সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ! ছাঁটাইয়ের পর অফিসের সামনেই পোহা বিক্রি করছেন রিপোর্টার

Journalist Selling Poha: সাংবাদিক হয়ে দেশ বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন দাদন। আর এখন পোহা বিক্রি করছেন দেশের অন্যতম বড় সংবাদ সংস্থার অফিসের সামনেই।

Madhurima Dutta
৪ মিনিট
সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ! ছাঁটাইয়ের পর অফিসের সামনেই পোহা বিক্রি করছেন রিপোর্টার

দেশ বদলাবেন। মানুষকে সত্যি কথা বলবেন, চারদিকে ঘিনঘিনে মিথ্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে জোর গলায় প্রশ্ন তুলবেন, সমাজ বদলাবেন। এই ইচ্ছা আর স্বপ্ন নিয়ে আনকোরা ছাত্রছাত্রীরা এসে পৌঁছন ইন্টারভিউ দিতে। বুক কাঁপে, তবু নিজেকে নিংড়ে রেখে দেন সাংবাদিকতার তাবড় সব মাথাদের সামনে থাকা বৃদ্ধ টেবিলে। সাংবাদিকতা চাকরি নয়, সাংবাদিকতা নেশা। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের ভার বইতে গেলে কী কী হতে হয় আর কী কী করতে হয় এই পাঠ চলবে দিন কয়েক। তারপর খবর খোঁজার দৌড়। সে সত্য খোঁজার লড়াইয়ের থেকেও বেশি দৌড়, একেবারে পড়ি কি মরি করে সবার আগে, প্রথম, ব্রেকিং হওয়ার দৌড়! তারপর একদিন, "তোমায় বাতিল করা হলো" শুনতে হতে পারে। শুনতে হচ্ছে, শুনতে হবে। গণতন্ত্রের স্তম্ভের ভার কীভাবে সামলাবেন বেকার সাংবাদিক? হাত পাতবেন? "একটা চাকরি দেবেন" বলতে বলতে মুখে রক্ত তুলে ফেলবেন? নাকি প্রাক্তন অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ঠেলাগাড়িতে চা-পকোড়া বা জিলিপি বিক্রি করবেন? প্রথম দুই পথে আজকাল বরফ গলে না। চাচারা সকলেই নিজেদের প্রাণ ও চাকরি বাঁচাতে ব্যস্ত! অতএব, ভুখা পেটের সাংবাদিক দেশ বদলাতে গিয়ে নিজেকেই বদলে ফেলেন। সাংবাদিক থেকে হয়ে ওঠেন ঠেলাওয়ালা। যেমন হয়েছেন দাদন বিশ্বকর্মা। দেশের অন্যতম বিখ্যাত সংবাদ সংস্থা থেকে ছাঁটাই হয়ে যাওয়ার পর শেষমেশ পোহার দোকান খুলেছেন দাদন।

২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে জি নিউজে ব্যাপক পরিমাণে কর্মী ছাঁটাই হয়। সেই ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের মধ্যেই ছিলেন সাংবাদিক দাদন বিশ্বকর্মা। পায়ের তলা থেকে রাতারাতি জমি সরে যায় তাঁর। এক রাতের মধ্যে সমস্ত জীবন, পরিকল্পনা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ছাঁটাইয়ের পর টানা ৩ মাস তিনি চাকরি খুঁজতে থাকেন। সকলের কাছে চাকরি চেয়েছেন, যেখানে পেরেছেন নিজের অবস্থার কথা জানিয়েছেন। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়, সহকর্মী- সকলেই জানতেন কী অবস্থার মধ্যে পড়েছেন এই সাংবাদিক। তবু, সাহায্য করেননি কেউই। হয়তো সাহায্য করার মতো ক্ষমতাও ছিল না কারও।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সত্যি বললেই বন্দি! ভারতে জেলে পচছেন কত সাংবাদিক, শিউরে উঠতে হবে যে তথ্যে

Indian Journalists in Jail: ২০২১ সালে সারা পৃথিবীতে জেলবন্দি ছিলেন ৪৮৮ জন সাংবাদিক। এই সংখ্যাটা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩৩ জনে।

"কাজ তো খারাপ করতাম না। যারা আছেন এখন সেখানে, সবাই জানেন। যারা বাইরে আমার কাজ দেখেছেন তারাও জানেন আমি কাজ কেমন করতাম। কিন্তু ছাঁটাই হয়ে গেল। বলা হলো, টাকাপয়সার সঙ্কট চলছে সংস্থার। আসলে আমি জানি, অফিসের ভেতরে চলা রাজনীতির শিকার হয়েছি আমি," জানিয়েছেন দাদন। ২-৩ মাস যে কী অনিশ্চয়তায় কাটিয়েছেন, তিনিই জানেন। টাকা পয়সার প্রচণ্ড দরকার পড়ে। বাড়িতে হঠাৎ চিকিৎসাজনিত সমস্যা দেখা দেয় দাদনের। যে সময় ছাঁটাই হয়েছেন, স্ত্রী সেই সময় গর্ভবতী। নরমাল ডেলিভারির বদলে অস্ত্রোপচার করতে হলো। টাকা না দিলে হাসপাতাল থেকে ছুটি মিলবে না। গভীর রাতে ১ লাখ টাকা জমা করতে বলা হলো দাদনকে। কীভাবে ১ লাখ টাকা জোগাড় করেছিলেন সেই রাত্তিরে, ভাবলে আজও অস্থির হয়ে যান সাংবাদিক থেকে পোহা বিক্রেতা হয়ে ওঠা দাদন।

