হুণরা কেন হেরে গেলো

By: Ishan Bandyopadhyay

November 21, 2021

Share

ছবি সৌজন্যে : inscript.me

 “সার্কাস দেখতে যাবেন ব্যস্তদা? হেক্সাগোনাল ক্লাউনের খেলা হেব্বি জমেচে ফেমাস সার্কাসে, ছ’ হাতে কত কী করচে, চারটে হাত অবশ্য নকল, শোলা দিয়ে বানানো বোধহয়।”

পাড়ায় মোড়ে কেষ্টদার চায়ের দোকানের আড্ডায় ব্যস্তদাকে প্রস্তাবটা দিয়েছিল নন্টে। সকাল থেকেই আজ সার্কাস নিয়ে আলোচনা চলছে; বাবাই, রিন্টু, বাবুলাল আরো কারা কারা যেন দেখেও এসেছে একবার। 

এখানে অবিশ্যি ব্যস্তদা-র পরিচয়টা একটু দেওয়া দরকার। যদিও, পরিচয় বলতে যদি নাম বা বংশপরিচয় কিংবা কর্মজীবনের কথা বলতে হয়, তাহলে ব্যস্তদা-র পরিচয় দেওয়াটাও বেশ শক্ত কাজ। নাম সবারই একটা থাকে, ব্যস্তদারও ছিল বা আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু সে নাম আমরা অন্তত জানিনা। লোকটার বয়েস আন্দাজ করাও ভারি শক্ত। এমন একটা শীর্ণ দোহারা চেহারা, দেখে মনে হয় বয়েস বত্রিশ থেকে বাষট্টি যা খুশি হতে পারে। আমাদের পাড়াতে কয়েকবছর ধরে আছেন, একটা বাড়ির একতলাটা ভাড়া নিয়ে একাই থাকেন। আগে কোথায় থাকতেন বা পরিবারে আর কেউ আছেন কিনা, সেসব কথা আমরা কেউ জানিনা। কাজ-টাজ কি করেন সেটাও পরিস্কার নয়, কিন্তু একটা জিনিস জলের মতো স্বচ্ছ, যে উনি অতি ব্যস্ত একজন মানুষ। বস্তুত, এই ব্যস্তদা ডাকটা-র উৎপত্তিও এটা থেকেই, কারণ উনি সবসময়ই এটাই বলে থাকেন যে উনি ব্যস্ত আছেন। এত ব্যস্ততা ঠিক কি নিয়ে, সেটা আলোচনা করে আমাদের মতো ছেলে-ছোকরারা পাড়ার মোড়ের আড্ডায় অনেক সময় কাটিয়েছি, কিন্তু কিছুই তেমন জানা যায়নি। আমাদের কেষ্টদার চায়ের দোকানের আড্ডায় মাঝে মাঝে ব্যস্তদা নিজেও আসেন, খানিক বসেন, আর কথা যেটুকু বলেন সেগুলো এমনই আশ্চর্য রকমের, আমরা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। আজ যেমন এসেছেন, এবং আমাদের আলোচনা শুনতে শুনতে চায়ে চুমুক দিয়ে চলেছেন। এর মাঝেই নন্টের এই সার্কাস দেখতে যাওয়ার প্রস্তাব। 

ব্যস্তদা অবশ্য সার্কাস দেখতে যাওয়ার প্রস্তাবে বিশেষ ব্যস্ত না হয়ে, একটা কাকার বিড়ি ধরিয়ে নেহাতই ক্যাজুয়ালি বললেন, “হেক্সাগন! তা, ডাবল হেক্সাগোনালের  আসল ছ’মাথা আর বারোহাতের কেরামতি দেখা গেছিল বটে এদেশেই, জায়োনাইটই হোক বা হেফথালাইট, কিডারাইট হোক বা অ্যালশন, 
শরবনে না হোক, অন্তত মরু আর পাথুরে অঞ্চলে বাজিমাত করেছিল ঐ ছ’লাখি কেকা।”

আমাদের সবার মুখে কুড়ি টাকা দামের রসোগোল্লা অনায়াসে ঢুকে যাবে এরকম হাঁ গুলোর ওপর একটা করুণাময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, বিড়িতে আরো দুটো মোক্ষম টান দিয়ে ব্যস্তদা শুরু করলেন, ” অনেক পুরোনো কথা অবশ্য, যীশুর জন্মাতে তখনও সাড়ে চারশো বছর মত দেরি, ঠিকঠাক বলতে গেলে চারশো সাতান্ন বছর। গুপ্ত বংশের শাসন চলছে তখন, উত্তর-পশ্চিম থেকে দূত এসে একদিন ছোকরা সম্রাটকে খবর দিলে, হুণেরা আসছে। তো, এই হুণদের বহু ক্লাসিফিকেশন ছিলো, প্রথমে যে নামগুলো বললাম সেগুলো তাদের মধ্যে কয়েকটা মাত্র। ভয়ানক যুদ্ধবাজ জাত, খাইবার পাস পেরিয়ে অ্যাটাক শানালো বলে, কিছু একটা ইমিডিয়েটলি না করলেই নয়। 

