অন্য কালীঘাট

Arunima Mukherjee
৩ মিনিট
অন্য কালীঘাট

পশ্চিমবঙ্গের উল্লেখযোগ্য কালীমন্দিরগুলোর মধ‍্যে কলকাতার কালীঘাট অন‍্যতম । তাই তো বছরভর পূণার্থীদের ভিড় লেগে থাকে এই মন্দির চত্বরে । বর্তমানে কলকাতার দ্রষ্টব্য স্থানগুলির মধ‍্যে আকর্ষণ কেড়েছে কালীঘাট । কলকাতার কালীঘাট প্রসঙ্গে সচরাচর দুটি বিষয় উঠে আসে । দেবী কালীর আরাধনার সঙ্গে উঠে আসে কালীঘাটের বিবাহ প্রসঙ্গ‌ও । কখনো এই বিবাহ সম্পন্ন হয়ে থাকে পবিবারের সদস‍্যদের সাক্ষী রেখে আবার কখনো পরিবারের অনুমতি না মিললে মানুষ শাস্ত্রীর মতে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ‍্যে কালীঘাটে ভিড় জমায় । বাংলায় এতো কালীমন্দির থাকতে কেন মানুষ ছুটে আসে কালীঘাটে বিয়ে সারার জন‍্য , সে কথা বলবো অন‍্যদিন । আজ বরং বলি কলকাতার কালীঘাটের মতোই অন‍্যরকম সব কালীঘাটের কথা , যেখানে পরিবার কিংবা সমাজের চোখে ধুলো দিয়ে দুটি মানুষের প্রেম এক পূর্ণতা লাভ করতো ।

প্রথমেই বলি , গ্ৰেটনা গ্ৰিনের কথা । গ্ৰেটনা অবস্থিত ছিল ইংল‍্যান্ড আর স্কটল‍্যান্ডের সীমানায় । এই গ্ৰেটনা গ্ৰিনে অবস্থিত একটি চার্চ ছিল উনিশ শতক অবধি ইংল‍্যান্ডের কালীঘাট । খাতায় -কলমে এবং ভূগোল ও আইনে গ্ৰেটনা তখন ছিল স্কটল‍্যান্ডের অধীনে । সমস্ত ইংলিশ চার্চ থেকে খারিচ হ‍ওয়া পাত্র -পাত্রীদের শেষ ঠিকানা ছিল এই গ্ৰেটনা । রাত -বিরেতে কোন ভগবান গ্ৰেটনার চার্চে ছিল না কারণ চার্চটি আসলে ছিল নন-অফিসিয়াল । গ্ৰেটনায় আর কলকাতার কালীঘাটের পুরোহিতরা ছিলেন সমশ্রেণীর । গ্ৰেটনায় যারা পাদরি সেজে এই বিবাহ কাজ সম্পন্ন করতেন তারা আসলে ছিলেন পাশের‌ই কোন গ্ৰামের চাষি কিংবা কামার গোষ্ঠীর লোক । হয়তো এই কারণেই গ্ৰেটনায় কোন নির্দিষ্ট দক্ষিণা ছিল না অর্থাৎ যে যেমন দেয় আর কী । একবার এক সাহেব দক্ষিণা বাবদ এক পাদরিকে দিয়েছিলেন কুড়ি পাউন্ড আবার এক গরীব চাষি দিয়েছিলন কেবল এক পেগ হুইস্কি । তবে গ্ৰেটনায় যারা আসতেন তারা বেশিরভাগ‌ই ছিলেন উচ্চবিত্ত কারণ গ্ৰেটনার এই চার্চ ছিল শহরতলি থেকে বেশকিছু দূরে , যাতায়াত বেশ কয়েকদিনের মামলা তাই যে সাহেবের, চার ঘোড়ার গাড়ি হাঁকিয়ে আসতে বিন্দুমাত্র অনুতাপ হবে না তারাই মূলত এই চার্চকে বিকল্প পথ হিসাবে বেছে নিতেন । এইখানে আবার হানিমুনের ব‍্যবস্থাও ছিল । চার্চের পাশেই নাকি ছিল সারি সারি ঘর । ব‍্যবস্থাপকরা নিজেই বলে গেছে এই ঘরগুলোর উদ্দেশ্যে ছিল বিয়ের ভীতকে খানিক মজবুত করা । এই ঘরগুলোকে বলা হত ‘নেপচুয়াল চেম্বার’। গ্ৰেটনা যেহেতু ছিল নন-অফিসিয়াল তাই অভিভাবকরা এই বিয়ে অস্বীকার করলেও ‘নেপচুয়াল চেম্বার’কে অস্বীকার করার মূর্খামো নিশ্চয়ই করবেন না ।

