২ টো পা নেই, নেই কোমর, বিশ্বকে যুদ্ধজয়ের নয়া আখ্যান শিখিয়েছেন এই খেলোয়াড়!

Athlete Zion Clark: ফুলে উঠছে তাঁর চওড়া ছাতি, হাতের মাংসপেশি, পেটের ওপর থাক থাক করে সাজানো সিক্স প্যাক, আর খোলা পিঠের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে একটা কালচে রঙের ট্যাটু, যাতে জিওন ক্লার্ক লিখে রেখেছেন 'NO EXCUSE'...

Amit Patihar
৪ মিনিট
২ টো পা নেই, নেই কোমর, বিশ্বকে যুদ্ধজয়ের নয়া আখ্যান শিখিয়েছেন এই খেলোয়াড়!

মাতৃগর্ভে থাকাকালীন শিশুর যে যত্নের প্রয়োজন হয় তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বোঝা যায় আমেরিকার জিওন ক্লার্কের গল্প শুনলে। তার গর্ভধারিণী মা, জিওন পেটে থাকাকালীন সন্তানের কোনওরকম যত্ন তো নেননি, উল্টে দিনের পর দিন নিতে থাকেন বিভিন্ন ধরনের ড্রাগস। যার ফলাফল ভোগ করতে হয় জিওনকে। 'কডাল রিগ্রেসন সিনড্রোম' নামের এক দুর্লভ রোগের শিকার হন জিওন ক্লার্ক। কী এই রোগ? এই রোগে মানুষের কোমর থেকে নিচের দিকে বৃদ্ধি হয় না। অর্থাৎ, যার এই রোগ হয় তার জন্ম থেকেই কোমর এবং দুটো পা তৈরিই হয় না। জিওনেরও জন্ম থেকেই দুটো পা নেই, কোমর নেই, মানুষের শরীরের নিচের অংশে যা যা থাকা দরকার তার কিছুই নেই। জিওনের মা জিওনকে এই রূপে জন্মাতে দেখে জিওনকে আপনও করেননি। তিনি জিওনকে পাঠিয়ে দেন শিশুবিকাশ কেন্দ্রে। জীবনের ১৬ টা বছর জিওন সেখানেই কাটান। তাঁর অক্ষমতার জন্য তাঁকে কেউই নিজের করে নেয়নি। সারাটা ছোটবেলা জিওনের কেটেছে অত্যাচারে, অবহেলায়, অনাদরে, ঘৃণার শিকার হয়ে। অবশেষে জিওনকে দত্তক নেন কিম্বারলি হকিন্স নামের এক মহিলা, যিনি সারা জীবন এক সন্তানের খোঁজ করছিলেন। জিওনকে পেয়ে তার সেই খোঁজপূরণ হয় এবং ভালোবাসার চাতক হয়ে ঘুরতে ঘুরতে জিওনও অবশেষে এমন এক আশ্রয় পায় যেখান থেকে ম্যাজিক দেখাতে শুরু করেন তিনি।

কোন ম্যাজিক? উত্তরে হয়তো 'পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ম্যাজিক' বললে ভুল হবে না খুব একটা। জিওন যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তেন তখন থেকেই তাঁর অদম্য জেদ। শরীরের অর্ধেক না থাকার পরেও জিওন বিশ্বাস করতেন তিনি আর পাঁচটা মানুষের থেকে কম কিছু নন। তাই ক্লাস টু'তে পড়াকালীনই স্কুলে তিনি ভর্তি হলেন কুস্তিতে। বছরের পর বছর ধরে কুস্তির প্রতিটা ম্যাচে জিওন হারতে থাকেন। স্কুলে বন্ধুদের অত্যাচারের শিকার হতে থাকেন, লকারে বন্ধ করে দেওয়া হতো তাঁকে, মারধোর করা হতো নির্মমভাবে। কিন্তু, জিওনের ছোট্ট থেকেই দুটো পা না থাকলেও ছিল অদম্য জেদ। পায়ের বদলে পেয়েছিলেন দৃঢ়তা, প্রতিজ্ঞাবদ্ধতা এবং লক্ষ্যে পৌঁছানোর খিদে। সব অত্যাচার সহ্য করে জিওন তাকে নিজের জেদে পরিণত করতে থাকলেন এবং একদিন কুস্তির ম্যাচ জিততে শুরু করলেন। যেদিন থেকে জিততে শুরু করলেন তারপর থেকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি জিওনকে। রাজ্যস্তরে নিজের শ্রেণির সেরা খেলোয়াড় হিসাবে গণ্য হন জিওন এখন।

কথায় বলে, যে মানুষ অবহেলা, জেদ, আর চেষ্টার খড় মাটি দিয়ে গড়া তাঁকে ভাঙা সহজ কাজ নয়। জিওন ক্লার্ক নিজের ইঞ্চি ইঞ্চি গড়ে তুলেছেন অবিশ্বাস্য জেদ আর উত্তর দেওয়ার স্পর্ধা দিয়ে। তাঁর বক্তব্যে, "আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই তাঁদের যারা এককালে আমাকে অত্যাচার করতো, 'বুলি' করতো, অত্যাচার করতো, অপমান করতো। তাঁদের ছাড়া আমার ভিতরে এই জেদ, এই কিছু করে দেখানোর ইচ্ছা তৈরি হতো না"।

