ই-জঞ্জালে ভরেছে কলকাতা, নরকে চোখ বুজে আছেন আপনি?

বাতিল যন্ত্র কেউ নিজের বাড়িতে বা অফিসে গুছিয়ে রাখে না। তার ঠাঁই হয় জঞ্জালে। এই জঞ্জাল জমতে জমতে এক ভয়াবহ বিপদের সৃষ্টি করছে।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
ই-জঞ্জালে ভরেছে কলকাতা, নরকে চোখ বুজে আছেন আপনি?

প্লাস্টিক দূষণ আমাদের কাছে একেবারেই নতুন কিছু নয়। প্লাস্টিক এখন সমুদ্রের গভীরতম জায়গায়, সদ্যোজাত শিশুর রক্তে পাওয়া যায়। সেই প্লাস্টিক দূষণকে অন্য এক মাত্রায় পৌঁছে দিচ্ছে আধুনিক সভ্যতার অন্যতম কারিগর।

অতিমারী আমাদের পৃথিবীবাসীর জীবনকে যেভাবে প্রভাবিত করেছে, তার সঙ্গে শুধুমাত্র তুলনা চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। জীবনের সব পর্যায়ে, সমাজের সমস্ত আঙ্গিকে, রাষ্ট্রব্যবস্থার সব স্তরে, অর্থব্যবস্থার বন্টনে, সবদিকেই তার প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। পরিবেশও তার ব্যতিক্রম নয়। লকডাউনের দু'টি মাস কেবলমাত্র দূষণের হার কমে যায়। যা খুবই স্বাভাবিক ছিল, কারণ রাস্তায় গাড়ি ছিল না, বেশিরভাগ শিল্পই ছিল বন্ধ। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবার পৃথিবীকে দূষিত করার স্বাভাবিক পথে ফিরে আসি আমরা।

সবটা স্বাভাবিক হয়নি। একটা রাস্তা বন্ধ হয়েছে তো অন্যটি খুলে গেছে। প্রযুক্তির ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা বেড়ে গেছে বহুগুণ‌। বাড়ি থেকে কাজ বা ওয়ার্ক ফ্রম হোম করা কর্মীদের সংখ্যা বেড়েছে অনেকটাই। তাছাড়াও, অতিমারীর কারণে অর্থনীতির ধসে পড়া অনেককেই বিকল্প রাস্তা বাছতে বাধ্য করেছে। সেই বিকল্প রাস্তা অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে ইন্টারনেটের সুবাদে, এবং তার জন্য চাই যন্ত্র। বিভিন্ন প্রকারের গ্যাজেট।

আজ একটি গ্যাজেট আসে তো কাল তার থেকেও উন্নত যন্ত্র বাজারে চলে আসে। যখনই উন্নত কোনও কম্পিউটার বা ফোন বাজারে আসে, তখন ক্রয়ক্ষমতার জেরেই হোক, বা নিতান্তই প্রয়োজনের খাতিরে, পুরনো যন্ত্র বাতিল হয়ে যায়। বাতিল যন্ত্র কেউ নিজের বাড়িতে বা অফিসে গুছিয়ে রাখে না। তার ঠাঁই হয় জঞ্জালে।

এই জঞ্জাল জমতে জমতে এক ভয়াবহ বিপদের সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে গৃহ উৎপাদিত ই-ওয়েস্ট বা বাতিল গ্যাজেট। কর্পোরেট সংস্থাগুলি তাও অনুমোদিত সংস্থার সাহায্য নেয় এই কাজে। কিন্তু সেটা সাধারণ ব্যবহারকারীদের থেকে আশা করা যায় না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আমাদের ভুলে চরম বিশৃঙ্খলা প্রকৃতিতে, ভয়াবহ মাশুল গুণতে হবে, বলছে গবেষণা