তা যুদ্ধে গুপ্তরাও কম যায় না, যদিও সমুদ্রগুপ্ত বা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সেই সোনালী দিন আর নেই। এমন কী কোনো উপায় হতে পারে, যাতে রক্তারক্তি না করেই ঠেকানো যায় হুণগুলোকে– একথা ভাবতে ভাবতেই সম্রাট বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলো সেই রাতে। কেজানে হয়ত মনে মনে দেবতাদেরও ডাকছিলেন, আর নেমসেক বলে কথা, সেনাপতি নিজে এসে স্বপ্নের মাঝে বুদ্ধিটা না বাতলে দিয়ে কি পারেন!” 

“দাঁড়ান দাঁড়ান, দেবসেনাপতি তো কার্তিক, তার নেমসেক মানে! কিছুই তো বুঝতে..”

হাত তুলে বাবুলালকে থামিয়ে দিয়ে ব্যস্তদা একটা অনুকম্পার হাসি হাসলেন, “স্কন্দ, দেবসেনাপতি কার্তিকেয়’র আসল নাম স্কন্দ, তিনিই ডাবল ষড়ভুজ, অর্থাৎ ছ’টা মাথা বারোটা হাত।  স্কন্দগুপ্তকে টেনশনে দেখে তার মায়া হলো এত, টোটকাটা বলেই দিলেন। টোটাল গুপ্ত সাম্রাজ্যের যত সাপুড়ে ছিলো, এত্তেলা পাঠানো হলো সব্বাইকে, আর সাধারণ মানুষের জন্যেও ঘোষণা হলো পুরস্কার, জ্যান্ত সাপ এনে জমা দিলেই প্রাইজ। এখন যেখানে রাজস্থান আর পাঞ্জাব, ঐ পাথুরে মরু অঞ্চলে ছড়ানো হল কোটি কোটি জ্যান্ত সাপ, আর সেসব সাপকে গলাধঃকরণ করার লোভে উড়ে এলো প্রায় লাখ ছয়েক ময়ূর। অত সুন্দর পাখি আর দেবসেনাপতির বাহন হলে কি হবে, ময়ূরের ডাক যে কি বিকট বীভৎস সে যে শুনেছে সেই জানে। তো সেই অত ময়ূরের হল্লাচিল্লা ঐ এরিয়ার খামখেয়ালী আবহাওয়ায় ম্যাগনিফায়েড হয়ে অ্যায়সা সাংঘাতিক জগঝম্প তৈরি করলো, সে ক্যাকাফোনি দূর থেকে শুনেই হুণ ব্যাটাদের প্রাণপাখি খাঁচাছাড়া হয় আর কি, এমন ভয়ঙ্কর রণদুন্দুভির আওয়াজ কস্মিনকালেও তারা শোনেনি। ব্যোমকে গিয়ে দাঁড়িয়েই রইল সেখানে, তখন কার্তিক মাস, সারারাত মাথায় হিম পড়ে ঠান্ডা লেগে টোটাল সৈন্যদল পরদিন থেকেই হাঁচতে লেগেছে। হ্যাঁচচো হ্যাঁচচো করে তো আর যুদ্ধ করা যায় না, মানে মানে তাই কেটেই পড়ল গোটা হুণ বাহিনীটাই। ব্যাস, কেল্লা ফতে! ইতিহাসের পাতায় এসব অবশ্য নেই, স্কন্দগুপ্ত হুণদের ঠেকিয়েছিলেন এটুকুই যা লেখা আছে। তবে, ইতিহাস বইতে আর কতটুকুই বা থাকে!”

“যোদ্ধাদের মাথায় হিম পড়ল কীকরে ব্যস্তদা, শিরস্ত্রাণ ছিল না?”… রিন্টুর ফুটকাটাটুকু যেন শুনতেই পাননি এমন ভাব করে ব্যস্তদা একঝলক রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়েই বললেন, ” এহ হে, অনেক দেরি হয়ে গেল, আজ বড় ব্যস্ত আছি বুঝলে, আজ চলি, পরে আবার গল্প হবে”, তারপর সটান উঠে হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন। 

error: Content is protected !!