নিষিদ্ধপল্লিতে পরের পর হত্যা, কলকাতার ত্রাস হয়ে উঠেছিল এই নারী

অপরাধবিজ্ঞানে বারংবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে জ্যাক দি রিপার থেকে জিল দ্য রাই। আর এসবের মধ্যেই আড়ালেই থেকে গেছে বাংলার প্রথম সিরিয়াল কিলার তারিণী।

Ravhali Biswas
৭ মিনিট
নিষিদ্ধপল্লিতে পরের পর হত্যা, কলকাতার ত্রাস হয়ে উঠেছিল এই নারী

শরদিন্দুবাবুর ব্যোমকেশ আর সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা কে না পড়েছে! রহস্য-রোমাঞ্চ-খুন-আততায়ীর আঁতুড় সেসব উপন্যাস। আর বাঙালি তাকে চিরকাল গোগ্রাসে গিলেছে। সিরিয়াল কিলারের ধারণা আমাদের গোয়েন্দা উপন্যাস থেকেই পাওয়া। তাই সিরিয়াল কিলার বললেই আমাদের কেমন এক শিহরণ খেলে যায়। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে 'পথের কাঁটা'-র প্রফুল্ল রায়ের কথা। সিনেমায় যেভাবে এসেছে সিরিয়াল কিলার, তাও আমাদের হাড় হিম করে দেয়। ডেভিড ফিঞ্চারের 'জোডিয়াক' বা 'সেভেন'-এর কথা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। কোনও রোমহর্ষক কাহিনি যদি বাস্তব হয়, তাহলে তো কথাই নেই! গায়ে কাঁটা দেয় বইকি!

সিরিয়াল কিলারের কথা বললেই আমাদের মনে আসে জ্যাক দ্য রিপারের কথা। একের পর এক নৃশংস খুন। ধরন একই। খুনের পর প্রতিটি শিকারের দেহ চিরে দেওয়া। অথচ আততায়ী অধরা। অচেনাও। ভয়ে থমকে গিয়েছিল উনিশ শতকের লন্ডন শহর। এই অজ্ঞাতপরিচয় খুনি আজও দুনিয়ার কাছে পরিচিত জ্যাক দ্য রিপার নামে। যদিও সন্দেহের বশে পুলিশ অনেককেই জ্যাক দ্য রিপারের তকমা দিয়েছে। বিনা দোষে হয়তো অনেকে শাস্তিও পেয়েছে। তবে সে যাই হোক, পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এমন অনেক সিরিয়াল কিলারের নাম পাওয়া গেছে। কেউ কেউ ছিলেন মানসিক রোগী। কারও বা ছিল নেশা। মানে ঝোঁকের বশে নাকি খুন করত তারা, এদের মধ্যে টেড বান্টি, চার্লস ম্যানসন উল্লেখ্য।

কিন্তু এ তো গেল যুক্তরাষ্ট্রের কথা। কলকাতার বুকে যে সিরিয়াল কিলারের উদ্ভব হতে পারে, তা যেন ভাবাই যায় না। না স্টোনম্যান নয়, বাংলার প্রথম সিরিয়াল কিলার হিসেবে উঠে আসে এক বাঙালি মহিলার নাম। হ্যাঁ, চমকে ওঠার মতোই ঘটনা বটে। সিরিয়াল কিলার, তাও এক বাঙালি নারী! কিন্তু সত্যি হলো, জ্যাক দ্য রিপারের আট বছর আগে কলকাতার বুকে একের পর এক মহিলার হত্যার পিছনে ছিল এক ঠান্ডা মস্তিষ্কের মহিলা, যাকে ধরতে কালঘাম ছুটেছিল পুলিশের।

১৮৮৪ সালে ফাঁসি হয় ত্রৈলোক্যতারিণীর। বলা হয়, সেই-ই কলকাতার তথা ভারতের প্রথম মহিলা সিরিয়াল কিলার। তার অপরাধের রোমহর্ষক গল্পের আড়ালেই থেকে যায় বাংলার এক ভাগ্যহীনা মেয়ের লুকোনো কান্নাও। জীবন যাকে টেনে এনেছিল অন্ধকারে। সেখান থেকে আলোয় ফেরার পথ পায়নি বলেই অন্ধকারকেই যে জড়িয়ে নিয়েছিল জীবনের সঙ্গে।

কে এই বাঙালি সিরিয়াল কিলার?

পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের এক প্রত্যন্ত গ্রাম। আর দশটা গ্রামের মতোই এখানকার চিত্র। ঘরের নারীরা ব্যস্ত ঘর-সংসার আর সন্তান লালন-পালনে। আর বাড়ির পুরুষরা বেশিরভাগই ব্যস্ত থাকেন চাষের কাজে। বাংলার খুবই নিতান্ত নিস্তরঙ্গ জীবনের চিত্র। এই গ্রামেই বসবাস করত ত্রৈলোক্যতারিণী। গ্রামের মধ্যে সুন্দরী হিসেবে খ্যাতি ছিল তার। অন্যদের মতো তারিণীর বাবাও সাধারণ ভাগচাষি। সংস্কারের আলো তখনও সেভাবে ছুঁতে পারেনি হিন্দু সমাজকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মনে পড়ে সজল বারুইকে? রং-তুলি ছেড়ে কেন বাবা-মাকে নৃশংসভাবে খুন করেছিল এই কিশোর?

আইনের চোখে সজল অপরাধী অবশ্যই। কিন্তু তাকে অপরাধী বানাল কে? তার জন্য কি দায়ী তার বাবা-মায়ের অকথ্য অত্যাচার, যা তাকে ঠেলে দিয়েছিল অপরাধের অতল গহ্বরে?

স্বাভাবিকভাবেই সমাজে পুরোদমে চলছে বাল্যবিবাহ। কৈশোরের কোঠা পেরনোর আগেই তারিণীকে বসতে হয়েছে বিয়ের পিঁড়িতে। সামাজিকতার দোহাই দিয়ে তেরো বছর বয়সে ত্রৈলোক্যর বিয়ে হয় ষাটোর্ধ্ব এক প্রৌঢ়র সঙ্গে। তবে অন্যদের মতো স্বামীর ঘর কিংবা সন্তানের মুখ দেখেনি সে। তার বিয়ে ছিল নাম-কা-ওয়াস্তে। সতিনের জন্য কোনওদিন শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয়নি তারিণীর। ফলে সময়ের নিয়মে শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ কমতে কমতে সম্পর্কের পাটও চুকে যায় একসময়।

কয়েক বছর পর প্রৌঢ়র মৃত্যু হওয়াতে গ্রামের নিঃসঙ্গ জীবনে ত্রৈলোক্যর পরিচয় হয় এক বৈষ্ণবীর সঙ্গে। সেই বৈষ্ণবীর মারফৎ ত্রৈলোক্যতারিণীর সঙ্গে আলাপ হয় এক যুবকের। জড়িয়ে পড়ে এক নতুন সম্পর্কে। যুবক প্রণয়ের ছলে ত্রৈলোক্যতারিণীকে কলকাতার নিষিদ্ধ পল্লিতে এনে ফেলে। গ্রাম থেকে সদ্য কলকাতায় পা রাখা তরুণী জানতও না ওই এলাকার বৈশিষ্ট্য। না কি সে নিজেই রাতের অন্ধকারে গ্রাম থেকে যুবকের সঙ্গে পালিয়ে আসে, তা স্পষ্ট নয়। তার বাপের বাড়ির দরজাও তার জন্য চিরতরে বন্ধ হয়। তাতে কী? যাকে ভালবাসে তার সঙ্গেই পালিয়েছে, যুবকটি তাকে সুখে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এরপর তারা সোনাগাছিতে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে। কিন্তু ত্রৈলোক্য মুক্ত হতে চায়, চায় স্বাধীনতা। নিজের মতো করে বাঁচতে চায় সে। তবে যুবকটি হয়তো প্রকৃত অর্থেই ভালবেসেছিল তারিণীকে। কিন্তু তারিণী তার মর্যাদা দিতে ছিল অপারগ। পরবর্তীকালে তারিণীর হাতেই খুন হতে হয় যুবকটিকে। একপ্রকার বাধ্য হয়ে কলকাতার সোনাগাছি অঞ্চলে ভাড়া থাকতে শুরু করে তারিণী। পেশা হিসেবে গ্রহণ করে পতিতাবৃত্তি। আর এই পতিতাবৃত্তির সূত্রেই তার পরিচয় ঘটল অপরাধজগতের মাথাদের সঙ্গে, তারিণীর পদার্পণ ঘটল অন্ধকার বৃত্তে।