মানুষের কার্যকলাপের জন্যে প্রকৃতি ক্রমেই তুমুল বিশৃঙ্খলতার দিকে এগোচ্ছে, এমনই জানাচ্ছে পর্তুগালের ইউনিভার্সিটি অফ পোর্তোর গবেষকদের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা। যেখান থেকে জানা যাচ্ছে, যত সময় এগোবে, প্রকট হবে সেই বিশৃঙ্খলতা।

এই যে বৈদ্যুতিন বর্জ্য জমা হচ্ছে প্রতিনিয়ত, এটা আমাদের সকলকে এক বিশাল বিপদের মুখে ঠেলে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বেশিরভাগ যন্ত্রই তৈরি হয় প্লাস্টিক থেকে, এবং শুধু তাই নয়, এইসব যন্ত্রের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয় প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক। এই পুরনো যন্ত্র এবং ব্যাটারিগুলি যেখানেই থাকে, সেখানেই তীব্র হারে দূষণ ঘটায়। সেইসব বিষাক্ত রাসায়নিক স্বাস্থ্য, পরিবেশ সবকিছুর জন্যই খুব ক্ষতিকারক।

উদাহরণস্বরূপ আমাদের কম্পিউটার এবং মোবাইল ফোনের মাদারবোর্ড এবং সার্কিট বোর্ডকেই ধরা যাক। যারা এই সব বর্জ্য সংগ্রহ করেন, তাদের তো স্বাস্থ্যহানি হয়ই। সেই সঙ্গে তাঁদের চেতনার অভাবের কারণে তাঁরা সেইসব বাতিল যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ থেকে দামি দামি বস্তু তুলে নিয়ে বাকিটা মাটির তলায় চাপা দেন, বা জলে ফেলে দেন। বেশিরভাগ বর্জ্যই পুনর্ব্যবহার করার জন্য কোথাও পাঠানো হয় না।

কিছু তথ্য এখানে দিয়ে রাখা খুব প্রয়োজন।

ভারত বৈদ্যুতিন বর্জ্য তৈরি করায় বিশ্বে পঞ্চম। বছরে ১.৭ লক্ষ মেট্রিক টন।

প্রায় সাড়ে চার লক্ষ শিশু শ্রমিককে এই বর্জ্য সরানোর কাজে ব্যবহার করা হয়।

বৈদ্যুতিন বর্জ্য সংক্রান্ত আইন আমাদের জন্যে রয়েছে। যা হল E-waste Management and Handling Rules, 2012 এবং Hazardous Waste Amended Rules, 2003। কিন্তু সরকার এই আইন প্রয়োগে চূড়ান্ত ভাবে ব্যর্থ।

আমাদের দেশ বর্জ্য উৎপাদনে পঞ্চম হলেও তার পুনর্ব্যবহার করার ব্যবস্থায় বা Recycling-এ অনেক পিছিয়ে এবং এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার তীব্র অভাব রয়েছে।

আগেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বৈদ্যুতিন বর্জ্যে প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত রাসায়নিক থাকে। সেই সংখ্যাটা হাজারও ছাড়িয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে।

সবথেকে বেশি চিন্তার হলো, এই বিষয়ে সচেতনতার তীব্র অভাব। যে কারণে ক্ষমতায় আসীন নেতারাও এই বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। এই বর্জ‍্য জমতে জমতে একদিন আমাদেরই গিলে খাবে, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে। নির্দিষ্ট সরকারি নীতি এবং সেইসঙ্গে তার সঠিক প্রয়োগই একমাত্র সমাধান। যত খরচসাপেক্ষই হোক না কেন, সরকার ভর্তুকি দিয়ে পুনর্ব‍্যবহার পরিকল্পনা (Recycling Facilities) না গড়ে তুললে আগামী দিনে আমরা ঘোর বিপদের সম্মুখীন হতে চলেছি। এখনই যদি এই সমস্যার সমাধানে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা আর কিছু করার অবস্থায় থাকব না।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?