বাড়ির কাছেই অজানা পিকনিক স্পট! শীতের ছুটিতে সদলবলে ঘুরে আসুন এই দ্বীপে

Sabuj Dwip Picnic Spot: আর কতটা সবুজ দ্বীপ? মাঝির নির্বিকার উত্তর, "এখনও অনেকটা পথ ভেসে চলতে হবে। এত ব‍্যস্ত হলে হবে!"

chiranjit pramanick
৪ মিনিট
বাড়ির কাছেই অজানা পিকনিক স্পট! শীতের ছুটিতে সদলবলে ঘুরে আসুন এই দ্বীপে

স্মৃতি ভোলা কঠিন। আরও কঠিন ভ্রমণের স্মৃতি ভোলা। বারোটি বছর পার হয়ে গিয়েও তবু মনের গভীরে বাসা বেঁধে আছে এক দ্বীপের কথা। সে যেন এক অন‍্য গ্রহের অভিজ্ঞতা, এক অন্য গ্রহের ভ্রমণ। পিকনিকের উপযুক্ত স্থান তো বটেই, নিরিবিলিতে সময় কাটানোরও যথেষ্ট সুন্দর জায়গা। সেই জায়গার কথা বলতে গেলে পরিবারের কথা তো আসেই। আমার জেঠতুতো দাদা কাজ করত মুম্বইয়ের এক হোটেলে। বাড়ি ফিরলেই বেরিয়ে পড়ত এদিক সেদিক ভ্রমণে। দাদার উদ্যোগেই ঝুলে পড়তাম আমরাও। তো সেবারও হলো তেমনই। সঙ্গী প্রায় নয়-দশ জন! যাওয়ার জন‍্য টাটা সুমো গাড়ি ভাড়া করতেই হলো। সকাল থেকেই সে এক হইচই, ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা শুরু হয়ে গেল, রান্নার দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন আমার এক বন্ধুর মা। সকলে মিলে জিনিসপত্র জোগাড় করে রওনা দিলাম সেই অজানা দ্বীপের পথে। দ্বীপটির নাম সবুজ দ্বীপ।

তলহন সবে ক্লাস ইলেভেন, বাকিরা আরও ছোটো, নাইন কি টেন। গাড়ির মধ‍্যে উদ্দাম উল্লাস করতে করতে পৌঁছলাম গঙ্গার পাড়ে। জায়গাটির নাম এখন মনে নেই, তবে এই দ্বীপে যেতে হলে ওপাড়ে বলাগড় আর এপাড়ে চাকদা থেকে যাওয়া যাবে। এই সবুজ দ্বীপটির এক পাড়ে নদিয়া জেলা, অন্য পাড়ে হুগলি। বলাগড়ের নিকটস্থ স্থানেই দ্বীপটি অবস্থিত বলে, হুগলি জেলার অন্তর্গতই ধরা হয়।

সে যাইহোক, সেই অপরিচিত স্থানে পৌঁছানোর পর আমরা নদীর পাড়ে এক মাঝির বাড়িতে এসে পৌঁছালাম। মাঝির বাড়িটি নদীর পাড়ে। সামনে অগাধ জলরাশি, একপাড়ে ছোট্ট বাসা, সে এক অপরূপ দৃশ্য। মাঝির কাছে গিয়ে আমরা এক একজনের নৌকার ভাড়া জানতে চাওয়াতে দর কষে একটা দাম ঠিক হল। দ্বীপে যেতে হলে নৌকা ছাড়া তো গতি নেই। সকলে মিলে পিকনিকের জিনিসপত্র চাপিয়ে, নিজেরাও চেপে বসলাম নৌকায়।

