শিকড়, পাতা, ফুল, ডালপালা কিচ্ছু নেই! তরল গাছ আবিষ্কার করে অসাধ্য সাধন বিজ্ঞানীদের

Liquid Tree : এই তরল গাছ ব্যবহার করে শহুরে সেই জায়গাগুলিকে বাঁচানো সম্ভব যেখানে গাছ লাগানোর কোনও জায়গা নেই।

Madhurima Dutta
৩ মিনিট
শিকড়, পাতা, ফুল, ডালপালা কিচ্ছু নেই! তরল গাছ আবিষ্কার করে অসাধ্য সাধন বিজ্ঞানীদের

বাগান করবেন, সাধ আছে। নানা গাছ গাছালিতে, পাখির কিচিরমিচিরে চারপাশ ভরে থাকবে, ইচ্ছে আছে। কিন্তু থাকেন তো হদ্দ শহরে। দেশলাই বাক্সের মতো একের উপর এক ফ্ল্যাটবাড়ি। ছোট্ট একটুকরো ব্যালকনিতে ইচ্ছেরা বনসাই হয়েই থাকে। অতটুকুই ঠাঁই। বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড বাড়ছে, বাতাসকে প্রাকৃতিকভাবে বিশুদ্ধ করা যাচ্ছে না। গাছ লাগানোর দরকার কিন্তু চারা পুঁতবেন কোথায়? ফুটপাথে কংক্রিট, ছাদে ঢালাই, মাটিই বা কই? ঘনবসতির শহরে সামান্য ঝোপেরই জায়গা নেই, গাছ দূর অস্ত। প্রবল ঘিঞ্জি শহরের জন্য এবার তরল গাছ তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা! তরল গাছ? এ কেমন বস্তু? গাছ কীভাবে তরল হতে পারে জলের মতো? পাতা নেই, শিকড় নেই, ফুল নেই, ফল নেই, কাণ্ড নেই, তবু গাছ! লিকুইড গাছ! অবাস্তব মনে হলেও এমনটাই সম্ভব করেছেন সার্বিয়ান বিজ্ঞানীদের একটি দল।

আইএইচএমই গ্লোবাল হেলথ ডেটা এক্সচেঞ্জ টুল-এর তথ্য বলছে, পরিবেশ দূষণের কারণে বছরে এইচআইভি/এইডস, যক্ষ্মা এবং ম্যালেরিয়ার চেয়ে তিনগুণ বেশি মানুষ মারা যান। দু'টি বিশাল বড় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে, বেলগ্রেড সার্বিয়ার সবচেয়ে দূষিত শহরগুলির মধ্যে একটি। এই দু'টি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ২০১৯ সালে হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অ্যালায়েন্সের (HEAL) ইউরোপের ১০টি নোংরা কারখানার তালিকায় ছিল। সামগ্রিকভাবে, ২০২০ সালে সবচেয়ে বায়ুর সবচেয়ে খারাপ গুণমানের জন্য সার্বিয়া বিশ্বে ২৮ তম স্থানে রয়েছে। বর্তমানে, দেশটির PM ঘনত্ব ২.৫, যা WHO-এর বার্ষিক বায়ু মানের নির্দিষ্ট মান থেকে ৪.৯ গুণ বেশি। এই দেশের নাগরিকরা তীব্র দূষণের তীব্রতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভোগেন। ২০১৯ সালের তথ্য বলছে, ইউরোপের মধ্যে সার্বিয়াতেই দূষণজনিত কারণে মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ। প্রতি ১ লাখে ১৭৫ জন, তারপরেই আছে জর্জিয়া এবং বুলগেরিয়া। সার্বিয়ান জনসংখ্যার ৫৯% শহরাঞ্চলে বাস করে এবং এই হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেহেতু জনসংখ্যার ঘনত্ব এত বেশি তাই সবুজ এলাকা তৈরি করা এবং গাছ লাগানো কার্যত অসম্ভব।

