কেন হারাল সংস্কৃত ভাষা? প্রাণ ফেরা সম্ভব?

World Sanskrit Day: প্রাচীন সাহিত্য থেকে পুঁথি, শাস্ত্র থেকে মহাকাব্য, সমস্ত কিছুই রচনা হয়েছে যে ভাষায়, কালের স্রোতে ক্ষয়ে গিয়েছে সেই ভাষার মেরুদণ্ড। সামান্য কিছু স্কুলে বিকল্প বিষয় হিসেবে এবং পুরোহিতের মন্ত্রে শুধু বেঁচে রয়েছে সেই ভাষা।

Sohini Das
৩ মিনিট
কেন হারাল সংস্কৃত ভাষা? প্রাণ ফেরা সম্ভব?

ভাষা আসলে বহমান নদীর মতো। যে নদী স্রোত হারায়, সেই নদীর বুকে জমতে থাকে শ্যাওলা। ঠিক তেমন ভাবেই ব্যবহারের অভাবে ভাষার বুকেও জমতে থাকে পলি। ক্রমশ স্রোত হারায় সেই ভাষা। ঠিক যে ভাবে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে অজস্র ভাষা। সেই বিলুপ্তপ্রায় ভাষার মিছিলে নাম লিখিয়েছে সংস্কৃতও। সম্ভবত পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীনতম ভাষা।

সমীক্ষা বলছে, গত পাঁচ দশকে দু'শোর বেশি ভাষা মুছে গিয়েছে। আর তার কারণ একটাই, অব্যবহার। বিশেষ কিছু ভাষার আগ্রাসন সেই সব ভাষাব্যবহারকারীদের ক্রমশ কোণঠাসা করেছে। আর তাঁরাও নিজস্ব ভাষার শিকড় ছাড়িয়ে এসে ঢুকেছে মূল ভাষার স্রোতে। যার ফলে হারিয়ে গিয়েছে সেই সব ভাষা।

তবে সংস্কৃত এককালে ছিল রাজার ভাষা। প্রাচীন সাহিত্য থেকে পুঁথি, শাস্ত্র থেকে মহাকাব্য, সমস্ত কিছুই রচনা হয়েছে যে ভাষায়, কালের স্রোতে ক্ষয়ে গিয়েছে সেই ভাষার মেরুদণ্ড। সামান্য কিছু স্কুলে বিকল্প বিষয় হিসেবে এবং পুরোহিতের মন্ত্রে শুধু বেঁচে রয়েছে সেই ভাষা। এবং বলাই বাহুল্য শ্বাসবায়ু তার ধিকিধিকি। একটা সময় পর্যন্ত স্কুলগুলিতে সংস্কৃত শিক্ষা ছিল বাধ্যতামূলক। তবে ক্রমাগত দেখা গিয়েছে, সংস্কৃত পড়ে ভবিষ্যতে বৃহত্তর ক্ষেত্রে কোনও সুযোগসুবিধা মিলছে না। সংস্কৃত ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার পিছনে সেটাও একটা বড় কারণ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলা ভাষার হিন্দি-রোগ কিংবা হিন্দিযোগ

Hindi Infiltration in Bengali: ‘কেননা’ ছেড়ে অনেক বাঙালি হিন্দিভাষী শাশুড়ি-বউ অপেরার ‘কিঁউকি’ বলতে শুরু করলেন কেন?

একদিকে যখন সংস্কৃত ভাষা বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে ক্রমাগত, সরকার তখন জোর দিচ্ছে রাষ্ট্রভাষায়। ফলে এই যে ভাষার ক্ষয়ে যাওয়া, তার একটা বড় অংশের দায় বর্তায় সরকারের কাঁধেও। কারণ হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার কারিগরেরা জোর দিয়েছেন হিন্দির উপরে, তাতে আঞ্চলিক ভাষা যেমন মর্যাদা হারিয়েছে, তেমনই ক্ষয় পেয়েছে দেবভাষাও। অথচ হিন্দুত্ববাদীরা যে রামায়ণ নিয়ে এত গৌরব করে, কার্যত জয়শ্রীরাম জপ করে, সেই রামায়ণও কিন্তু লেখা হয়েছিল সংস্কৃততেই। অথচ সেই দেবভাষার কোনও গুরুত্ব নেই আজকের ভারতে।

যদিও বিশ্ব সংস্কৃত দিবস উপলক্ষে জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কতটা তাৎপর্যপূর্ণ এই ভাষা। সংস্কৃত ভাষায় একটি মাত্র বাক্য উচ্চারণ করে জাতিকে তিনি আওড়াতে বলেছেন তা। তাতেই নাকি সংস্কৃতকে উদযাপন করা হবে। টুইটার তথা মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্স-এও এই মর্মে শুভেচ্ছাবার্তা শেয়ার করেন তিনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মৃত ভাষায় কথা বলতে পারে তোতাপাখি! যে ঘটনা চমকে দিয়েছে বিশ্বকে...

