দেশ চালনায় সরকারের আসল ভূমিকা

Writer in Residence
৪ মিনিট
দেশ চালনায় সরকারের আসল ভূমিকা

সরকার একটি সমাজ-কল্যাণমূলক সংস্থা। সারা পৃথিবীর যাবতীয় সরকারি পরিকাঠামো মূলত একই রকম হলেও, দেশ ও তৎকালীন সরকারের নীতি অনুযায়ী কিছু বিশেষ পরিবর্তন হয়ে থাকে। যদিও আমাদের আজকের বিষয় কোনও বিশেষ সরকারের কার্যকলাপ বা নীতি নয়, বরং মূল কাঠামোর ওপর আলোকপাত করা। ধরে নেওয়া যাক, ভারতীয় পরিকাঠামোর কথা; ভারতে সাংবিধানিক ভিত্তিতে দুটো মূল স্তরিয় ভাগ থাকে। কেন্দ্র সরকার এবং রাজ্য সরকার, কেন্দ্র সরকার নির্বাচিত হয় লোকসভা ভোটের নিরিখে এবং রাজ্য সরকার নির্বাচিত হয় বিধানসভা ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে। কেন্দ্রে থাকা সরকার সারা দেশের যাবতীয় কার্যকলাপের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, অপর পক্ষে রাজ্য সরকার আঞ্চলিক অর্থাৎ নির্দিষ্ট একটি রাজ্যের যাবতীয় সিদ্ধান্ত এবং কার্যকলাপের দায়িত্বে থাকেন। এছাড়া প্রতিটি দেশে একজন রাষ্ট্রপ্রধান থাকেন, যাকে রাষ্ট্রপতি বলা হয়, এবং রাজ্য প্রধান কে রাজ্যপাল বলা হয়। দেশের ভিত্তিতে এই আসন গুলির শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায় কিছু পরিবর্তন হয়ে থাকে।

ছবি সৌজন্যে : Googleআপাতপক্ষে মুনাফা বাড়ানোর কোন উদ্দেশ্য না করে সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য কাজ করা সরকারের দায়িত্ব। দেশের উন্নয়নে সরকারের সরাসরি ভূমিকা গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি দিক হল কৃষি। ভারত একটি কৃষিভিত্তিক দেশ এবং ভৌগলিক অবস্থানের ভিত্তিতে ভারতীয়দের প্রধান পেশা হল কৃষি এবং এর সংশ্লিষ্ট কাজ, যেমন কৃষিকাজ, হাঁস -মুরগি, গবাদিপশু পালন, মাছ চাষ ইত্যাদি। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ৬৭ শতাংশ শ্রমশক্তি কৃষিতে নিয়োজিত। তারা দেশের জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশ উৎপাদন করে থাকে। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা এবং অনুপযুক্ত বাস্তবায়নের কারণে ভারতীয় কৃষির উৎপাদনশীলতা খুবই দুর্বল। অনুপযুক্ত ভূমি ব্যবস্থা বা খারাপ জমিতে চাষ, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থা, আদিম প্রযুক্তি ও পদ্ধতিতে চাষ ইত্যাদি ভারতীয় কৃষির কম উৎপাদনশীলতার পিছনে প্রধান কারণ। এই সমস্ত অসুবিধা কাটিয়ে উঠতে সরকার প্রতি হেক্টর জমিতে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ভূমি সংস্কার, বিভিন্ন কৃষি আইন, অর্থনৈতিক ভর্তুকি ইত্যাদি সহ বেশ কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। কৃষির পর ভারতের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ন অংশ হল শিল্প, দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অর্থাৎ ১৯৫৬ সালে ভারত সরকার ইস্পাত, লোহা, সিমেন্ট, বিদ্যুৎ ইত্যাদি শিল্পের উন্নয়নে ব্যাপক জোর দিয়েছিল, যদিও ভোগ্যপণ্য শিল্প যেমন খাবার, কাপড় ইত্যাদির লভ্যাংশ বেড়ে উঠতে শুরু করলেও, মূলধন পণ্য শিল্প যেমন টেক্সটাইল শিল্প, মেশিনারি শিল্প, ইলেকট্রনিক্স পণ্য ইত্যাদি নিজেদের গতি হারিয়ে ফেলে। এই পরিস্থিতিগুলি রক্ষার জন্য, ১৯৯১ সালে তৎকালীন ভারত সরকার নতুন শিল্প নীতি গ্রহণ করে। নতুন নীতি দ্বারা, সরকার কিছু সংস্থাকে ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য সহ ভোগ্যপণ্য শিল্পের বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত লাইসেন্স দেয়। সাথে সাথেই শিল্পপতিদের উৎপাদনের মাত্রা বাড়ানোর জন্য যথাযথ ঋণ সুবিধা এবং পর্যাপ্ত ভর্তুকিও দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে কৃষি এবং শিল্প খাতের মধ্যে স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন হয় একটি শক্তিশালী আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামো। এই সময় সরকার বিদ্যুৎ, পরিবহন, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ইত্যাদি প্রচুর মূলধনের শিল্পগুলির উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে শুরু করে। এছাড়া প্রতিটা দেশের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরণের প্রাকৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পদ থাকে। এই সম্পদগুলি অর্থনীতির সর্বাধিক চাহিদা পূরণের জন্য সর্বোত্তম ব্যবহার প্রয়োজন। এই সম্পদ সাধারণত দেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাবলীল করতে সাহায্য করে। এই সম্পদের ব্যবহার এবং মালিকানা সরকারের হাতে থাকে এবং এর সুষ্ঠ ব্যবহার প্রয়োজন হয়। সরকার বা রাষ্ট্র কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আইন -শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণভাবে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য রাষ্ট্র প্রতিরক্ষা, পুলিশ এবং আদালত পরিচালনা করে। এছাড়া সামাজিক বণ্টনমূলক ন্যায়বিচার বাস্তবায়নের জন্য, অর্থাৎ ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য কমাতে, সরকার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন, কর বা রাজস্ব; আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে করের হা

