'মহামেডান' বলেই আই লিগ জয়েও উদাসীন কলকাতা?

Mohammedan SC I-League: রমজান মাসে মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের আই লিগ চাম্পিয়ন হওয়া এই মুহূর্তে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে বড় জয়।

Joyraj Bhattacharjee
৩ মিনিট
'মহামেডান' বলেই আই লিগ জয়েও উদাসীন কলকাতা?

এরকম অনেক বাঙাল দেখেছি কট্টর মোহনবাগানি। ঘটি ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টারও কিছু কম নেই। কিন্তু পদবি হিন্দু অথচ মহামেডান স্পোর্টিংয়ের সাপোর্টার, এ ঘটনা বিরলের মধ্যেও বিরল। ফুটবলের আবার হিন্দু-মুসলমান কী! এই বলে যাঁরা বিরক্ত বোধ করছেন, সেই অসাম্প্রদায়িক ফুটবল প্রেমিকদের অনুরোধ করব সাহিত্যিক এবং কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাততম উপন্যাস শ্রীকান্তর প্রথম অনুচ্ছেদটুকু আর একবার পড়তে। সেখানে আখ্যান শুরুই হয়, বাঙালিদের সঙ্গে মুসলমানদের ফুটবলা খেলা দিয়ে। বাঙালি মননে এই ভাবনা নর্মালাইজড হয়ে যায়, মুসলমান হলে বাঙালি হতে পারে না।

সারা পৃথিবীতে ফিরে আসছে একটা ভাবনা, অথবা বলা যেতে পারে একটা বিরাট ভাবনার সামান্য দুটো শব্দে প্রকাশ- 'এথনিক ক্লিনজিং'। রেমন্ড একটা নতুন পোশাকের ব্র‍্যান্ড লঞ্চ করেছে, যার নাম এথনিক্স। এই ধাঁচেরই আর একটা অতি জনপ্রিয় ব্র‍্যান্ড মান্যবর। কিছু বছর আগেও ভারতের মতো নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের দেশে ওরকম পোশাক পরে ঘোরাফেরা করলে পাড়ায় বেঞ্চে বসিয়ে তাঁর মাথায় জলটল ঢালা হতো। কিন্তু কী আর করা যায়! সময় যেমন এসেছে! এখন সংখ্যাগুরুকে বোঝানো গেছে, কোনও এক সুদুর অতীতে ওরকম প্রাণ হাঁসফাঁস করা পোশাক পরেই সকলে দৈনন্দিন কার্য চালাতেন। জানতে বড় সাধ হয়, কিনতে যাওয়ার আগে, শোরুমে কেউ প্রশ্ন করেছেন কিনা, এই পোশাক পরে বা খুলে বা তুলে খাঁটি ভারতীয় এথনিক পদ্ধতিতে শৌচ সম্ভব কিনা! আমরা আদিতে এমন ছিলাম, আর ওইরকম থাকাটাই খাঁটি থাকা, তাই আবার ওইরকম হয়ে উঠতে হবে, আর যারা ঠিক ওইরকম নয়, তারা হচ্ছে অপর। এইভাবে অপরকে চিহ্নিত করে, আত্মর নির্মাণ করা এবং আত্মর থেকে অপরের সমস্ত বৈশিষ্ট্য মুছে দেওয়া বা ক্লিন করাই হচ্ছে এথনিক ক্লিনজিং। ফুটবল ঠিক এর উলটো কাজটা করে। আমাদের সংবিধানের যে ভাবনা, তার সারবস্তু রয়েছে ফুটবলে। এখানে একটা টিম তখনই শক্তিশালী টিম, যখন সেই টিম বৈচিত্র্যময়। ইতিহাস বইতে যে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য আমরা নবম শ্রেণিতে পড়তাম, যা ইদানীং কালে আর পড়ানো হচ্ছে না, তার উদাহরণ ফুটবল টিম। একটা ভালো দেশও সেরকমই। সেকারণেই ফুটবল বারবার যে কোনও দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের অন্যতম তারিকা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বন্দুকের নলের মুখে অসহায় সাংবাদিক! সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়েছিলেন এই ফুটবলার

Last World Cup of Maradona: মারদোনা এবং গতির রাজা কানিহিয়াকে [ক্যানিজিয়া] ছাড়া আরহেন্তিনা ছিটকে পড়ল।

দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে পরিচিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক গুরু ছিলেন এলাবার্ট লুথিনি। লুথিনি আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নেতা যিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। লুথিনি কর্মসূত্রে থাকতেন নাটালে। নাটালে তখন পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিড়। বাড়ির থেকে বহুদূরে, কোনওমতে একটা কাজ জুটিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকা, এইসব গরিব পরাধীন মানুষগুলোর একমাত্র মুক্তি ছিল বিকেলের অবসরে ফুটবল খেলা। এই মুক্তির বোধকেই সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত করেন লুথিনি। ফুটবলের লড়াই হয়ে ওঠে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার লড়াই, বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই। একই রাজনৈতিক বিন্যাস দেখা যাবে লাতিন আমেরিকায়। যারা আমাদের দেশে ফুটবল এনেছে, তারাই এনেছে দাসত্ব আর পরাধীনতা। তাদের খেলায় আমরা তাদেরই হারিয়ে দিই। ফুটবল জিতে যাওয়ার আনন্দ পেতে শেখায় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়াকে, গোটা লাতিন আমেরিকাকে।

তেমনই আমাদের দেশে ১৯১১, মোহনবাগানের শিল্ড জয়। আজ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের যে ইতিহাস স্কুলে পড়ানো হয়, তাতে মাস্টারদা, ক্ষুদিরামের পাশাপাশি শিবদাস ভাদুড়ির কথাও আছে। কিন্তু নেই ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত টানা মহামেডান স্পোর্টিংয়ের লিগ জয়ের কথা। মুসলমানদের ক্লাব বলেই এই বিস্মরণ। ১৯১১ সালে শিল্ড জয়ের পর মোহনবাগান ক্লাবের কিন্তু পরের দুই দশকে কোনও বড় টুর্নামেন্ট জয় নেই। দেশে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জোয়ার, তাকে ফুটবল মাঠে ভাস্বর করেছে মহামেডান স্পোর্টিং। কিন্তু যতটা কদর এই সাফল্যের প্রাপ্য ছিল, তার ছিটেফোঁটাও জোটেনি। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে তুঙ্গ মুহূর্তেই যদি এই দশা হয়, তাহলে আজকের হিন্দু মহিমান্বিত দেশে মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের আই লিগ জয় কলকাতা শহর উদযাপন করবে কেন? ভদ্রলোক হিন্দু কলকাত্তাইয়া বাঙালি একে জয় না, নিজেদের হার মনে করছে। অথচ রমজান মাসে মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের আই লিগ চাম্পিয়ন হওয়া এই মুহূর্তে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে বড় জয়।

ইদের দিন মুখ্যমন্ত্রী, রেডরোডের জমায়েতে বললেন, বিজেপিকে ভোট না দিয়ে, তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিতে। এরচেয়ে অনেক শ্লীল শুনতে লাগত তিনি যদি একবার মহামেডান স্পোর্টিংকে অভিনন্দিত করতেন। একবার যদি উচ্চারণ করতেন ক্লাবের স্লোগান, 'জান জান মহামেডান'! ওই রেড রোডেই মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের তাঁবুর কাছেই আম্বেদকরের মূর্তি। ইদের ক'দিন পরেই ১৪ এপ্রিল ভীমরাও আম্বেদকরের জন্মদিন ছিল। যে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ভাবনা আমাদের সংবিধানের প্রধান আকর, তার রূপকার আম্বেদকরের জন্মদিনেও, মহামেডান স্পোর্টিংয়ের জয়কে অভিনন্দিত করে আম্বেদকরের প্রতিই শ্রদ্ধা প্রকাশ করা যেত। এই রেড রোডে একটা সময়ে নেটিভ ভারতীয়দের চলাচল নিষিদ্ধ ছিল৷ লড়াই করে সে অধিকার আদায় করা গেছে। সেই লড়াইয়ে ফুটবলের অংশীদারত্ব রাজনৈতিক দলের সমধিক। আজ যখন ভারতে মুসলমান মানুষদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানানোর জিগির তোলা হচ্ছে, তখনও ফুটবল প্রতিরোধ গড়তে পারে। মহামেডান স্পোর্টিং প্রতিরোধের সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়িত করল। জান জান মহামেডান আজ শুধু ক্লাবের স্লোগান নয়, বৈচিত্র্যময় ভারতের স্লোগান। এই বৈচিত্র্য থাকলেই টিম জেতে, এই বৈচিত্র্য থাকলে টিম ইন্ডিয়া জিতবে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।