এইরকম আরো দুটি কালীঘাটের কথা বলা যাক । তবে এই চার্চ দুটি ছিল এদেশীয় । একটি চার্চ ছিল পর্তুগিজদের আর অন‍্যটি ইংরেজদের । ভারতবর্ষে যখন ইংল‍্যান্ড থেকে কোন লোক আসতো তখন সে আসতো একাই । কিন্তু একা কি আর জীবন কাটানো যায় । ইংরেজরা পরলেন ভারী বিপদে । অন‍্যদিকে পর্তুগিজরা পুরানো খ্রীষ্টান হবার কারণে তাদের ওতো বাছবিচার ছিল না । ভারতে এসে তারা অতি সহজেই ভারতীয় মহিলাদের বিয়ে ঘরকন্না করেছেন । সুতরাং ইংরেজদের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম শিথিল করা হল , তবে তারমধ‍্যেও আবার তারতম‍্য ছিল । কেবলমাত্র সাজেন্টের থেকে নীচু পোস্টে যারা কাজ করতেন , তারা চাইলে এই পর্তুগিজ-পন্থা অবলম্বন করতে পারতেন কিন্তু অন‍্যদিকে সাজেন্টের থেকে যারা উঁচু পোস্টে কাজ করতেন তাদের জন‍্য পূর্বের অবস্থাই বহাল থাকলো । তাই বাধ‍্য হয়ে তারা ধরল বিকল্প পথ , কালীঘাটের পথ । কলকাতার ডালহৌসির সেন্ট জন চার্চ ছিল এরকমই এক ইংরেজদের কালীঘাট।

সেইসময় এদেশে যারা পাদরি হিসাবে আসতেন , তারা থাকতেন রাজার হালে । বছর বছর তাদের মাইনে বাড়তো , সাথে বাড়তে থাকতো বিয়ে কিংবা শ্রাদ্ধের দক্ষিণাও । এতকিছুর পরেও পাদরিদের চার্চের কাজে মন বসতো না । ম‍্যাকর‍্যাবি লিখেছেন , কলকাতার কোন পাদরি ছিলেন শিকারে পারদর্শী , কারোর ব‍্যবসা আবার সৈন‍্যদলে বলদ পাচার করা , কারোর আবার চিনা পদ্ধতিতে বাগান করার শখ । কেউ আবার ডুবে থাকতেন জুয়ার নেশায় । একটা সময় মৃত কোন ব‍্যক্তিকে কবর দিতে হলে পাদরিদের রীতিমতো তুলে নিয়ে আসতে হতো জুয়ার আড্ডা থেকে । ব‍্যারিস্টার হিকি সাহেব লিখেছেন , কলকাতার সৈন‍্যবাহিনীর এক পাদরি এক একদিন অতিরিক্ত মদ‍্যপান করে নাচ-গান করে দেখার মতো কাণ্ড করে বসতো । বোঝাই যায় , ইংরেজি কালীঘাট কীরকম এক খোরাকের স্থান ছিল।

এবার আসা যাক , পর্তুগিজদের কালীঘাটের কথায় । এই কালীঘাট ছিল কলকাতা থেকে ২০মাইল দূরে ব‍্যন্ডেলে । বাংলার সবচেয়ে পুরানো গির্জা এটি । স্থাপিত হয়েছিল ১৫৯৯ সালে । ব‍্যন্ডেলের এই গির্জায় ‘নানারি’ ছিল একটি । সেখানে থাকতো সুন্দরী এবং কম বয়েসী খ্রিষ্টান সন্ন‍্যাসিনীরা । তারা সবাই যে পর্তুগিজ ছিলেন এমন নয় , ইউরোপীয়‌ও না হয়তো । কিন্তু যেহেতু সবাই ছিলেন খ্রিষ্টান , তাই যেখানে যত খ্রিষ্টান পুরুষ ছিল সবাই মাঝে মাঝেই ছুটে আসত এই স্থানে । এখানে নাকি এই মেয়েদের পাত্রী হিসাবে কিনতে পাওয়া যেত । এসিয়াটিকাস নামে এক ছদ্মবেশী এই কথা শুনে ১৮০৩সালে একবার গেছিল ব‍্যন্ডেলে , কিন্তু তখন সব অতীত ‌।

এই ছিল অন‍্যরকমের কিছু কালীঘাটের গল্প । এরকম হয়তো অনেক চার্চ‌ই তখন ছিল যা কালের প্রবাহে আজ নিশ্চিহ্ন । কিন্তু কলকাতা এতো বছর পরেও স্বমহিমায় বিদ‍্যমান । কবিতার কথায় বলতে হয়, কলকাতা আছে কলকাতাতেই ।

  • তথ্যসূত্র – শ্রীপান্থ রচিত ‘কলকাতা’।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।