নদীবক্ষে নৌকাতে চেপে ঘুরতে সবাই ভালোবাসি কিন্তু নদীর জলের উপর নৌকায় দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকার অনুভূতি আরও বেশি সুখকর। মাঝি নৌকার দাঁড় টানছেন, স্রোত চিরে এগিয়ে যাচ্ছে নৌকা, সবার মনও। জলের ছলাৎছলে মিশে যাচ্ছে খুশির সশব্দ প্রকাশ। নদীর ধার বরাবর মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ, অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ‍্য। কিছুটা পথ অতিক্রম করেই একটি দ্বীপ দৃষ্টিগোচর হলো। জানা গেল, দ্বীপটির নাম মঙ্গল দ্বীপ। প্রথমে যদিও আমরা সবুজ দ্বীপ বলেই মনে করছিলাম। অচেনা পথে গেলে, সেই অতিক্রান্ত পথ যদি ধারণার চেয়ে দীর্ঘ হয় তাহলে কেবলই মনে হতে থাকে, ঢের সময় লাগছে। এক জন মাঝিকে জিজ্ঞাসাও করে বসলেন, আর কতটা সবুজ দ্বীপ? মাঝির নির্বিকার উত্তর, "এখনও অনেকটা পথ ভেসে চলতে হবে। এত ব‍্যস্ত হলে হবে!"

সবুজ দ্বীপের উদ্দেশ্যে যেতে গিয়ে মঙ্গল দ্বীপ পেরিয়ে গেলাম ধীরে ধীরে, মঙ্গল দ্বীপ তখন মঙ্গল গ্রহের মতোই দূরবর্তী। আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেন কলম্বাস। মঙ্গল দ্বীপ যে প্রথম কে আবিষ্কার করলেন, জানা নেই। তবে যেই আবিষ্কার করুন আর নাম দিন না কেন, যথার্থ নামকরণ করেছেন। নদী বক্ষে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ আমরা। নদীর স্বচ্ছ জল,নদীর মাঝখান দিয়ে নৌকা ভেসে চলছে, স্বচ্ছ আয়নার মতো সবুজ জল থইথই।ওই দূরে জেগে উঠেছে সবুজ দ্বীপ। দূর থেকে দ্বীপটি দেখলে সবুজ ভরা বনভূমি ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না যদিও। দ্বীপের কাছে নদী তটে নৌকা ভেরালেন মাঝি। একে একে সকলে নৌকা থেকে সমস্ত জিনিস সহ নিজেদেরও নামালাম। প্রায় আঘঘণ্টা মতো সময় লেগেছে এখানে আসতে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ছিল কুষ্ঠরোগীদের নিরাময়ের স্থল, এখন তাক লাগানো সমুদ্র! কলকাতার কাছেই রয়েছে এই খাজানা

Offbeat Sea Beaches near Kolkata: বগুড়ান জলপাইয়ে সমুদ্রও কিন্তু বেশ লুকোচুরি খেলায় মাতে৷ স্থানীয়দের কথায়, দুপুর ১২ টা ও রাত ১০ টায় বিচের কাছে আসে সমুদ্র। বাকি সময় তার রূপ ধরা পড়ে না৷

ধীরে ধীরে সবুজ দ্বীপের ভিতরে ঢুকে পড়লাম। খাবার দাবারের সমস্ত জিনিস মাঝির দায়িত্বে রেখে ঘুরতে বেড়িয়ে পড়লাম। ভাগীরথীর উপরে রয়েছে এই সবুজ দ্বীপ। বাংলাদেশ থেকে আসা সবুজ জলের চূর্ণি ভাগীরথীর ঘোলা জলে এসে মিশেছে। দ্বীপটি দেড়শো বিঘার বেশি জায়গা জুড়েই বিস্তৃত। তবে দ্বীপটি ছোট হলেও এর খ্যাতি বেশ বেশি। যদিও সেটা ছিল অফ সিজন, পর্যটকদের ভিড় নেই। মনে হলো, এই দ্বীপটিতে এসে লুকিয়ে থাকলে, কেউ কোনও দিন খুঁজে পাবে কী না সন্দেহ। পাইন, পাম, ইউক‍্যালিপটাস, মেহগিনি, সেগুন এবং অন‍্যান‍্য গাছে ঘেরা দ্বীপ। যখন এই দ্বীপ জেগে উঠেছিল নদীবক্ষ থেকে তখন বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দল এসে উদ্ভিদের বীজ বপণ করে গেছে। আর বিশাল এক অরণ‍্যে পরিণত হয়েছে এই ভূখণ্ড। পরবর্তী সময়ে সরকার পর্যটনের এক উপযুক্ত জায়গা হিসেবেও গড়ে তুলেছে।

