রিল মানে কি সহজেই হাততালির লোভ? 'রিয়েল'-কে পাশ কাটিয়ে কত দূর যাব আমরা?

সাংঘাতিক অস্থিরতা, ট্রেন্ডে থাকতে চাওয়া বাধ্যতামূলক জীবন মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে। দায়টা সকলের, দায়িত্বটাও সকলকেই ভাগ করে নিতে হবে।

Anwesa Bandyopadhyay
৪ মিনিট
রিল মানে কি সহজেই হাততালির লোভ? 'রিয়েল'-কে পাশ কাটিয়ে কত দূর যাব আমরা?

স্কুলের বদ্ধ নিয়মের গণ্ডি পার করে ফার্স্ট ইয়ারে পড়া অদ্রিজাকে পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নতুন ফোন কিনে দেয় অদ্রিজার মা-ই, ফোন ঘাঁটাঘাঁটির অভ্যেস যদিও অনেক আগে থেকেই, স্কুলের নোটস, প্রোজেক্টের হোমওয়ার্ক- সবকিছুই তো ফোনে। আমরা ফোনসর্বস্ব প্রজন্ম, অদ্রিজাই বা বাদ যাবে কেন তা থেকে? জন্মানোর পর থেকেই যেখানে শিশুকে খাওয়ানোর জন্য মোবাইল ফোন হাতে দিয়ে দেওয়া হয়, সেই প্রজন্ম কী করে ফোন থেকে দূরে থাকবে এবং কেনই বা থাকবে?

তবে যে সমস্যা নিয়ে আজ লিখতে বসেছি তা হলো, এখনকার অদ্রিজার সঙ্গে আগের অদ্রিজার তফাৎ। সোশ্যাল মিডিয়ায় বাধ্যতামূলকভাবে ট্রেন্ড ফলো করা থেকেই সেই সমস্যার শুরু। ছোটবেলা থেকে সমাজের চোখে তথাকথিত ফরসা, লম্বা, সুন্দরী অদ্রিজাকে বিয়েবাড়ি থেকে শুরু করে নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে সমাজই বারবার বলেছে মডেলিং করতে, অভিনয় করতে, গ্ল্যামার-জগতের ঝাঁ-চকচকে মোড়কে অদ্রিজার স্থান হবেই- এমনটাই দাবি ছিল ফুলকাকিমা, মিষ্টুপিসিদের, "এত সুন্দরী মেয়ে তুই, সিরিয়াল-সিনেমায় তো এক চান্সে বাজিমাত করবি!"

তাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নায়িকা সেজে নাচ-গান করলেও অঙ্কের টিউশনে স্যরের চোখরাঙানি, বাবার কড়া শাসন, পাশের বাড়ির পারমিতাদির বোর্ডে দুরন্ত রেজাল্ট করা আর কেরিয়ারের কথা কান ধরে মনে করিয়ে দেওয়া- এগুলোও ছিল। আর সঙ্গে এই আশ্বাসও জুটত, একবার স্কুলের গণ্ডি পেরোলেই স্বাধীন, তখন ওর ইচ্ছেতে আর কেউ বাধা দেবে না। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, টিকটক তার সেই স্বপ্নকে অনেক বাস্তবিক করেছে। ছোটবেলার অনেক না পাওয়া হাততালি, সাফল্য পাওয়ার পর না-পাওয়া ফিডব্যাক, মনের গভীরে যত্নে লালন হয়ে থাকা হীনম্মন্যতা, বহু পরিশ্রমের পরেও সফল না হওয়ার নিরাপত্তাহীনতা অনেক সহজ করে দিয়েছিল এই মাধ্যমগুলো। অনেক অদ্রিজাকেই তো আনন্দ দিয়েছে লকডাউনের ডালগোনা কফি থেকে শুরু করে ছাদে উঠে রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন, কাটিয়ে দিয়েছে অনেকটা অবসর সময়।

