সফট ড্রিংকস না কি বিষ? নিজের অজান্তেই মারাত্মক বিপদ ডেকে আনছেন

চিনি-যুক্ত পানীয় অন্যান্য দিক থেকেও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এসব পানীয়তে কৃত্রিম চিনি ছাড়াও প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়। এর অতিরিক্ত সেবন স্থূলতার সমস্যা বাড়িয়ে দেয়।

Piya Saha
৩ মিনিট
সফট ড্রিংকস না কি বিষ? নিজের অজান্তেই মারাত্মক বিপদ ডেকে আনছেন

অ্যালকোহল লিভারের পক্ষে কতখানি ক্ষতিকারক, তা নতুন করে আজ বলতে হবে না। প্রতিদিন মদ্যপানের ফলাফল লিভার ক্যানসার, একথাও সকলেরই জানা। কিন্তু একই সমস্যায় ফেলতে পারে সফট ড্রিংকসগুলিও। অর্থাৎ, যাঁরা খুব আয়েশ করে কোল্ড ড্রিংকস খেয়ে ফেলেন, তাঁরা সাবধান হোন, কারণ এই পানীয়ও আপনাকে লিভার ক্যানসারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্লুকোজ-সমৃদ্ধ সোডার মতো পানীয়গুলি অ্যালকোহলের মতোই ক্ষতি করে শরীরের। গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, এই ধরনের পানীয়গুলিও লিভার ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।

নতুন গবেষণা কী বলছে ?

২০২২ নিউট্রিশন লাইভ অনলাইন ইভেন্ট সফট ড্রিংকস এবং লিভার ক্যানসার-সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র পেশ করা হয়। গবেষণার জন্য ৯০ হাজারেরও বেশি মহিলার শরীর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে একভাগ মহিলা ছিলেন, যাঁরা প্রায় প্রতিদিন গ্লুকোজ-সমৃদ্ধ এই পানীয়গুলি পান করেন। আর অন্যভাগে ছিলেন এমন মহিলা, যাঁরা মাসে তিনবারেরও কম এই ধরনের পানীয় গ্রহণ করেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অত্যধিক ধূমপান চরম ক্ষতি ডেকে আনছে কিডনির, জেনে নিন কীভাবে

যে পরিবারে আগে কেউ কিডনির রোগ বা ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন, সেই পরিবারে এই রোগ হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ২৫ গুণ বেশি। একে বলে ক্লিয়ার সেল কার্সিনোমা। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, মহিলাদের থেকেও পুরুষরা এই রোগের শিকার হয় বেশি।

গবেষকরা জানিয়েছেন, পোস্ট-মেনোপজ পর্যায়ে থাকা মহিলাদের লিভার ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। যদি তাঁরা দিনে অন্তত একবারও গ্লুকোজ-সমৃদ্ধ পানীয় পান করেন, তবে ক্যানসারের ঝুঁকি ৭৮% বেশি এই ধরনের মহিলাদের। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউট্রিশন বিভাগের অধীনে টিএইচ চান স্কুল অফ পাবলিক হেলথ-এর অধ্যাপক ড. জুহং ঝাং বলেছেন, 'আমাদের গবেষণা থেকে জানা গেছে, সুগার-সমৃদ্ধ পানীয়গুলি লিভার ক্যানসারের সম্ভাবনা অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। তাই আমাদের গবেষণার ফলাফলকে সত্য ধরে এগোলে লিভার ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়তে গেলে এই ধরনের পানীয় গ্রহণ কম করতে হবে। তবেই সুস্থ থাকা যাবে।'