শুধুই জঙ্গল নয়, রয়েছে বাচ্চাদের জন্য এক উদ‍্যান। বাচ্চাদের পছন্দ আর চাহিদা মতো নানা কিছুই আছে। ছবি তোলার ফোয়ারা ছুটল, হুটোপুটি চিৎকারে সবুজ দ্বীপ গমগম করে উঠছে যেন। কয়েকটা বড় কটেজেরও দেখা মিলল, কটেজে কেউ থাকে না। কটেজের উপরে লতা পাতার নকশা। বেশ কিছু অংশ ভগ্ন অবস্থায় পড়ে আছে। কটেজের জানালা কাঁচের তৈরি, জানালার কাঁচ একটাও আস্ত নেই। খড়ের ছাউনির ঘরও দেখলাম। রয়েছে ওয়াচ টাওয়ারও। তবে উপরে ওঠার উপযুক্ত ছিল না। লতা পাতায় জড়িয়ে আছে সিঁড়ি। ডিসেম্বর মাসে শীতের সময় কিছুটা জঙ্গল পরিষ্কার করা হয় কারণ ওই মাসেই পর্যটকদের ভিড় বেশি দেখা যায়।

দুপুর নামছে সবুজ দ্বীপে, সবুজ ঘাসের উপর এসে পড়ল পাত, তাতে এসে জুটল মাংস, রুটি, মিষ্টি। খাওয়ার পর্ব সেরে আরেক প্রস্থ দ্বীপভ্রমণ। আরও গভীরে গেলাম। সবুজ ঘাসের উপর ইচ্ছে করে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়তে, পড়লামও। কয়েকজন অবশ্য গাছের ছালে বন্ধুদের নাম খোদাইয়ে ব্যস্ত। নদীর জোয়ার-ভাটার কারণে দ্বীপের তটে ভূমি ক্ষয়ে যায়। ফলে গাছ উপড়ে পড়ে। কয়েকটি গাছ উপড়ে পড়ে আছে, হয়তো বেশ কয়েক বছর ধরেই ওভাবে, পাতাহীন পড়ে আছে। এই গহিন অরণ্যে কেবল পাখি আর কিছু প্রাণি ছাড়া কেই বা এসব দৃশ্য মনে রাখে।

ফেরার পথে আবার নদী পেরোতে হবে। প্রকৃতির মাঝখান থেকে ফিরতে হবে কোলাহলে। বর্হিজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই নদীবক্ষে হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত সাময়িক- কিন্তু শাশ্বত হয়েই থেকে যায়। তটে রাখা নৌকোতে চাপলাম। মাঝি আবার নৌকার দাঁড় বাইতে লাগলেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে। সূর্যের আলোতে নদীর জল টলমল করছে। হালকা সবুজ জলে কেউ যেন মুক্তো ছড়িয়ে দিয়েছে। ফিরে আসার সময় আবার মঙ্গল দ্বীপের দেখা। মঙ্গল দ্বীপ অবশ্য সবুজ দ্বীপের থেকে আকারে অনেক বড় । নদীর পাড়ে এসে ভিড়ল মাঝির নৌকো। এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত, তবে শেষ হয়েও না শেষ হওয়া গল্পগুলোই আজীবনের সম্পদ। ঠিক ফেরার এই মুহূর্তে একজন নেমে পড়ল নদীতে স্নান করতে। নদীতে তখন জোয়ার উঠেছে। একজনকে নামতে দেখে বাকিরাও..

আমরা নদীকে ছেড়ে এলেও নদী আমাদের ছাড়ল না। স্নান করে, কোলাহল ছেড়ে উঠে এলাম। আমাদের সর্বাঙ্গে লেগে আছে নদী, লেগে আছে নির্জনতা।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।