্যি বলতে কলকাতাবাসী বুঝত দই-মিশ্রিত এক দুধ-সাদা পানীয়। চারু মার্কেটের এই সরবতের দোকানের দৌলতেই তারা পরিচিত হল চকোলেট লস্যির সঙ্গে। সাম্প্রতিককালে ইউটিউবের দৌলতে এই ‘চকোলেট চায়ের দোকান’ খুবই বিখ্যাত হয়ে উঠেছে।

শিব-শক্তি সরবতের দোকান: উত্তর ভারতে হোলির সময় সিদ্ধি খাওয়ার চল রয়েছে। কলকাতাতেও সেই প্রচলন রয়েছে, তবে এখানে সিদ্ধির দোকানের বড় অভাব। সাদা সুতির কাপড়ে সবুজ পাতার নির্যাস ছেঁকে নিতে নিতে হোলির ছড়া কাটছে দোকানি, এমন চিত্র কলকাতায় খুবই কম দেখা যায়। অল্প কিছু দোকানেই কলকাতাবাসী সন্ধান পাবে সেরা সিদ্ধির সরবতের। আর তাদের মধ্যে অন্যতম হল ‘শিব-শক্তি সরবৎ শপ।’ সিদ্ধির সরবৎ ছাড়াও এই দোকানের অন্যতম আকর্ষণ হলো লস্যি। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত এই দোকানে বিক্রি হয় হরেক কিসিমের লস্যি। বেনিয়াটোলায় অবস্থিত এই দোকানের লস্যি কলকাতার যে-কোনও বড় দোকানকে টেক্কা দিতে পারে।

কপিলাশ্রমের সরবৎ: সালটা ১৯০৭। ঠিক দু’বছর আগেই তৎকালীন বড়লাট লর্ড কার্জনের নির্দেশে ভাগ হয়েছে বাংলাদেশ। এই অবস্থায় হৃষিকেশ শ্রীমানী নামে এক ব্যক্তি উত্তর কলকাতার বিধান সরণির ওপর তৈরি করলেন বাংলার প্রথম সরবতের দোকান। একচালার সেই দোকানের নাম তিনি রাখলেন ‘কপিলাশ্রম’। কালে কালে এই দোকানই কলকাতার সেরা সরবতের দোকান হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হৃষিকেশবাবুর হাত থেকে দোকানের দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁর পৌত্র প্রনবেন্দু শ্রীমানীর ওপর। কপিলাশ্রমের বৈশিষ্ট্য হলো, দইয়ের সরবৎ। লস্যি নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান তাঁরা। একসময় দোকানের সামনে সরবৎ খাওয়ার জন্য লম্বা লাইন পড়ত। কেউ কেউ আবার গাড়ি দাঁড় করিয়ে অপেক্ষা করতেন কপিলাশ্রমের সরবতের স্বাদ নেওয়ার জন্যে। এক সাক্ষাৎকারে প্রণবেন্দুবাবু জানিয়েছেন, আগে সরবতের দই তাঁদের বাড়িতেই পাতা হত। তারপর তাতে মেশানো হত ‘অরোরা কোম্পানি’-র সিরাপ। কালক্রমে সেই নিয়মে সামান্য কিছু পরিবর্তন এসছে ঠিকই, কিন্তু আজও কপিলাশ্রমই ‘ম্যাঙ্গো লস্যি’-র সেরা ঠিকানা।

এছাড়াও কলকাতার আনাচ-কানাচে ছড়িয়ে আছে এমন বহু দোকান, যাদের সরবৎ যে কোনও নামকরা দোকানের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। সেই সমস্ত দোকানের নাম হয়তো অনেকেই জানে না। তবু গরমকাল এলেই বিকেলের পড়ন্ত রোদে তাদের শোকেসের ওপর থরে থরে সাজানো থাকে রং-বেরঙের নানা সরবতের বোতল।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।