ত্রৈলোক্যর এই ঘটনাটি সর্বসমক্ষে আসার পেছনে যে মানুষটি ছিলেন, তিনি হলেন দারোগা প্রিয়নাথ। তার লেখা 'দারোগার দপ্তর'-এ পাওয়া যায় তারিণীর কুকীর্তির কথা। এছাড়াও সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর 'দ্য উইকেড সিটি' বইতে উল্লেখ করেছেন ত্রৈলোক্যর কথা।

দারোগা প্রিয়নাথ?

দারোগা প্রিয়নাথের পুরো নাম প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়। পুলিশের পাশাপাশি তিনি একজন লেখকও। ১৯৭৮-১৯১১ সাল অবধি পুলিশে কর্মরত ছিলেন। তার প্রকাশিত বই ‘দারোগার দপ্তর’ থেকেই তারিণীর সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। বাংলায় অপরাধ-বিষয়ক পত্রিকা বা ক্রাইম ম্যাগাজিন শুরু করেছিলেন প্রিয়নাথ। একসময় তা চলে গিয়েছিল বিস্মৃতির অন্তরালে। পরে বই হয়ে প্রকাশিত হওয়ায় আবার প্রচারের আলোয় আসে ‘দারোগার দপ্তর’। সমাধান করেছিলেন, এবং করতে পারেননি, দু’ধরনের কেসের কথাই লিখেছেন প্রিয়নাথ। তাঁর দেখা ভয়ংকরতম অপরাধীদের মধ্যে অন্যতম ছিল ত্রৈলোক্যতারিণী। ব্রিটিশ পুলিশদের চোখে ধুলো দিয়ে বারবার বেঁচে যেত এই বাঙালি তরুণী। একাধিক খুন ও লুঠপাটের পরে অবশেষে তাকে ধরতে সমর্থ হন প্রিয়নাথ। সেই অভিজ্ঞতা তিনি লিখেছিলেন নিজের পত্রিকায়। কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন করেছিলেন স্থান-কাল-পাত্র।

সোনাগাছিতে ক্রমশ মক্ষীরানি হয়ে দেখা দিল ত্রৈলোক্যতারিণী। এমন সময়ে তার জীবনে এল জনৈক কালীবাবু। পরবর্তীকালে সে-ই ছিল ত্রৈলোক্যর মূল প্রণয়ী এবং সেই সঙ্গে অপরাধের চক্রী। কালীবাবুর স্ত্রী-বিয়োগের পরে তার একমাত্র ছেলে হরিকে বড় করে তোলে ত্রৈলোক্যতারিণী। কিন্তু সংসার বড় হলেও বাড়ছিল না অর্থের জোগান। শেষে অন্ধকার পথে পা রাখল ত্রৈলোক্যতারিণী ও তার প্রণয়ী কালীবাবু। প্রথমে তারা ধনী ঘরের ছেলেদের নেশার ঘোরে বুঁদ করে লুঠপাট করত। সঙ্গে চলত ব্ল্যাকমেলিং-ও। পাশাপাশি চলত নানা রকমের প্রতারণা। কালীবাবু শিকার ধরত। তারপর নিজের জালে জড়িয়ে তাদের সর্বনাশ করত ত্রৈলোক্যতারিণী। ঠিকানা পাল্টে নিজের সাজানো পাত্রীর সঙ্গে বিয়ে দিত অন্য শহরের বিত্তবান পাত্রর। পাত্রীর সঙ্গে যেত তার সাজানো আত্মীয়স্বজন। তার পর সুযোগ বুঝে সব গয়নাপত্র নিয়ে বাবা-মায়ের কাছে আসার নাম করে পালিয়ে আসত ‘নতুন বউ’, সঙ্গে তার ‘পরিজনরা’। পরে ভুয়া ঠিকানায় গিয়ে কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত না।

