আমেরিকার বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় এই নিরামিষ ভারতীয় আইসক্রিম

সব ধরনের মানুষের কথা মাথায় রেখে রকমারি স্বাদের আইসক্রিম নিয়ে এসেছে এই কোম্পানি।

Piya Saha
৩ মিনিট
আমেরিকার বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় এই নিরামিষ ভারতীয় আইসক্রিম

নয়ের দশকে বরফের গোলা বা মালাই গাড়ির ঘণ্টার আওয়াজ শুনে ছুটে ঘর বেরিয়ে আসত বাচ্চা-বুড়ো সকলেই। কত দুপুরে বাবা-মায়ের কাছে বায়না করে ছোট্ট শিশুর কপালে জুটেছে শুধু বকা। আবার কোনও সময় সাধ মেটাতে তাঁরাই কিনে দিয়েছে ঠান্ডা মিষ্টি গোলা বা মালাই আইসক্রিম। শৈশবের এইসব স্মৃতি ভোলার নয়। আজকের আইসক্রিম আর ২৫ বছর আগের আইসক্রিমের মধ্যে ফারাক অনেক। তবে আইসক্রিমের জনপ্রিয়তা কমেনি এতটুকু। কিন্তু ভারতীয়দের আইসক্রিমের প্রতি দুর্বলতা তৈরির নেপথ্যে রয়েছে ভাদিলাল। আমূল, রসনার মতোই গুজরাত থেকে পথচলা শুরু করে এই আইসক্রিম প্রস্তুতকারী সংস্থা। স্বাধীনতার আগে হাতে তৈরি আইসক্রিম থেকে আজ সাফল্যের শীর্ষে যেভাবে পৌঁছলো ভাদিলাল সংস্থা, তা জানলে চমকে উঠতে হয়।

তখনও পরাধীন ভারতবর্ষ। স্বাধীনতার প্রায় চল্লিশ বছর আগে ১৯০৭ সালে গুজরাতের আহমেদাবাদে জন্ম নেয় ভাদিলাল নামক আইসক্রিম প্রস্তুতকারী এই সংস্থা। তবে প্রথমদিকে সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ভাদিলাল গান্ধী সোডা বিক্রী করতেন। ব্যবসায় লাভের পরিমাণ কমতে থাকলে সেই ব্যবসা ছেড়ে দেন তিনি। এরপরেই আইসক্রিম তৈরি শুরু করেন ভাদিলাল গান্ধী। তবে শুরুর দিকে চিরাচরিত কোঠি পদ্ধতিতে হাতে চালানো মেশিনে দুধ, বরফ এবং নুন ভালোভাবে মিশিয়ে তৈরি হত আইসক্রিম। নিজের হাতে তৈরি করা আইসক্রিম বাড়ি বাড়ি বিক্রি করতেন ভাদিলাল। ধীরে ধীরে ব্যবসা ও লাভ দুইই বেড়ে চলেছিল।

১৯২৬ সালে ছেলে রাঞ্চোড লাল গান্ধী ব্যবসার দায়িত্ব নেন। ছেলে যোগ দেওয়ার বছরেই জোড়া সাফল্য আসে কোম্পানির হাতে। সেই বছর জার্মানি থেকে আইসক্রিম তৈরির জন্য মেশিন কেনে তাঁরা। দ্বিতীয় সাফল্য হিসেবে ওই বছর প্রথম আউটলেট শুরু করে এই সংস্থা। বাবা-ছেলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ব্যবসা আরও বাড়তে থাকে। স্বাধীনতার সময়েই ভাদিলাল কোম্পানির চারটি আউটলেট ছিল দেশে । সত্তরের দশকে ভাদিলালের দুই নাতি রামচন্দ্র এবং লক্ষ্মণ গান্ধীও পারিবারিক এই ব্যবসায় যোগ দেন। ততদিনে আউটলেটের সংখ্যা চার থেকে বেড়ে দশ হয়ে গেছে।

ক্রেতাই যে লক্ষ্মী, তা ভালোমতোই জানতেন ভাদিলাল।তাই তাঁদের সঙ্গে যথেষ্ট ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেই চলতেন তিনি। সম্পূর্ণ নিরামিষ পদ্ধতিতে তৈরি এই আইসক্রিমই ছিল কোম্পানির ইউএসপি (ইউনিক সেলিং প্রপোজিশন)। বাজার ধরতে বিজ্ঞাপনেও ছিল কারসাজি। এই সংস্থার বিজ্ঞাপনে দেখানো হত, নিরামিষ এই আইসক্রিম আপনি উপোস করেও নির্দ্বিধায় খেতে পারেন।

