আজকের ভারতেও বহাল লজ্জার দাসপ্রথা! শিউরে উঠতে হবে বাস্তব জানলে

Bonded Labour in India: সংবিধানের পরিপন্থী, তবু বেগার শ্রম বহাল ভারতে।

Arnab Dutta
৪ মিনিট
আজকের ভারতেও বহাল লজ্জার দাসপ্রথা! শিউরে উঠতে হবে বাস্তব জানলে

প্রাচীনকালের সমাজব্যবস্থায় বহু নারী-পুরুষকে 'ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী' হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। বিনিময়ে কোনওক্রমে ব্যবস্থা হতো খাওয়া-পরার। আর কথায় কথায় শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো ওই 'ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী'-দের।

প্রকৃতির নিয়মে সময় এগিয়েছে। এক যুগের অবসান হয়ে নতুন যুগের আবির্ভাব হয়েছে। এ-সত্ত্বেও কিছু অভিশাপ নির্মূল করা যায়নি। ভারতে আজও 'ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী' হিসেবে কাজ করানো হচ্ছে দরিদ্র, অসহায় নিম্নবর্ণর মানুষকে।

দেশের স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে 'আজাদি কা অমৃত মহোৎসব' দেশজুড়ে ঘটা করে পালিত হচ্ছে। আবার একইসঙ্গে জাতপাতভিত্তিক ভারতীয় সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একাংশকে কার্যত বিনা পারিশ্রমিকে স্রেফ বেগার খাটিয়ে নিচ্ছেন উচ্চবর্ণের মানুষজন। অথচ এই ব্যবস্থা অচিরে বিলুপ্ত হলে সবঅর্থেই তা হতে পারত স্বাধীন ভারতের পক্ষে মঙ্গলদায়ক।

আজও 'ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী' বহাল কেন? এর অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চবর্ণের প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছ থেকে বিপদে পড়ে ঋণ নেওয়ার পরে সেই কর্জ চোকাতে না পারা। এর জেরে নিম্নবর্ণের সংকটাপন্ন মানুষটিকে বেগার খাটানো হচ্ছে বিনা পারিশ্রমিকে। এ-ব্যাপারে একটি উদাহরণ পেশ করা যাক।

ঘটনাটি মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার। ছেলের আকস্মিক মৃত্যুর পর সন্তানহারা বাবার কাছে মৃত ছেলের শেষকৃত্য করার মতো টাকা ছিল না। সেই কারণে তিনি কয়েকশো টাকা ঋণ নেন গ্রামবাসী উচ্চবর্ণের এক ব্যক্তির থেকে। ছেলের শেষকৃত্যের জন্যে ৫০০ টাকা ঋণ পরিশোধ করার সঙ্গতি না থাকাতে কালু পাওয়ার নামে ওই দরিদ্র ব্যক্তিকে সকালে জলখাবার বাবদ বরাদ্দ পোড়া রুটি এবং নামমাত্র রাতের খাবারের বিনিময়ে দিনের পর দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়েছে। এরপর ঘটনাটি সংবাদ মাধ্যমের নজরে আসায় চাঞ্চল্য ছড়ায়।

অথচ ব্যাপারটা অন্যরকমও হতে পারত। দুর্ভাগ্যজনক কারণেই তা হয়নি বলা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্গত দেশগুলির মধ্যে ভারতই প্রথম বেগার শ্রম থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। ১৯৭৬ সালে ভারতে বেগার শ্রম আইনত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

তাতে কাজের কাজ এ-পর্যন্ত তেমন কিছু হয়নি। যদিও ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকল নম্বর ২৩ অনুসারে কোন নাগরিককে বেগার শ্রমে বাধ্য করাটা পুরোপুরিভাবে বেআইনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতে হু হু করে বাড়ছে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা, কেন এই পরিস্থিতি দেশের শৈশবের?

লক্ষ লক্ষ শিশু শ্রমিকের জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গনাইজেশন এবং ইউনিসেফ-এর তরফে এই সম্পর্কে দু'টি পৃথক রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে।

যে মানুষজনকে বেগার শ্রম দিতে বাধ্য করা হচ্ছে ওঁরা ন্যূনতম পারিশ্রমিক পর্যন্ত পাচ্ছেন না বলে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর অভিযোগ। এদিকে ১৯৪৮ সালেই ভারতে ন্যূনতম মজুরি সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন হয়েছে। এই আইন অনুসারে বেগার খাটানো পুরোপুরি বেআইনি।

এরপরও ১৯৭৬ সালে ভারত সরকার 'দি মিনিমাম ওয়েজ অ্যাক্ট'-এর প্রণয়ন করে সাফ জানিয়েছে, ন্যূনতম মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির সর্বাধিক ৩ বছর পর্যন্ত কারাবাস এবং জরিমানা-বাবদ নগদ ২ হাজার টাকা দিতে হবে। ইন্ডিয়ান পেনাল কোডেও বেগার খাটানো এক দণ্ডনীয় অপরাধ।

