দুর্যোধনের ভাই হয়েও দ্রৌপদীর লাঞ্ছনায় প্রতিবাদ! ব্যাতিক্রমী বিকর্ণ রয়ে গেলেন নিভৃতেই

Bikarna Mahabharat: বিকর্ণই একমাত্র কৌরব যিনি রাজসভায় দুর্যোধন যখন যুধিষ্ঠির তথা পাণ্ডবদের স্ত্রী দ্রৌপদীর অপমান করছিলেন তখন তার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।

tiasa gupta
৪ মিনিট
দুর্যোধনের ভাই হয়েও দ্রৌপদীর লাঞ্ছনায় প্রতিবাদ! ব্যাতিক্রমী বিকর্ণ রয়ে গেলেন নিভৃতেই

দ্যুতসভা। শকুনির পাশার চালে যুধিষ্ঠির পথের ভিখারি। পাশা খেলায় সব খোয়া গেছে তাঁর। এমনকী ভাইদের বাজি রেখেও হেরেছেন। তখন সর্বহারা যুধিষ্ঠিরকে শকুনি বললেন, “কেন এবার দ্রৌপদী! তাঁকে পণ রেখে যদি যেতেন!’’ কী সাংঘাতিক চাল! আসলে কৃষ্ণাকে সেই সভায় অপমান করাই ছিল উদ্দেশ্য। এবারও যুধিষ্ঠির জিততে পারলেন না। সভায় দীর্ঘশ্বাস পড়ল, অন্যদিকে দুর্যোধন ও তাঁর বন্ধুরা আনন্দে খিলখিল করে হেসে উঠলেন। ধৈর্য হারিয়ে দুঃশাসন ছুটে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে দ্রৌপদীকে টানতে টানতে নিয়ে এলেন সভায়। দুর্যোধনের দল হইহই করে বলতে লাগলেন, “দ্রৌপদী এখন রানি কোথায়, সে তো এখন দাসী। আমাদের ভজনা করবে।” এই বিপদে দ্রৌপদী সখা কৃষ্ণের নাম করতে লাগলেন। তখনই শোনা গেল বিকর্ণর কণ্ঠস্বর। দ্রৌপদীর অপমানের প্রতিবাদ করলেন একশ ভাইয়ের এই একজনা।

“খল শকুনি দেখছে সবই, বস্তুত সে ধ্বংস চায়,

ঘরের মাটি লাল হয়ে যাক, দেশবিভাগের যন্ত্রণায়।

সুশীল সভায় ঘটছে যখন, রাজঅপরাধ জঘন্য,

ঠিক তখনই তার বিরোধে, চেঁচিয়ে ওঠেন বিকর্ণ।”

মহাভারতের কথা অমৃতসমান। যেমন তার বিস্তার, তেমনই বিচিত্র তার চরিত্রসমূহ। মহাকাব্যটি পৌরাণিক সময়কে ধারণ করে রইলেও আজকের দিনেও তাকে মনে হয় আধুনিক। মহাভারতের আলোয় তাই আজও বিচার করা যায় সমকালকে। তাই বিকর্ণ কেবল মহাকাব্যিক চরিত্র নয়, তিনি এই সমাজেরও প্রতিনিধি। যুগে যুগে যাজ্ঞসেনীদের অপমানের প্রতিবাদে বিকর্ণদের দরকার পড়েছে। তাই সবাইকে একবার হতেই হবে বিকর্ণ, এমনটাই বলেছিলেন কবি আর্যতীর্থ। কেন?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভাইদের ছেড়ে পাণ্ডবপক্ষে! ধৃতরাষ্ট্র-পুত্র হয়েও কেন এত অবহেলিত যুযুৎসু

Mahabharat Yuyutsu: ভারতের অস্থির সময়েও, আদর্শহীনতার খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে যে চরিত্রের কাছ থেকে আজও ন্যায়পরায়ণতা ও আদর্শে অবিচল থাকার শিক্ষা নেওয়া যায়, তিনি যুযুৎসু।

“সব যুগে বিকর্ণদের প্রয়োজন। বিকর্ণ কারা? ক্ষমতাসীন দলের মধ্য থেকে যাঁরা ভাবতে পারেন যে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন। আমরা দেখি, যে যেই পতাকার নিচে থাকেন, মানে দেশ হোক, ধর্ম হোক, বা পাড়ার ক্লাব হোক, তিনি সেটাকে অন্ধভাবে সমর্থন করেন। বিকর্ণ ঠিক এই খানে আলাদা। এমন নয় যে তিনি সব ব্যাপারে প্রতিবাদী, বিরোধী। তাঁর একটা পক্ষ আছে, সেটা বেশিরভাগ সময় ক্ষমতাশালীর দিকে। তবুও যখন অন্যায় হয়, সংখ্যাগুরুর মত না নিয়ে তিনি প্রতিবাদে গলা তোলেন।”