জিওন এখন একজন জনপ্রিয় মোটিভেশনাল স্পিকার, ব্যবসায়ী, অভিনেতা, লেখক, কুস্তিবিদ এবং গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের অধিকারী। শেষেরটা শুনে একটু চমকে উঠলেন? গিনেস বুকে জিওনের নাম কী করে এল? সাম্প্রতিককালে জিওন গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস দ্বারা আয়োজিত 'হাতে ভর দিয়ে দ্রুততম ২০ মিটার হাঁটা' বিভাগে বিশ্বরেকর্ড করার চেষ্টা করেন। তাঁর কোচ বাচ রেনল্ডস, যিনি নিজে একজন অলিম্পিক স্বর্ণ পদকজয়ী এবং গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের অধিকারী, তিনি জিওনকে প্রশিক্ষণ দেন। মাসের পর মাস ধরে জিওন নিজেকে তৈরি করেন এই বিশ্ব রেকর্ড গড়ে তোলার জন্য। অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কিছুক্ষণের ওয়ার্ম আপের পর জিওন উপস্থিত হন স্টার্টিং লাইনের সামনে। বাঁশি বেজে ওঠার পর ধনুক থেকে বেরনো তিরের মতো দু'হাতে ভর দিতে দিতে এগিয়ে যান জিওন নিজ লক্ষ্যে। ২০ মিটারের দূরত্ব হাতে ভর দিয়ে পার করতে জিওন ক্লার্ক সময় নেন মাত্র ৪.৭৮ সেকেন্ড। যা দুটো পা থাকা মানুষের জন্যও সহজ নয় খুব একটা। তৈরি হয় বিশ্বরেকর্ড। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের পাতায় নাম ছেপে যায় ছোটবেলা থেকে অবহেলিত, লাঞ্ছিত, পা না থাকা একজন 'প্রতিবন্ধী' মানুষের, যিনি নিজেকে কারও থেকে পিছিয়ে পড়া মনেই করেন না।

রাস্তায় আকছার কত মানুষের দেখা মেলে, যাদের হাতের আঙুল নেই, হয়তো একটা হাত নেই কিংবা একটা পা দুর্বল অথবা শরীরের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ঠিক থাকা সত্ত্বেও মানুষকে ভিক্ষা করতে। "ভিক্ষা কেন করছো?", জিজ্ঞেস করলে প্রত্যুত্তরে শোনা যায়, "ভগবান আমাকে পঙ্গু করে জন্ম দিয়েছে, কী করে খাব?" জিওন ক্লার্ক প্রতিবন্ধকতাকে আক্ষরিক অর্থেই 'বিশেষভাবে সক্ষম' করে তুলেছেন। একজন 'আইডল' হয়ে থাকতে চেয়েছেন। তিনি চেয়েছেন যেন তাঁর দিকে তাকিয়ে শক্তি পান তাঁরই মতো মানুষেরা। যেন তাঁরা নিজেকে দুর্বল না ভাবেন। যেন তাঁরা কারও কাছে হাত পেতে বেঁচে না থাকেন। জিওন ক্লার্ককে ভবিষ্যতের লক্ষ্যের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,

"আমি অলিম্পিকে যেতে চাই, আমি প্যারাঅলিম্পিকে যেতে চাই। আমি মাইকেল ফেলপসের থেকে বেশি স্বর্ণপদক জিততে চাই অলিম্পিকসে, গোটা পৃথিবীকে নিজেকে চেনাতে চাই আমি"।

গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে তাঁর সাক্ষাৎকার দেখতে দেখতে, গায়ে কাঁটা দেয় তার জীবনের কাহিনি তাঁর নিজের মুখে শুনতে শুনতে, তাঁর যন্ত্রণার কথা জানতে জানতে। গায়ে কাঁটা দেয় যখন দেখি কোমর-বিহীন, দুটো পা-বিহীন এইটুকু ছোট্ট উচ্চতার মানুষ জিমের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে শরীরের কসরত করছেন রোজ দু'বেলা। ফুলে উঠছে তাঁর চওড়া ছাতি, হাতের মাংসপেশি, পেটের ওপর থাক থাক করে সাজানো সিক্স প্যাক, আর খোলা পিঠের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে একটা কালচে রঙের ট্যাটু, যাতে জিওন ক্লার্ক লিখে রেখেছেন 'NO EXCUSE'...

জিওন ক্লার্ক একজন অনুপ্রেরণার নাম, লড়াইয়ের নাম, হার না মানা এক সৈনিকের নাম, শরশয্যায় শুয়েও বিপক্ষ শিবিরের ত্রাসের নাম জিওন ক্লার্ক। এই পৃথিবীতে জিওন ক্লার্কদের সংখ্যা বাড়তে থাকুক!

লিখেছেন
Amit Patihar
Amit Patihar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।