এখানেই কিস্তিমাত করেছেন ডঃ ইভান স্পাসোজেভিক। বায়োফিজিকাল সায়েন্সের গবেষক ডঃ ইভান বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চের প্রকল্পের একজন লেখক। গ্রিনহাউস গ্যাস কমাতে এবং বায়ুর গুণমান উন্নত করার জন্য এক অভাবনীয় জিনিস আবিষ্কার করেছেন তিনি: তরল গাছ। এই তরল গাছের নাম LIQUID 3। এই তরল গাছ সার্বিয়ার প্রথম শহুরে ফটো-বায়োরিঅ্যাক্টর। এতে রয়েছে ছ'শো লিটার জল রয়েছে এবং মাইক্রোঅ্যালগি। কার্বন ডাই অক্সাইডকে আবদ্ধ করতে এবং সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে বিশুদ্ধ অক্সিজেন তৈরি করার কাজ করে মাইক্রোঅ্যালগি।

দু'টি ১০ বছর বয়সী গাছ বা ২০০ বর্গ মিটারের সবুজ মাঠ যা করে, এই মাইক্রোঅ্যালগি আসলে সেই কাজই করে। তরল গাছ কেন বলা হচ্ছে তবে? গাছ এবং ঘাস দুই-ই সালোকসংশ্লেষ করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইডকে আবদ্ধ করে। মাইক্রোঅ্যালগির গাছের তুলনায় ১০ থেকে ৫০ গুণ বেশি কার্যকর। LIQUID 3-এর নেপথ্যে থাকা গবেষকরা বলছেন, তাঁদের লক্ষ্য বন বা বৃক্ষ রোপণের বিকল্প তৈরি নয়। এই তরল গাছ ব্যবহার করে শহুরে সেই জায়গাগুলিকে বাঁচানো সম্ভব যেখানে গাছ লাগানোর কোনও জায়গা নেই। তীব্র দূষণে অনেক গাছই বেঁচেও থাকতে পারে না। LIQUID 3 বেলগ্রেডের মেকডনস্কা স্ট্রিটে স্টারি গ্র্যাড পৌরসভার সামনে স্থাপন করা হয়েছে। এটি ব্যস্ত শহুরে এলাকা যেখানে CO2 নির্গমনের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি।

ফটোবায়োরিঅ্যাক্টর হচ্ছে বায়ু পরিশোধন এবং অক্সিজেন উৎপাদনের একটি সম্পূর্ণ নতুন জৈব প্রযুক্তিগত সমাধান। ছ'শো লিটার জলের অ্যাকোয়ারিয়ামে যা শ্যাওলা আছে তা কার্বন ডাই অক্সাইডকে আবদ্ধ করে এবং সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে বিশুদ্ধ অক্সিজেন তৈরি করে। LIQUID 3 আসলে একটি বেঞ্চ, এতে মোবাইল ফোনের জন্য চার্জার রয়েছে, পাশাপাশি একটি সৌর প্যানেল রয়েছে, যার কারণে রাতেও এই বেঞ্চে এসে বসলে আলো পাবেন। ডঃ ইভান স্পাসোজেভিক বলছেন, এককোষী মিষ্টি জলের শ্যাওলা ব্যবহার করা হচ্ছে যা সার্বিয়ার পুকুর এবং হ্রদে প্রচুর মেলে এবং কলের জলেই বৃদ্ধি পেতে পারে। এই তরল গাছের বিশেষ দেখভালের দরকারও নেই। এটি শ্যাত্তলাগুলিকে আলাদাও করে ফলে জৈববস্তু তুলে ফেলে তা পরে সার হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতি দেড় মাসে অন্তর নতুন জল এবং এই মাইক্রোঅ্যালগি ঢালা হয় এবং শ্যাত্তলাগুলি অনির্দিষ্টকালের জন্য বৃদ্ধি পেতে থাকে।

LIQUID 3 নিঃসন্দেহে প্রযুক্তির স্মার্ট ব্যবহার। নগরোন্নয়ের পরিকল্পনায় এই তরল গাছ যে কতখানি এগিয়ে থাকা একটি ভাবনা তা বলাই বাহুল্য। ভারতের ঘিঞ্জি শহরগুলোতে কি তরল গাছের মাধ্যমে বায়ু পরিশোধন সম্ভব? আগামীতে এমন প্রযুক্তির বাস্তবায়ন এদেশে সম্ভব করতে গিয়ে এগিয়ে আসবেন গবেষক, চিন্তক, পরিবেশপ্রেমী মানুষরা?

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?