তিনি আরও বলেছেন যে, আগের তুলনায় এখন মানুষ অনেক কম এই পানীয় গ্রহণ করেন। ২০১৭-'১৮ সালেও প্রাপ্তবয়স্ক সাদা চামড়ার মানুষদের ৬৫ শতাংশই দিনের কোনও এক সময়ে সুগার-সমৃদ্ধ পানীয় গ্রহণ করতই। তবে ঝাং গবেষণা-সংক্রান্ত আরও একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন যে, এর থেকে কিন্তু প্রমাণ হয় না, শুধুমাত্র গ্লুকোজ-সমৃদ্ধ পানীয়র কারণেই লিভার ক্যানসার হয়। তবে দুইয়ের মধ্যে যোগ অবশ্যই রয়েছে। তাই এই ধরনের পানীয় গ্রহণের ব্যাপারে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

চিকিৎসক ট্রিস্টা বেস্ট এই প্রসঙ্গে বলেছেন, 'সোডা লিভারের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকারক। সোডার কারণে লিভারে ফ্যাট জমতে থাকে, যার ফলে নানা ধরনের লিভারের রোগ দেখা দেয়। এর প্রধান কারণ হল সোডার মধ্যে থাকা পরিশ্রুত চিনি এবং উচ্চ ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাপ। এর আগেও কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে পাওয়া গেছে যে, পরিশোধিত চিনি লিভারে অ্যালকোহলের থেকেও বেশি ক্ষতি করে, বিশেষত অত্যধিক মাত্রায় গ্রহণ করলে। এতে উপস্থিত ফ্রুক্টোজ হজম করতে লিভারকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়, যার কারণে অনেক সময় লিভার ফুলে যায়। তাই যুবক, শিশু-সহ যে কোনও বয়সের মানুষেরই উচিত এই ধরনের পানীয় এড়িয়ে চলা।'

সফট ড্রিংকসের মারাত্মক ফলাফল

সম্প্রতি 'গুট’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, প্রাপ্তবয়স্করা, যাঁরা প্রতিদিন দুই বা তার বেশি গ্লুকোজযুক্ত পানীয় পান করেন, তাঁদের কোলন ক্যানসারের ঝুঁকিও দ্বিগুণ হয়। বিশেষত, মহিলাদের এর থেকে আরও বেশি সতর্ক হওয়া দরকার, কারণ ৫০ বছর বয়সে পৌঁছনোর আগে তাঁদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এ-বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, চিনি-যুক্ত পানীয় অন্যান্য দিক থেকেও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এসব পানীয়তে কৃত্রিম চিনি ছাড়াও প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়। এর অতিরিক্ত সেবন স্থূলতার সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। ক্রমবর্ধমান স্থূলতার কারণে অকাল হার্ট অ্যাটাক, ব্লাড প্রেশার, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোনের সমস্যা অল্প বয়সেই ব্যক্তিকে কাবু করে ফেলে। হার্ভার্ডের গবেষকরা জানিয়েছেন, সফট ড্রিংকসের সঙ্গে সরাসরি স্থূলতার সম্পর্ক রয়েছে। ১২ বছর বয়সি শিশুদের নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুরা সোডা পান করে, তাদের মধ্যে স্থূলতার হার বেশি। নিয়মিত সফট ড্রিংকস গ্রহণ করলে স্থূলতার ঝুঁকি দেড় গুণেরও বেশি বেড়ে যায়।

এছাড়া সফট ড্রিংকসে অতিমাত্রায় ফসফোরিক অ্যাসিড থাকায় তা শরীরে ক্যালসিয়াম সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে, যার ফলে অস্টিওপোরোসিস হতে পারে। ফসফরিক অ্যাসিড পাকস্থলীতে বিক্রিয়া করে খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণে বাধার সৃষ্টি করে এবং হজম প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণ হতে পারে। নিয়মিত সফট ড্রিংকস গ্রহণ করলে দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ধরনের পানীয় দীর্ঘদিন পান করলে ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। গর্ভবতী মহিলাদের সন্তান বিকলাঙ্গ হতে পারে। মুখের স্বাদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সঙ্গে মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠতে পারে। তাই সফট ড্রিংকস পান করার আগে দশবার ভাবুন।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।