Language of Parrot: হামবোল্ট তোতাপাখির প্রায় ৪০টি শব্দ রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

গত ২৭ অগস্ট, রবিবারই 'মন কি বাত' অনুষ্ঠানে সংস্কৃত ভাষার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন মোদি। জানিয়েছিলেন এই প্রাচীন ভাষা সম্পর্কে। বহু আধুনিক ভাষার জননী বলেও সংস্কৃতকে সম্বোধন করেন তিনি। পাশাপাশি সংস্কৃত ভাষা কেন বিজ্ঞানসম্মত এবং তার ব্যকরণগত দিকগুলোর কথাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি জানান, সংস্কৃত ভাষার সচেতনতা নাকি ইদানীং মানুষের মধ্যে বেড়েছে।

সত্যিই কি সংস্কৃত ভাষার দুর্দিন ঘুচেছে। না, আশপাশে তাকালে তেমনটা কিন্তু মনে হয় না। বরং ক্রমশ তা ক্ষয়ীষ্ণু হতে হতে অবলুপ্তির পথে। সংস্কৃতকে বাঁচাতে সরকার তেমন কোনও পদক্ষেপ করেনি। তবু প্রাচীন এই ভাষাকে বাঁচানোর অনর্গল চেষ্টা করেছে কর্ণাটকের শিমোগা জেলার মাট্টুর গ্রাম। ভারতের একমাত্র গ্রাম, যেখানকার প্রধান ভাষা সংস্কৃত। না, শুধু পাঠোভ্যাস নয়, এ গ্রামের মানুষ কথা পর্যন্ত বলেন প্রাচীন দেবভাষাতেই।

গ্রামের ভিতরে পা রাখলেই দেখবেন, আট থেকে আশি, নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা চালাচ্ছেন সংস্কৃততে। সেখানকার মাতৃভাষাই যে সংস্কৃত। তবে এই কৃতিত্ব শুধু গ্রামবাসীর নয়, বরং 'সংস্কার ভারতী' নামে একটি স্কুলের। সেই স্কুলেই প্রতিদিন পাঁচ হাজার করে পড়ুয়া সংস্কৃত শেখেন সেখানে। প্রাচীন ভাষাটিকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টার ত্রুটি রাখছে না সংস্কার ভারতী। এই গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে সংস্কৃতের চেয়ে সহজ আর কিছুই নেই। তাঁরা মনে করেন, সংস্কৃত ভাষা থেকেই জন্ম হয়েছে এশিয়া মহাদেশের বহু ভাষার। সে কারণেই এই ভাষা শেখা অনেক সহজ।

যেখানে নরঃ- নরৌ-নরাঃ মুখস্থ করতেই দাঁত পড়ে যায় ছেলেমেয়েদের, যেখানে ক্রমাগত অবহেলায় মরে যেতে বসেছে দেবভাষা সংস্কৃত, সেখানে এই গ্রামের মানুষ সংস্কৃত সহজ করে তুলেছেন শুধুমাত্র আগ্রহ আর অধ্যবসায়ের জোরে। মাত্র দশ বছর বয়সেই বেদ পড়তে শুরু করে এ গ্রামের খুদেরা। বছর কয়েক আগে নাকি সংস্কৃত ভাষাকে সিবিএসই সিলেবাসে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মোদি সরকার। তবে শুধু মাত্র নিয়ম নীতি করে এ ভাষাকে বাঁচানো কঠিন বলেই অনুমান। ভাষা বাঁচে ব্যবহারকারীর আদরে, যত্নে। যে যত্ন থেকে বহুকাল ধরেই বঞ্চিত দেবভাষা সংস্কৃত। শিমোগার ছোট্ট গ্রাম পেরেছে। প্রাচীন সংস্কৃতি ও সংস্কৃত, দুটোকেই বাঁচিয়ে জীবনে জায়গা দিতে পেরেছে তাঁরা। ভারত পারবে না?

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।