ছবি সৌজন্যে : Googleর বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, আয় অনুযায়ী উপার্জনকারী লোকেরা কর দিয়ে থাকেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় পণ্য ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্র ক্ষেত্র বিশেষে অর্থনৈতিক ভর্তুকি দিয়ে থাকে। আবার দরিদ্র কৃষকদের চাষের জন্য তাদের বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি কেনার জন্য ভর্তুকি দেওয়া সরকারের নীতির মধ্যে পড়ে। নাগরিকদের সুবিধা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্র বেশ কিছু নিয়ন্ত্রণনীতি গ্রহণ করে। ভারত সরকার কিছু একচেটিয়া উদ্যোক্তাদের হাত থেকে দেশীয় অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ভোক্তা শোষণ বন্ধ করতে Monopolies and Restrictive Trade Practices বা একচেটিয়া ও সীমাবদ্ধ বাণিজ্য আইনের নীতি গ্রহণ করে। এছাড়া রাষ্ট্র আরও কয়েকটি উপায়ে অর্থনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে, মূল্য বা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, বাজারদর নিয়ন্ত্রণ ও কালোবাজারি বন্ধ করা, অর্থনৈতিক সংকটের সময় সরাসরি অংশগ্রহণ, যুদ্ধের জরুরি অবস্থা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় একক হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সময় সরাসরি হস্তক্ষেপ ইত্যাদি। এছাড়া সরকার সরাসরি বাজেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শিক্ষাখাত, সামরিকখাত, কৃষি, শিল্পখাত, স্বাস্থ্যখাত এবং আরও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খাতে অর্থ সরবরাহ করতে পারে। এক্ষেত্রে আরেকটি বিশেষ নীতি হল বিদেশ নীতি, এক্ষেত্রে বিদেশ থেকে বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন কিংবা ঋণ একটি দেশের স্বাভাবিক বৃদ্ধির হারকে সাহায্য করতে পারে। বৈদেশিক বাণিজ্য নীতিতে সরকার শুল্ক ইত্যাদি আরোপ করে বাণিজ্য নীতিগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে, ব্যালেন্স অব পেমেন্ট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, রপ্তানি ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ বাণিজ্য নীতির মূল উদ্দেশ্য। একটি সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে দেশে মানব কল্যাণ প্রচার করা। এছাড়া রাজ্য সাধারণত প্রতিরক্ষামূলক নিয়ন্ত্রণ, বহিরাগত আগ্রাসন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব, দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে সামাজিক নিরাপত্তা, বীমা প্রদান, দরিদ্র, অসুস্থ এবং বেকারদের সহায়তা, শিক্ষা, চিকিৎসা সহায়তা, আবাসন, গ্রন্থাগার, পাবলিক পার্ক, খেলাধুলার মাঠ, প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদের উন্নয়ণ, অর্থনৈতিক কার্যাবলী -প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্যায়ন, অনুসন্ধান এবং সর্বোত্তম ব্যবহার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করা এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ব্যবস্থা করে অর্থনৈতিক উন্নতি করার ক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে।

সুতরাং সরকার মূলত অর্থনৈতিক উন্নয়নের কান্ডারী হিসেবে নয়, আইনি এবং সামাজিক কাঠামো প্রদান করা, তার সুশৃঙ্খলা বজায় রাখা, জনসাধারণকে পণ্য ও পরিষেবা প্রদান করা, জাতীয় প্রতিরক্ষা, আয় এবং সামাজিক কল্যাণ, সঠিক বৈদেশিক এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল করার কাজ করে থাকে। পাশাপাশি উচ্চস্তরের কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করে। উল্লেখ্য, এই নীতি বা আইন সভ্যতার আধুনিকতম সংস্করণ। তবে বহু ঐতিহাসিক দাবি করেন, মৌর্য শাসক সম্রাট অশোক আনুমানিক ২৩০০ বছর আগে এই নীতির প্রচলন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে সারা বিশ্বে বিপুল জনপ্রিয় এবং কার্যকরী হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে প্রয়োজন অনুযায়ী এই কাঠামোয় আরও অনেক পরিবর্তন আসতেই পারে।

তথ্য সূত্র:

  • https://www.economicsdiscussion.net

  • https://www.slideshare.net/

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।