পায়ের তলার মাটি শক্ত হতেই ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্যে মন দেয় এই কোম্পানি। ১৯৮৫ সাল নাগাদ গুজরাত ছাড়াও দেশের একাধিক রাজ্যে আইসক্রিম বিক্রি করতে শুরু করে এই সংস্থা। ১৯৯০ সাল নাগাদ গান্ধী পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মও যোগ দেয় কোম্পানিতে। রামচন্দ্র গান্ধীর ছেলে বীরেন্দ্র ও রাজেশ গান্ধী এবং লক্ষ্মণের ছেলে গান্ধী সংস্থার দ্বায়িত্ব নেন।

১৯৯০ সালেই কোম্পানি ভাদিলাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে নামে বম্বে স্টকমার্কেটের তালিকাভুক্ত হয় এই সংস্থা। তবে সেই বছরই পারিবারিক সমস্যায় আলাদা হয়ে যায় গান্ধী পরিবার। ফলস্বরূপ একই নামে ভাদিলাল কোম্পানির দু'টি শাখা বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে নাম নথিভুক্ত করায়। ২০১৯-'২০ অর্থবর্ষে কোম্পানির আয় ৬৫০ কোটি টাকায় পৌঁছয়।

তবে সংস্থার কাছে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ফ্যাক্টরিতে তৈরি আইসক্রিম অন্যত্র পৌঁছে দেওয়া। সেসময় ফ্রিজিং ব্যবস্থাও এখনকার মতো উন্নত ছিল না। প্রথম ফ্রিজিং গাড়ি আনতে কোম্পানির সময় লেগেছিল পাক্কা তিন বছর। এছাড়াও উদার অর্থনীতির কারণে বিদেশি কোম্পানির আগমন ছিল আরও একবার বড় ধাক্কা। তবে বিদেশি সংস্থার চাপের মুখেও দেশের সব রাজ্যের বাজারেই ছড়িয়ে পড়ে ভাদিলাল আইসক্রিম।

১৯৯৫ সালে ভাদিলাল কোম্পানি মার্কিন বাজারে হিমায়িত সবজি নিয়ে আসা প্রথম ভারতীয় ব্র্যান্ড। আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সবচেয়ে বিক্রি হওয়া ভারতীয় আইসক্রিম ব্র্যান্ড ভাদিলাল। শুধু তাই নয়, আজ ভারত ছাড়াও ৪৫টি দেশে রপ্তানি হয় ভাদিলাল আইসক্রিম। কোম্পানির সম্প্রসারণের পাশাপাশি এই সংস্থাই প্রথম যারা ভারতে কোন, ডলিস এবং সান্ডাই আইসক্রিম বিক্রি শুরু করে। সঙ্গে আইসক্রিম কোন তৈরির জন্য মেশিনও আমদানি করে বিদেশ থেকে।

২০০১ সালের নভেম্বরে এই সংস্থা 'দ্য লার্জেস্ট আইসক্রিম সান্ডাই' তৈরি করে লিমকা বুক অব রেকর্ডসে জায়গা করে নেয় এই কোম্পানি। ৪৯৫০ লিটারের ওই আইসক্রিম তৈরি করতে ১২৫ কেজি শুকনো ফল এবং ২৫৫ কেজি তাজা ফলের ব্যবহার করা হয়। সঙ্গে প্রায় ৩৯০ লিটার বিভিন্ন ধরনের সস ছিল এই আইসক্রিমে।৬০ মিনিটে ১৮০ জন লোক একসঙ্গে মিলে প্রস্তুত করেছিল এই সান্ডাই আইসক্রিমটি।

বিভিন্ন দামের, সব ধরনের মানুষের কথা মাথায় রেখে রকমারি স্বাদের আইসক্রিম নিয়ে এসেছে এই কোম্পানি। সাধারণ মানের আইসক্রিম থেকে সর্বোচ্চ মানের আইসক্রিম- সবই রয়েছে ভাদিলাল কোম্পানির।

১১৫ বছরেরও পুরনো এই সংস্থা আজও ক্রেতাদের মতামতকে ততটাই গুরুত্ব দেন। বিভিন্ন রকম সোশ্যাল মিডিয়া এবং সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে ক্রেতাদের মতামত গ্রহণ করে এই সংস্থা। সুদীর্ঘ এই যাত্রাপথের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে রয়েছে শ্রম ও সংঘর্ষের কথা।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।