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ১৯৭৬ সালে বেগার শ্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরে সেইসময়ে সরকারি উদ্যোগে বেগার শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছেন কত সংখ্যক শ্রমিক এই সংক্রান্ত খতিয়ান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত সাতের দশক এবং আটের দশকজুড়ে সরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসনেরও ব্যবস্থা করা হয় একই সঙ্গে।

কিন্তু নয়ের দশক থেকে যাঁদের বেগার শ্রমে নিযুক্ত করা হয়েছে, তাঁদের চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়াটাই শ্লথ হয়ে পড়েছে। তবে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রক এই সংক্রান্ত যে রিপোর্টটি পেশ করেছে, সেই অনুযায়ী, ভারতে এখন ৩ লক্ষ নাগরিক বিনা মজুরিতে অথবা অতি স্বল্প মজুরিতে বেগার খাটছেন। বেশিরভাগ সময়ে দুর্দিনে উচ্চবর্ণের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ ফেরত দিতে না পারাতে এঁদের বেগার শ্রম দিতে হচ্ছে।

প্রাচীনকালেও এদেশে 'ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী' প্রথার চল ছিল। এই শোষণ যুগ যুগ পেরিয়েও আজও বহমান। এই পরিস্থিতিতে অবহেলা, নিপীড়নের যে শৃঙ্খলে আবদ্ধ ভারতমাতার সন্তানদের একাংশ, সেই শৃঙ্খলের মোচন হবে কবে, এই প্রশ্নের উত্তর আজও অনুচ্চারিত। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বেগার শ্রমের রীতি এদেশের সমাজব্যবস্থায় বহাল জাতপাতের মাত্রাতিরিক্ত প্রাদুর্ভাবের কারণেই।

অথচ ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল নম্বর ৪২ এবং আর্টিকেল নম্বর ৪৩-এ পরিষ্কারভাবে উল্লেখ রয়েছে, বেগার শ্রম পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কাজের উপযুক্ত পরিবেশেই শ্রমিককে দিয়ে কাজ করাতে হবে। আর দিতে হবে যথাযথ পারিশ্রমিকও। অন্যথায় তা বেআইনি।

বেগার খাটা শ্রমিকদের আর্থসামাজিক সুরক্ষা দিতে বেগার শ্রম নিষিদ্ধ করতে দেশের যে রাজ্যগুলির সরকার সর্বাগ্রে পদক্ষেপ নিয়েছে সেই রাজ্যগুলির ভেতর রয়েছে ওড়িশা, রাজস্থান এবং কেরল।

বেগার খাটা নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ১৯৭৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকার পুনর্বাসন প্রকল্প চালু করে। এরপর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পরে ২০১৬ সালে ওই পুনর্বাসন আইনে কিছু রদবদল আনা হয়। খাতায়-কলমে এই যে পরিবর্তন সেও নিতান্তই কথার কথা হিসেবে থেকে গিয়েছে।

ভারতের মাটি থেকে জাতপাতের বৈষম্য যতদিন পর্যন্ত না সমূলে বিনষ্ট হবে, সেপর্যন্ত দরিদ্র, নিম্নবর্ণের মানুষকে জাতপাতের নিরিখে শোষণ চলবেই, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আসলে সর্ষের মধ্যেই ভূত থেকে গিয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবীদের মতে, অবহেলিত নিম্নবর্গের মানুষজনের জন্যে অবিলম্বে পেশাগত প্রশিক্ষণ শিবির চালু করা হোক। এই ব্যবস্থা নেওয়া হলে একদিকে স্বাবলম্বী হবেন নিপীড়িত নাগরিকরা, পাশাপাশি জীবনের প্রতি ওঁদের আত্মবিশ্বাসও বাড়বে। বেগার শ্রমে বাধ্যও করা যাবে না।

এদিকে বিধি বাম। একাধিক সমী্ক্ষায় দেখা যাচ্ছে, বেগার শ্রমের নিরিখে দেশের ভিতর প্রথম স্থানাধিকারী রাজ্য কর্নাটক। এরপরই তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে তামিলনাড়ু, উড়িষ্যা, উত্তরপ্রদেশ ও দক্ষিণ ভারতের আরেকটি রাজ্যে অন্ধ্রপ্রদেশ।

১৯৭৮ সালে বেগার শ্রমে নিযুক্তদের উদ্ধারের পরে কেন্দ্রীয় সরকার একটি প্রকল্প চালু করে নিপীড়িতদের পুনর্বাসনের স্বার্থে। ওই প্রকল্পের নাম 'রিহ্যাবিলিটেশন অব বন্ডেড লেবার'। এক্ষেত্রে উদ্ধারের পরে বেগার শ্রমে নিযুক্ত পুরুষদের মাথাপিছু ১ লক্ষ টাকা এবং মহিলা, শিশুদের মাথাপিছু ২ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তার কথা বলা হয়েছে। যদিও কার্যত এই-ই দেখা যাচ্ছে, বছরের পর বছর পেরিয়েও সরকার নির্ধারিত ওই আর্থিক সহায়তা মিলছে না।

লিখেছেন
Arnab Dutta
Arnab Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।