একাই ৭ উইকেট, বল হাতে সেদিন গোরাদের ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন বোলার বিবেকানন্দ

By: Susen

September 6, 2021

Share

স্বামী বিবেকানন্দ ।। ছবি সৌজন্যে : Google

সুসেন: পড়াশোনায় বরাবরই ভাল. তাই সিমলের দত্তবাড়ির ছেলেটি ভর্তিও হয়েছিল প্রেসিডেন্সি কলেজে বা তখনকার হিন্দু কালেজে। কিন্তু বাদ সাধল ম্যালেরিয়া। একেবারে কাবু করে ফেলল। শরীর এতটাই খারাপ হল যে পরীক্ষায় বসতে পারল না। অগত্যা ভর্তি হতে হল জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে (অধুনা স্কটিশ চার্চ কলেজ)। এরপর সেখান থেকেই এফ এ আর বি এ পাশ। উত্তর কলকাতার অত্যন্ত বিত্তশালী নামী পরিবারে প্রখ্যাত আইনজীবির ছেলে। ছোটবেলা থেকেই তার চেহারাটা চোখে পড়বার মতো ! অম্বু গুহের আখড়ায় ব্যায়াম করে দুর্দান্ত স্বাস্থ্য তৈরি হয়েছিল! নিয়মিত কুস্তি করত। লাঠিখেলা, ফেনসিং এসবেও চৌখস ছিল। একটা শো-তে বক্সিং চ্যাম্পিয়ন হয়ে রুপোর প্রজাপতিও প্রাইজ পেয়েছিল। আর হ্যাঁ! ক্রিকেট ও অসম্ভব ভাল খেলত ছেলেটা।

১৭৯২ সালে ব্রিটিশরা বালিগঞ্জে ‘ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব’-এর প্রতিষ্ঠা করে। যা গ্রেট ব্রিটেনের বাইরে অন্যতম প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব। এটি ছিল যেন শাসক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মূর্ত প্রতীক এবং তাদের প্রতিনিধিত্বকারী ক্লাব। অন্যদিকে, ১৮৮৪ সালে টাউন ক্লাবের গোড়াপত্তন পূর্ববঙ্গের কিশোরগঞ্জে মশুয়া গ্রামে। বিখ্যাত রায়চৌধুরী পরিবারের সন্তান, গণিতবিদ এবং উপমহাদেশে ক্রিকেটের অগ্রদূত সারদারঞ্জন রায়ের হাতে। বলে রাখা ভালো যে, তিনি কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের দাদু উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর বড় ভাই ছিলেন। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী এই টাউন ক্লাবের মাধ্যমেই ক্রিকেটে এসেছিলেন আমাদের সকলের পরিচিত ‘বিলে’। নরেন্দ্রনাথের ক্রিকেট প্রীতির প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে এই টাউন ক্লাব আর তাঁর প্রতিষ্ঠাতা সারদারঞ্জন প্রসঙ্গে কয়েকটি বিষয় জানানো জরুরি।

একাই ৭ উইকেট, বল হাতে সেদিন গোরাদের ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন বোলার বিবেকানন্দ

স্বামী বিবেকানন্দ স্টেডিয়াম ।। ছবি সৌজন্যে : Google

পাঁচ ভাই – সারদারঞ্জন, উপেন্দ্রকিশোর, মুক্তিদারঞ্জন, কুলদারঞ্জন আর প্রমদারঞ্জন মিলে গড়েছিলেন ঢাকা কলেজ ক্রিকেট ক্লাব। পরে টাউন ক্লাবও গড়েন কলকাতায়। দু’দলেরই ক্যাপ্টেন বাংলার ডবলিউ জি গ্রেস সারদারঞ্জন। দু’দলই নিয়মিত সাহেবদের দলের বিরুদ্ধে খেলত। বাংলায় জেলাভিত্তিক ক্রিকেট দল গড়ে তাঁরা টুর্নামেন্টের আয়োজন করতে থাকেন। ক্রিকেটের নিয়মকানুন নিয়ে প্রথম বাংলায় লেখা বই লেখেন এই সারদারঞ্জনই। তিনি লিখেছেন, ‘ঢাকার কলেজের সাহেব প্রফেসরগণ এ বিষয়ে (ক্রিকেট) খুব উৎসাহী হইয়া ছেলেদের শিক্ষা দিতেন। এখনও বাঙ্গালী ছেলেদের মধ্যে যাঁহারা এ খেলার প্রশংসা লাভ করিয়াছেন, তাহাদের অধিকাংশ ঢাকার। ১১ বছর হইল পূর্ববঙ্গের ছেলেরাই প্রথম কলিকাতা শহরে প্রেসিডেন্সি কলেজে ক্লাব খুলিয়া খেলা আরম্ভ করেন।’ ১৮৮৪ সালে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে ক্যালকাটা প্রেসিডেন্সি ক্লাবের সঙ্গে এক খেলায় ঢাকা কলেজ জয়লাভ করে। নেতৃত্বে ছিলেন সারদারঞ্জন রায়। ছাত্র হিসেবেও ছিলেন তুখোড়। বিএ পরীক্ষায় ঢাকা অঞ্চলে প্রথম।

আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন সারদারঞ্জন। পরে অধ্যাপক হিসেবে ফেরেন নিজের ঢাকা কলেজে। পাশাপাশি চলতে থাকে ক্রিকেটও।
তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের সঙ্গে খেলতে ঢাকা কলেজের একটি দল কলকাতা যায়। ছাত্র-শিক্ষক মেশানো সেই দলে ছিলেন তিন ভাই সারদা, কুলদা ও প্রমদা। প্রথম খেলায় প্রেসিডেন্সি হেরে গেলে তাদের ছাত্ররা দল থেকে শিক্ষকদের বাদ দেওয়ার দাবি তোলেন। সারদা এতে জোরালো আপত্তি করেন। কিন্তু কলেজের ব্রিটিশ অধ্যক্ষ বুথ ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাবের ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের অনুরোধে রাজি হয়ে যান। এ নিয়ে সারদারঞ্জনের সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য হয়। ঢাকা কলেজ থেকে পদত্যাগ করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনুরোধে তিনি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউটে যোগ দেন। কিন্তু সেখানে অর্থসংকট থাকায় গোড়াতেই তাঁর বেতন অনিয়মিত হয়ে যায়। তখন এস রায় অ্যান্ড কোম্পানি নামে তিনি বই আর ক্রিকেট পণ্য বিক্রি শুরু করেন। কলকাতায় ১৮৯৫ সালে শুরু করেন বাংলার সম্ভবত পরাধীন ভারতেরও প্রথম ক্রিকেট সামগ্রীর দোকান। তখন বিলেতি ব্যাট ও বল পাওয়া যেত কেবল তাঁর দোকানেই। শিয়ালকোট থেকে আনা উইলো কাঠে শিক্ষার্থীদের জন্য সস্তায় ব্যাট বানানো শুরু হয় তাঁর যশোর রোডের কারখানায়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা দরকার যে, ওই সময়ে সিসিসি, কলকাতা রেঞ্জার্স, ডালহৌসি এসি প্রভৃতি ক্লাবগুলি ব্রিটিশদের দ্বারা গঠিত। তারা দীর্ঘকাল ধরে ব্রিটিশদের প্রতিনিধিত্ব করেছিল। টাউন ক্লাব, এরিয়ান ক্লাব, কুমারটুলি ইনস্টিটিউট, স্পোর্টিং ইউনিয়ন এবং বেঙ্গল জিমখানা ছিল আপাদমস্তক বাঙালির। মোহনবাগান (১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত) এবং ইস্টবেঙ্গল (১৯২০) ক্রিকেটে দল গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে শুরু করেছিল।

ব্রিটিশরা তখন এই সদ্য বেড়ে ওঠা কলকাতা শহরে ‘ন্যাশনাল টাইমপাস’ হিসেবে বেশ জমিয়ে ক্রিকেট খেলছে। এহেন পরিস্থিতিতে হেমবাবু, বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ, কয়েক’জন বাঙালি যুবককে নিয়ে টাউন ক্লাবের জন্য ক্রিকেট দল তৈরি করে জোরকদমে অনুশীলন শুরু করে দিলেন। নরেন্দ্রনাথ নামে আমাদের বহু পরিচিত বলিষ্ঠ যুবকটিও হেমবাবুর চোখে পড়লেন। ক্রিকেট খেলবেন কি না জিজ্ঞাসা করাতে সদ্য যুবা নরেন জানালেন, ‘সুযোগ পেলে চেষ্টা করে দেখতে পারি!’ হেমবাবু বুঝলেন যুবকটির যা চেহারার গঠন, তাতে তিনি বেশ ভাল বোলার হতে পারবেন। প্র্যাকটিস করানোর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘মনটাকে ঠিক রাখবে, দেখবে হাতের থেকে বল আপনিই লক্ষ্যে গিয়ে আছড়ে পড়বে!’ হেমবাবুর এমত দার্শনিক বার্তা দর্শনের এই ছাত্রটির মনে ধরল। তিনি নিয়মিত অনুশীলন শুরু করলেন।

বিভিন্ন দলের সঙ্গে ক্রিকেট ম্যাচ খেলে আর নিয়মিত অনুশীলনে নরেন্দ্রনাথ দত্ত ততদিনে হয়ে উঠেছিলেন টাউন ক্লাব দলের একজন অপরিহার্য বোলার। এরপর এল সেই দিন, ইডেন গার্ডেনে দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মূ্র্ত প্রতিভূ ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাবের সঙ্গে টাউন ক্লাবের ম্যাচ। শোনা যায়, খেলার উত্তেজনায় এতটাই আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন নরেন্দ্র যে, তাঁকে শান্ত হয়ে নিজের বোলিংয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন হেমচন্দ্র। এরপর যা ঘটল, তা ইতিহাস। ব্রিটিশদের টিম ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব স্কোরবোর্ডে ২০ রান তখন অনেক ‘কষ্টে’ যোগ করেছে। কষ্টে— কারণ, ওইটুকু রান তুলতেই তাদের হারাতে হয়েছে সাত-সাতটি উইকেট। আর সাত-তাড়াতাড়ি বিপক্ষের অধিকাংশ ব্যাটসম্যানকে আউট করে বিবেকানন্দ একাই নিয়েছিলেন ৭ উইকেট!। বল হাতে সেদিন যেন গোরাদের ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন নরেন্দ্রনাথ। ১৮৮৭ সালে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন স্বামীজি। তার প্রায় দু’বছর আগে পর্যন্ত টাউন ক্লাবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। নিয়মিত ক্রিকেটও খেলতেন। ফুটবল অনুরাগীও ছিলেন। আর দুটোই খেলতেন টাউন ক্লাবের হয়ে। যুবসমাজকে গীতা পাঠের থেকে ফুটবল খেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। নিজের জীবনেও যে একই পথে অনুশীলন চালিয়েছিলেন বেশ কিছু বছর তার অকাট্য প্রমাণ বোলার বিবেকানন্দের সেই অসাধারণ পারফরম্যান্স।

তথ্যসূত্র – সহাস্য বিবেকানন্দ – শঙ্করীপ্রসাদ বসু, সুবর্ণজয়ন্তী সংকলন – টাউন ক্লাব, bongodorshon.com

More Articles