কম্পিউটার সায়েন্সে বিএসসি পাশ করার পরেও সেই দিকে না গিয়ে সাংবাদিকতায় চলে আসেন দাদন। স্কুলে এক স্যার বলেছিলেন, এমন কিছু করো যাতে দেশ বদলায়। ব্যাস! সাংবাদিক হয়ে দেশ বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন দাদন। আর এখন পোহা বিক্রি করছেন দেশের অন্যতম বড় সংবাদ সংস্থার অফিসের সামনেই। ঠেলার নাম দিয়েছেন, পত্রকার পোহাওয়ালা। পত্রকার থেকে পোহাওয়ালা হয়ে ওঠা দাদন জানিয়েছেন, একে সাংবাদিকের দোকান বললে ভুল হবে। আসলে পরিস্থিতির চাপে পড়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এক মানুষের শেষ আশ্রয় এই দোকান। এই মানুষটি আর ১৩ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সাংবাদিক নয়। সে ক্লান্ত এক হেরে যাওয়া মানুষ। পকেটে টাকা আর পেটে খাবার না থাকলে সাংবাদিকের কলমও চলে না, এটাই সত্য। তাই বাধ্য হয়ে পোহা আর জিলিপির দোকান দিয়েছেন আজতকের অফিসের ঠিক সামনেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জাহাজ-খালাসি থেকে সাংবাদিক! গৌরকিশোর ঘোষের বিয়েতে অতিথিদের টিকিট কাটতে হয়েছিল

মেরুদণ্ড সোজা রেখে, অদক্ষ, স্বৈরাচারী শাসকের চোখে চোখ রেখে প্রতিবাদের ভাষাকে সকলের কাছে তুলে ধরেছেন গৌরকিশোর ঘোষ।

দাদন বিশ্বকর্মা ২০১১ সালে দেশের অন্যতম বিখ্যাত সাংবাদিকতা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান আইআইএমসি থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। পাশ করার পরেই ইন্দোরে চাকরি পান। ইন্দোরের চাকরি ছেড়ে চলে আসেন দিল্লিতে। তারপর আম্বালায় দৈনিক ভাস্করে চাকরিতে যোগ দেন। ২০১১ থেকে ২০১৪ অবধি ছিলেন দৈনিক ভাস্করে। তারপর ২০১৬ অবধি চাকরি করেন নবভারত টাইমসে। সেখানকার চাকরি ছেড়ে যোগ দেন ইন্ডিয়া টুডের ফুড ওয়েবসাইটে। বছর চার ধরে সেখানেই কর্মরত ছিলেন তিনি। তারপর জি নিউজে যোগ দেন। বলতে গেলে, দেশের সমস্ত বিখ্যাত সংবাদ সংস্থায় কাজ করেছেন দাদন। দৈনিক জাগরণ, নবভারত টাইমস আজতক এবং জি নিউজ- অথচ ছাঁটাইয়ের পর কোথাও কোনও চাকরি জোটেনি দাদনের।

তাই, নিজের আর পরিবারের পেট চালাতে পোহার দোকান। সম্পাদকের পোহা আর সাংবাদিকের পোহা। মূলত দুই ধরনের পোহা পাওয়া যায় তাঁর দোকানে। সম্পাদকের পোহা ৮০ টাকা প্লেট, তাতে দাদন পনীর দেন, বেদানা দেন। ইউটিউবার স্টার সেনসেশনাল পোহাও আছে। আর সাধারণ সাংবাদিক পোহাও আছে। সব পোহার সঙ্গে জিলিপি ফ্রি। বিএসসি করার পরে ভালো চাকরির সম্ভাবনা ছেড়ে সাংবাদিকতায় আসা। সেসব ছেড়ে এখন পোহা বিক্রি! এই তবে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ? সাংবাদিকতার তাগিদ এখনও রয়েছে দাদনের অন্দরে। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে একটি ইউটিউব চ্যানেলও চালান তিনি। সেই চ্যানেলকে ধীরে ধীরে দাঁড় করাতে চান। তবে আগে পেটের খিদে মেটাতে হবে। তাই বাঁচতে হবে, লড়তে হবে। আম্বেদকরের চিন্তা এখনও ভাবায় দাদনকে, হাল ছাড়তে নারাজ এই সাংবাদিক। মানুষকে স্বপ্ন দেখতে বলেন দাদন। লোকে কী বলবে, তাতে কান না দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতোই চলতে বলেন মানুষকে। আর পোহা বিক্রি করেন। দেশ বদলাতে গেলে আগে পেট চালাতে হয়। পেট চালাতে গেলে ঠিক কী কী করতে হয়, এই শিক্ষা সাংবাদিকতার মাথারা কি শেখান যুবক যুবতীদের?

তথ্য সৌজন্যে- Newslaundry Youtube Channel

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।