বিকর্ণ হলেন মহাভারতে বর্ণিত তৃতীয় কৌরব, ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর পুত্র এবং যুবরাজ দুর্যোধনের ভাই। দুর্যোধনের কাছে পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির তাঁর রাজ্য সহ সব কিছু হারিয়ে ফেলেন। বিকর্ণই একমাত্র কৌরব যিনি রাজসভায় দুর্যোধন যখন যুধিষ্ঠির তথা পাণ্ডবদের স্ত্রী দ্রৌপদীর অপমান করছিলেন তখন তার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর যে শতপুত্র জন্মগ্রহণ করে তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ধার্মিক ছিলেন বিকর্ণ। দুর্যোধনের ভাই হলেও তিনি, তাঁর বাকি ভাইদের মতো বদমেজাজি ও অহংকারী ছিলেন না। পাণ্ডবদের পাশাখেলায় পরাজয়ের কারণে সভামধ্যে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময়ে ধৃতরাষ্ট্র আর এক বৈশ্য দাসীর পুত্র যুযুৎসু ছাড়া একমাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন তিনিই। এমনকী প্রতিবাদে তিনি সেই সভাস্থলও ত্যাগ করেন। অবশ্য তাঁকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন রাজার পার্ষদরা। এটা কি সিংহাসনের প্রতি আনুগত্য?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রবল প্রেমে মাতোয়ারা হয়েই একে অন্যকে অভিশাপ! কচ ও দেবযানীর যে আখ্যান শিহরণ জাগায়

Mahabharat Kach Devayani: দেবযানী কচকে এ পর্যায়ে প্রেম নিবেদন করলেন এবং বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু কচ প্রবল অসম্মতি জানালেন।

পরবর্তীতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও তিনি কৌরব পক্ষের হয়ে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেন। ভীম কৌরবদের একশো ভাইকে বধ করার পণ নিয়ে যখন কুরুক্ষেত্রকে প্রায় শ্মশানে পরিণত করেছেন, তখন বিকর্ণ তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে যুদ্ধে আহ্বান জানান। ভীম কিছুকাল ভাবেন, তাঁর সভার কথা মনে হতে তিনি বিকর্ণকে বলেন, “তুমি একমাত্র কৌরব যে জানো ধর্ম কী, তুমি সরে দাঁড়াও আমি তোমাকে বধ করতে চাই না। তুমিই একমাত্র যে সেই সভায় দুর্যোধনের প্রতিবাদ করেছিলে।” কিন্তু বিকর্ণ বলেন, “আজ আমার সরে যাওয়াটাও অধর্ম হবে, আমি জানি কৌরবদের এই যুদ্ধে জয়লাভ কোনওদিনই হবে না যেহেতু বাসুদেব কৃষ্ণ পাণ্ডব পক্ষে আছেন, কিন্তু আমি আমার সকল ভাই এবং জ্যেষ্ঠ ভাই দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করতে পারব না। আমি ধার্মিক কিন্তু বিভীষণ নই। আমাকে যুদ্ধ করতেই হবে।” তিনি আরও বলেন, “সেই সভাস্থলে আমার যা কর্তব্য ছিল করেছি কিন্তু এখন আমার কর্তব্য আমার ভাইদের রক্ষা করা। তাই এসো আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব কর বৃকোদর ভীম।” এই কথা শোনার পর ভীম ও বিকর্ণর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। বিকর্ণ বীরের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণত্যাগ করেন।

এইখানেই শেষ হতে পারত বিকর্ণ-নামা। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, কেন তিনি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করলেন অধর্মী দুর্যোধনের পক্ষে, যাঁর বিরোধে একসময় তিনি প্রতিবাদের কণ্ঠ ছেড়েছিলেন? কৌরব হয়েও দাসীপুত্র যুযুৎসু ও বিকর্ণ ছাড়া কেউই ন্যায়ের পথে হাঁটেননি। দুর্যোধনের তৃতীয় ভাই হওয়া সত্ত্বেও সিংহাসন প্রাপ্তির লোভ তাঁর ছিল না। তাহলে তো তিনি শেষ মুহূর্তে পাণ্ডবদের দিকে ভিড়ে যেতে পারতেন। যুদ্ধের আগে পক্ষ চয়নের সুযোগ তো তাঁর ছিল। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। ধর্মের পক্ষে থেকে যে বিকর্ণ দ্যুতসভায় দ্রৌপদীর হয়ে চেঁচিয়েছিলেন, সভাস্থল ছেড়েছিলেন, কুরুক্ষেত্রের ময়দানে তিনি শেষপর্যন্ত ভ্রাতৃধর্ম পালন করলেন। সেই জন্য যুগ কাল পেরিয়েও আদর্শের নাম বিকর্ণ। সমগ্র নারীজাতির হয়ে তিনিই একমাত্র কণ্ঠস্বর। একলা হলেও আজও বোধ, বিবেক ও চেতনার প্রতীক একশো ভাইয়ের একজনা।

আজ এই দেশে মহিলাদের নড়বড়ে অবস্থা, বালিকার যৌন নিগ্রহের হাড়হিম করা প্রতিবেদনগুলি তার প্রমাণ। এই অবস্থায় মহিলাদের নিজস্ব চিৎকার, নিজস্ব রাগকে শক্তি দিতে বিকর্ণদের প্রয়োজন পড়বেই। শেষবেলায় গলা তুলে বলতে হয়-

“অত্যাচারের সামনে এলে, সঙ্গী শুধু চোখের জল

পোষ্যভাবে জাবনা চেবাই, অন্ধ এবং নি-কর্ণ,

প্রার্থনা থাক আমরা যেন, একবার হই বিকর্ণ।

মরার আগে হতেই হবে, রাজার সভায় বিকর্ণ।”

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।