পরপর অপরাধ করেও ধরা না পড়ায় সাহস বাড়ছিল তাদের। এরপর কলকাতার রাস্তা থেকে শিশুকন্যাদের অপহরণ শুরু করে তারা। সেসময় কিছু পরিবারের বিয়েতে কন্যাপণ দেওয়ার রীতি ছিল। সেরকম পরিবারে অপহৃত বালিকাদের বিয়ে দিত ত্রৈলোক্যতারিণী। পুলিশের তৎপরতায় একদিন বন্ধ হলে সেই চক্র। কিন্তু ত্রৈলোক্যতারিণীর টিকির খোঁজও পেল না পুলিশ। এক চক্র বন্ধ হলে নিত্যনতুন চক্র খুঁজে বের করত তারা। এ ভাবে এক বার আর্থিক কেলেঙ্কারিতে পুলিশের জালে ধরা পড়ে গেল দু’জনেই। গয়নার লোভে তারা খুন করেছিল এক দেশীয় রাজ-এস্টেটের কর্মচারীকে। সেই মামলায় আইনের বিচারে কালীর প্রাণদণ্ড হয়। কিন্তু প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে যায় ত্রৈলোক্যতারিণী। এর পর সে ঠিক করে, অন্ধকারের পথ থেকে সরে যাবে। অর্থকষ্ট হলেও শুরু করবে নতুন জীবন। সেইমতো পালিত সন্তান হরিকে নিয়ে সোনাগাছি ছেড়ে থাকতে লাগল অন্য পাড়ায়। কিন্তু বেশিদিন দারিদ্র সহ্য করতে পারল না ত্রৈলোক্যতারিণী। অনটনের জায়গায় তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল অতীতের সোনালি দিনের মোহ।

এবার পাখির চোখ হল সোনার গয়না। পুলিশের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ এক চুরির সূত্রে। বড়বাজারের এক বিখ্যাত গয়নার দোকান থেকে দশ হাজার টাকার জহরত পছন্দ করেছিলেন এক রানি। শর্ত ছিল ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’-র। কিন্তু সেসব পৌঁছে দিতে গিয়ে নিখোঁজ হন দোকানেরই এক কর্মী। হদিশ মেলে না টাকা কিংবা জহরতেরও। দীর্ঘ তদন্তের পর ধরা পড়ল, খুন হয়েছেন ওই কর্মী, আর লোপাট হয়েছে দামি জহরতগুলি। দারোগা প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের কৌশলে ধরা পড়ল দুই অপরাধীও। তাদের মধ্যে একজন আবার মহিলা! পেশায় বারবনিতা, নাম ত্রৈলোক্যতারিণী। কিন্তু ধরা পড়লেও উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে শাস্তি দেওয়া গেল না তাকে। তবে তক্কে তক্কে ছিলেন দারোগাবাবু। বুঝেছিলেন, এমন আটঘাট বেঁধে কাজ করে যে, সে পাকা অপরাধী। সুতরাং ক্রাইমের জালে সে জড়াবেই কখনও না কখনও। আর হলোও তাই।

কিছুদিন পরেই পুলিশের কাছে এল এক বারাঙ্গনার খুনের খবর। তদন্তে গিয়ে ফের সেই ত্রৈলোক্যের দেখা পেলেন দারোগা প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়। এবারও সন্দেহের আঙুল ত্রৈলোক্যের দিকেই। অথচ ফের প্রমাণের অভাব। কিন্তু এবার দারোগাও নাছোড়বান্দা। রীতিমতো চালাকির ফাঁদে ফেলেই অপরাধীর স্বীকারোক্তি আদায় করলেন তিনি। যে ছেলেটিকে সে পুত্রস্নেহে বড় করে তুলেছে, যে ছাড়া পৃথিবীতে আপনার জন বলতে তার কেউ নেই, সেই ছেলেকেই খুনের দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে দেখে আর আত্মগোপন করে থাকতে পারেনি ত্রৈলোক্য। এখানেই নিজের বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলেন প্রিয়নাথ। তিনি জানতেন, ত্রৈলোক্য নিজের ছেলের মতো হরিকে ভালবাসে, সে তার ক্ষতি হতে দেবে না। তিনি সেইমতোই ফাঁদ পেতেছিলেন। নিজের অপরাধ স্বীকার করে সে। আর এই স্বীকারোক্তির ফলে, ১৮৮৪ সালে ফাঁসি হয় ত্রৈলোক্যতারিণীর। অপরাধের ইতিহাসে এখানেই তার শেষ অধ্যায়।

