ই-জঞ্জালে ভরেছে কলকাতা, নরকে চোখ বুজে আছেন আপনি?

প্লাস্টিক দূষণ আমাদের কাছে একেবারেই নতুন কিছু নয়। প্লাস্টিক এখন সমুদ্রের গভীরতম জায়গায়, সদ্যোজাত শিশুর রক্তে পাওয়া যায়। সেই প্লাস্টিক দূষণকে অন্য এক মাত্রায় পৌঁছে দিচ্ছে আধুনিক সভ্যতার অন্যতম কারিগর।

অতিমারী আমাদের পৃথিবীবাসীর জীবনকে যেভাবে প্রভাবিত করেছে, তার সঙ্গে শুধুমাত্র তুলনা চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। জীবনের সব পর্যায়ে, সমাজের সমস্ত আঙ্গিকে, রাষ্ট্রব্যবস্থার সব স্তরে, অর্থব্যবস্থার বন্টনে, সবদিকেই তার প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। পরিবেশও তার ব্যতিক্রম নয়। লকডাউনের দু'টি মাস কেবলমাত্র দূষণের হার কমে যায়। যা খুবই স্বাভাবিক ছিল, কারণ রাস্তায় গাড়ি ছিল না, বেশিরভাগ শিল্পই ছিল বন্ধ। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবার পৃথিবীকে দূষিত করার স্বাভাবিক পথে ফিরে আসি আমরা।

সবটা স্বাভাবিক হয়নি। একটা রাস্তা বন্ধ হয়েছে তো অন্যটি খুলে গেছে। প্রযুক্তির ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা বেড়ে গেছে বহুগুণ‌। বাড়ি থেকে কাজ বা ওয়ার্ক ফ্রম হোম করা কর্মীদের সংখ্যা বেড়েছে অনেকটাই। তাছাড়াও, অতিমারীর কারণে অর্থনীতির ধসে পড়া অনেককেই বিকল্প রাস্তা বাছতে বাধ্য করেছে। সেই বিকল্প রাস্তা অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে ইন্টারনেটের সুবাদে, এবং তার জন্য চাই যন্ত্র। বিভিন্ন প্রকারের গ্যাজেট।

আরও পড়ুন: আমাদের ভুলে চরম বিশৃঙ্খলা প্রকৃতিতে, ভয়াবহ মাশুল গুণতে হবে, বলছে গবেষণা

আজ একটি গ্যাজেট আসে তো কাল তার থেকেও উন্নত যন্ত্র বাজারে চলে আসে। যখনই উন্নত কোনও কম্পিউটার বা ফোন বাজারে আসে, তখন ক্রয়ক্ষমতার জেরেই হোক, বা নিতান্তই প্রয়োজনের খাতিরে, পুরনো যন্ত্র বাতিল হয়ে যায়। বাতিল যন্ত্র কেউ নিজের বাড়িতে বা অফিসে গুছিয়ে রাখে না। তার ঠাঁই হয় জঞ্জালে।

এই জঞ্জাল জমতে জমতে এক ভয়াবহ বিপদের সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে গৃহ উৎপাদিত ই-ওয়েস্ট বা বাতিল গ্যাজেট। কর্পোরেট সংস্থাগুলি তাও অনুমোদিত সংস্থার সাহায্য নেয় এই কাজে। কিন্তু সেটা সাধারণ ব্যবহারকারীদের থেকে আশা করা যায় না।

এই যে বৈদ্যুতিন বর্জ্য জমা হচ্ছে প্রতিনিয়ত, এটা আমাদের সকলকে এক বিশাল বিপদের মুখে ঠেলে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বেশিরভাগ যন্ত্রই তৈরি হয় প্লাস্টিক থেকে, এবং শুধু তাই নয়, এইসব যন্ত্রের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয় প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক। এই পুরনো যন্ত্র এবং ব্যাটারিগুলি যেখানেই থাকে, সেখানেই তীব্র হারে দূষণ ঘটায়। সেইসব বিষাক্ত রাসায়নিক স্বাস্থ্য, পরিবেশ সবকিছুর জন্যই খুব ক্ষতিকারক।

উদাহরণস্বরূপ আমাদের কম্পিউটার এবং মোবাইল ফোনের মাদারবোর্ড এবং সার্কিট বোর্ডকেই ধরা যাক। যারা এই সব বর্জ্য সংগ্রহ করেন, তাদের তো স্বাস্থ্যহানি হয়ই। সেই সঙ্গে তাঁদের চেতনার অভাবের কারণে তাঁরা সেইসব বাতিল যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ থেকে দামি দামি বস্তু তুলে নিয়ে বাকিটা মাটির তলায় চাপা দেন, বা জলে ফেলে দেন। বেশিরভাগ বর্জ্যই পুনর্ব্যবহার করার জন্য কোথাও পাঠানো হয় না।

কিছু তথ্য এখানে দিয়ে রাখা খুব প্রয়োজন।

ভারত বৈদ্যুতিন বর্জ্য তৈরি করায় বিশ্বে পঞ্চম। বছরে ১.৭ লক্ষ মেট্রিক টন।

প্রায় সাড়ে চার লক্ষ শিশু শ্রমিককে এই বর্জ্য সরানোর কাজে ব্যবহার করা হয়।

বৈদ্যুতিন বর্জ্য সংক্রান্ত আইন আমাদের জন্যে রয়েছে। যা হল E-waste Management and Handling Rules, 2012 এবং Hazardous Waste Amended Rules, 2003। কিন্তু সরকার এই আইন প্রয়োগে চূড়ান্ত ভাবে ব্যর্থ।

আমাদের দেশ বর্জ্য উৎপাদনে পঞ্চম হলেও তার পুনর্ব্যবহার করার ব্যবস্থায় বা Recycling-এ অনেক পিছিয়ে এবং এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার তীব্র অভাব রয়েছে।

আগেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বৈদ্যুতিন বর্জ্যে প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত রাসায়নিক থাকে। সেই সংখ্যাটা হাজারও ছাড়িয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে।

সবথেকে বেশি চিন্তার হলো, এই বিষয়ে সচেতনতার তীব্র অভাব। যে কারণে ক্ষমতায় আসীন নেতারাও এই বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। এই বর্জ‍্য জমতে জমতে একদিন আমাদেরই গিলে খাবে, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে। নির্দিষ্ট সরকারি নীতি এবং সেইসঙ্গে তার সঠিক প্রয়োগই একমাত্র সমাধান। যত খরচসাপেক্ষই হোক না কেন, সরকার ভর্তুকি দিয়ে পুনর্ব‍্যবহার পরিকল্পনা (Recycling Facilities) না গড়ে তুললে আগামী দিনে আমরা ঘোর বিপদের সম্মুখীন হতে চলেছি। এখনই যদি এই সমস্যার সমাধানে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা আর কিছু করার অবস্থায় থাকব না।

More Articles

;