সমাজ-মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই বিষয়কে বলা হয় Bandwagon effect. যে প্রবণতা থেকে কিছু মানুষ এক ধরনের ব্যবহার, স্টাইল ধারণ করে, যা সবাই করছে। এটা মস্তিষ্কের একটি ভ্রম বা bias, যখন যা নিয়ে মাতামাতি হচ্ছে, তখন তার অংশীদার হওয়া। এত দূর অবধি অদ্রিজা মানসিকভাবে সুস্থ ছিল, স্বাভাবিক ছিল। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন অদ্রিজা বাধ্যতামূলকভাবে ইনস্টাগ্রামে ফেসবুকে ট্রেন্ডে থাকার জন্য, ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে এবং কেন লাইক, কমেন্ট, শেয়ারের সংখ্যা বাড়ছে না সেই নিয়ে তার রাতের ঘুম উড়ে যায়। মানসিক সমস্যা এবং জটিলতা শুরু হয় এই কষ্ট থেকেই। যে কষ্ট এই প্রজন্মের ইদানীং বাড়ছে, বেড়েই চলেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে Social media jealousy। অন্য মানুষ কতটা আনন্দে আছে, ভালো আছে, সেই ভাবনা থেকে এক ধরনের ক্রাইসিস শুরু হয় অনেকের।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
স্টারডমের দুনিয়া ক্ষমাহীন, পল্লবীদের দুঃখ বেড়ে বেড়ে ক্যানসার হয়ে ওঠে সেখানে

We are sad generation of people with happy pictures. আমরা প্রত্যেকে আমাদের আনন্দ উদযাপন করি দুঃখকে যথাসম্ভব রেখেঢেকে।

অনেকে এটা বুঝতে পারেন না, সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ নিজের মনের আনন্দের দিকটাই বেশি প্রকাশ করে, খুব কদর্যতা আমরা নিজেরাও বিশেষ তুলে ধরি কি? কিন্তু ওই যে মোড়ক, যার পিছনে ছুটতে থাকছে হাজার অদ্রিজা, সেটা bandwagon effect হোক বা social media jealousy- মানসিক অবস্থানের বিশেষ পরিবর্তন হচ্ছে না। ইঁদুর দৌড়ে একটু-আধটু সাফল্য, হাততালি পেলেও মন ভরছে না কিছুতেই, মনের ভার বাড়ছে। গত বেশ কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া আত্মহত্যাগুলি এই বিষয়গুলোকে আরও ইঙ্গিত করেছে। যাঁরা মূলত চর্চা এবং খ্যাতি গোলাচ্ছেন না, তাঁদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না সেইভাবে। কিন্তু মাথার পিছনে কেউ বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এমন দায় থেকে যেন কেউ কেউ বাধ্যতামূলকভাবে ইন্সটাগ্রামে বা ফেসবুকে ছবি বা ভিডিওতে কেন লাইকের সংখ্যা কম, কেন কমেন্টের গুঞ্জন হল না- তাই নিয়ে অবসাদে চলে যাচ্ছেন।

বিশ্বাস করুন, যাঁরা এটা ক্রমাগত, বাধ্যতামূলকভাবে করছেন, করেই যাচ্ছেন, তাঁদের দিকে আমরা, মনোবিদরা একেবারেই আঙুল তুলছি না। আসলে এখনকার সময় বা আমাদের জেনারেশন চায় ‘ফলোয়ার’। তোমার সোশ্যাল মিডিয়ায় যত বেশি ফলোয়ার, তত বেশি তুমি সাধারণ মানুষের কাছে পপুলার। আর এই তথাকথিত 'জনপ্রিয়' হওয়ার তাগিদ একটা গোটা প্রজন্ম যেন নিজেদের ব্যক্তিত্বকে বিলিয়ে দিচ্ছি আরও বেশি লাইক, আরও বেশি শেয়ারের লোভে। কিছু ভিডিও আপলোড হওয়ার কয়েক ঘণ্টায় ছাড়িয়ে যাচ্ছে হাজার লাইক, শেয়ার, সাবস্ক্রাইবার। অদ্রিজাদের মধ্যের অন্য অদ্রিজা চাগাড় দিয়ে উঠছে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য, অদ্রিজাদের ধৈর্য কমে যাচ্ছে, অদ্রিজারা অপেক্ষা করতে ভুলে যাচ্ছে, অল্প সময়ে বিপুলভাবে ভাইরাল হবার আকাঙ্ক্ষা রাতের ঘুম উড়িয়ে দিচ্ছে ট্রেন্ড ফলো না করতে পারার জন্য।