ফাঁসির আগে প্রিয়নাথ দারোগার কাছে দীর্ঘ জবানবন্দি দিয়েছিল ত্রৈলোক্য। তার কথা থেকেই জানা গিয়েছিল, গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত খুন করে গিয়েছে সে। উদ্দেশ্য একটাই। গয়না চুরি। আর সেই উদ্দেশ্যেই সিরিয়াল কিলারে পরিণত হয়েছিল অজপাড়াগাঁয়ের সম্ভ্রান্ত কুলীন বংশের এই মেয়েটি। এর আগেও গয়নার লোভে এক দেশীয় রাজ-এস্টেটের কর্মচারীকে খুন করেছিল সে। কিন্তু সেই মামলায় ধরা পড়ে তার সহকারীর ফাঁসি হয়। এরপর থেকে নিজস্ব পদ্ধতিতে একাই পাঁচ-পাঁচটি খুন করেছিল ত্রৈলোক্য। নিষিদ্ধ পল্লির পড়শিদের মধ্যে থেকেই শিকার বেছে নিত সে। তাদের বিশ্বাস অর্জন করার পর, এক গুরুদেবকে দর্শন করানোর ছলে তাদের নিয়ে যেত মানিকতলার পরিত্যক্ত বাগানবাড়িতে। ধর্মীয় আচারের অজুহাতে নির্দেশ দিত গা-ভরা গয়না পরে যেতে। আর গুরু দর্শনের আগে বাগানবাড়ির পুকুরে স্নান করার ছুতোয় শিকারকে ডুবিয়ে মারত সে।

এই ছিল বাংলার প্রথম মহিলা সিরিয়াল কিলারের কাহিনি। তবে শুধুমাত্র গয়নার লোভের জন্য সিরিয়াল কিলিং হয়তো অপরাধবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই প্রথম। কিন্তু তলিয়ে দেখলে হয়তো অন্য সত্যই সামনে উঠে আসে। বাল্যবিবাহ, শ্বশুরবাড়ির বঞ্চনা, নিজের সমস্ত সুখকে চোখের সামনে তিলে তিলে নষ্ট হতে দেখেছিল এই নারী। হয়তো ভালবাসার ভাষাটাই সে কোনোদিন বুঝে ওঠার সুযোগ পায়নি। তাই নিজের শরীর বেচতেও তার কুন্ঠা বোধ হয়নি। সমাজের কলুষতাকে, অবহেলাকে ছোট থেকে অনিচ্ছায় গিলেছে সে। তাই খুনের আগে হাত কাঁপত না তার। আর সহজেই হয়ে ওঠে বাংলার নৃশংস প্রথম সিরিয়াল কিলার।

এখানে আরও প্রশ্ন ওঠে, একজন নারী হিসেবে তাকে তৎকালীন সময়ের সব অবমাননা সহ্য করতে হয়েছে মুখ বুজে। কিন্তু তার পরেও খুনের জন্য নারীদেরই কেন টার্গেট করল তারিণী? না কি নারীরাই ছিল তার কাছে সহজ শিকার? অপরাধবিজ্ঞানে বারংবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে জ্যাক দি রিপার থেকে জিল দ্য রাই। আর এসবের মধ্যেই আড়ালেই থেকে গেছে বাংলার প্রথম সিরিয়াল কিলার তারিণী। তবে এই নারীর পূর্ববর্তী জীবন কাউকে হয়তো ভাবায়নি। তাই তো ইতিহাসে তার ঠাঁই হয়েছে শুধু সিরিয়াল কিলার হিসেবেই।

লিখেছেন
Ravhali Biswas
Ravhali Biswas
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।