এই মুহূর্তে সবাই সকলেই একটি বিশেষ বাংলা গানের জনপ্রিয় ভিডিওতে নাচছে, কাজেই আমার মন যতই ভেঙে যাক, যতই গুঁড়িয়ে যাক, আমায় তা করতেই হবে, ট্রেন্ডে থাকতেই হবে। কারণ আগামিকালের ট্রেন্ড আজ রাতের মধ্যেই হুট করে বদলে যাবে। এবার এই 'আমাকেই দেখো’-র ইঁদুর দৌড়ে আমি কিন্তু আসলে অস্থির, ক্লান্ত, ভীত, অবসাদগ্রস্ত। এবং যদি মনের গভীরে প্রবেশ করি, তাহলে বুঝতে পারি, এই যন্ত্রণার শিকড়ও আছে অনেক ভেতরে। আমরা কিন্তু আসলে সকলেই চাইছি গ্রহণযোগ্যতা, ভালবাসা, বন্ধুত্ব, সহানুভূতি, প্রশংসা, যা আমাদের এই ক্ষমাহীন জীবনে ব্যাথায় লাগানো মলমের মতো কাজ করবে। ছোটবেলায় পাওয়া অসংখ্য অপমান, অমর্যাদা, হীনম্মন্যতা, নিরাপত্তাহীনতা- সমস্তকিছুই সেরে উঠবে সাফল্যের হাততালিতে।

সেই আকাঙ্ক্ষা, সেই চাওয়া কি ভুল তবে? একেবারেই নয়। সোশ্যাল মিডিয়া সেই সুযোগ কি একেবারেই করে দেয়নি অনেক মানুষকে? তাহলে সেই পথে এগিয়ে যাওয়া অদ্রিজাদের দিকে হাত তোলার আমি-আপনি কে? আমরাই তো ইন্ধন জোগালাম। লাইক, শেয়ার, কমেন্ট আমরাই করেছি। কিন্তু সত্যি করে পাশে থেকেছি কি? জানিয়েছি কি, এই পথ ঠিক নয়? যদি অভিনয়ই করতে হবে, তবে তার জন্যও শিক্ষার প্রয়োজন, সাধনার প্রয়োজন। কোনও শিল্পকে মাধ্যম করে স্টার হতে চাওয়া অনেক বড় ভুল পদক্ষেপ তো বটেই, তার সঙ্গে তা সেই শিল্পকেও অবমাননা করা।

উপায় আছে অনেক, আমরা যদি পারি একটু অন্য পথে ভাবতে, তবে মনের ওপর এত সাংঘাতিক চাপ পড়ে না। কিন্তু এই সাংঘাতিক অস্থিরতা, ট্রেন্ডে থাকতে চাওয়া বাধ্যতামূলক জীবন মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে। দায়টা সকলের, দায়িত্বটাও সকলকেই ভাগ করে নিতে হবে। যদি সম্ভব হয়, আমরা কথা বলি, আমরা মানসিকভাবে পাশে থাকি, ঠিক যেমন করে মোবাইল ফোন আসার আগে থাকতাম। তাতে ‘সব’ ঠিক হবে না। অদ্রিজারা কাল থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া জীবন থেকে মুছে ফেলবে না, কিন্তু তারা মানুষের সান্নিধ্য পাবে, ভার্চুয়াল জগতের লোকদেখানো হাততালি, পাশে থাকার প্রতিশ্রুতির বদলে একজন আসল মানুষের সান্নিধ্য পাবে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।