অস্ত্র সেই সিএএ, মমতার নাম করে কেন আক্রমণ করছেন অমিত শাহ?

Kanad Dasgupta
৪ মিনিট
অস্ত্র সেই সিএএ, মমতার নাম করে কেন আক্রমণ করছেন অমিত শাহ?

গোটা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি৷ কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি'র দ্বিতীয় শীর্ষনেতা তিনি৷ তাঁর মুখে এমন ভাষা!

সাধারণত পাড়ার তথাকথিত দাদা'রা চায়ের দোকানে বসে যে ভাষায় কথা বলে, যেভাবে 'দেখে নেওয়ার' ইঙ্গিত দেয়, ঠিক যেন সেই ভাষাই উঠে এসেছে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে৷ সবসময়ই তা দুর্ভাগ্যজনক৷ আর এই আচরণ তিনি যদি একজন মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি করেন, তাহলে তো তা অমার্জনীয় অপরাধ৷

কেন্দ্রের বিজেপি সরকার দেশজুড়ে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ চালু করতেই পারে৷ সংসদের উভয়কক্ষে সংখ্যাধিক্যের জোরে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাশ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। রাষ্ট্রপতি সই করার পর সেই বিল আইনেও পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর মাঝে বছর আড়াই কাটলেও সিএএ আইনের নীতি এখনও সম্পূর্ণভাবে প্রণয়ন হয়নি। সংসদ ইতিমধ্যে একাধিকবার সিএএ আইনের নীতি প্রণয়নের সময়সীমা বাড়িয়েছে। কেন্দ্রের তরফে আদালতে এজন্য করোনা অতিমারিকেই কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে৷ এই আইন নিয়ে গোটা দেশে আন্দোলনের ঝড়ও ওঠে। সে সময় এসব তোয়াক্কা না করেই আইন পাশ করিয়ে নেন মোদি- শাহ৷ যে কোনও কারণেই হোক, এই আইন এখনও লাগু হয়নি দেশে৷ হয়তো এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বহর দেখে সাময়িকভাবে হলেও পিছু হটেছে মোদি সরকার৷ তবে রাজ্য সফরে এসে অমিত শাহ 'ভাঙবে তবু মচকাবেনা' নীতি অনুসারে সাফাই দিয়েছেন অন্য ভাবে৷ বলেছেন, "দেশ করোনা থেকে মুক্তি পাওয়ার পরেই এই আইন বলবৎ করতে উদ্যোগ নেবে কেন্দ্র।” আর এর পরেই আপত্তিকর শাহি-হুমকি, "করোনার দাপট কমলেই এই আইন লাগু হবে৷ মমতাদিদি, আপনি কিছুই করতে পারবেন না। কান খুলে শুনে রাখুন, সিএএ লাগু হবেই। কেউ আটকাতে পারবে না।"

এ কেমন ভাষা ? দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একজন মুখ্যমন্ত্রীকে এমন হুমকি, হুঁশিয়ারি দিতে পারেন ? সৌজন্য বলে কোনো শব্দ কি অভিধানে নেই! একজন মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রকাশ্য আচরণ কি এমন ধমকচমকের হতে পারে!

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে গত দু-তিন বছর ধরে সমানে রাজনীতি করে চলেছে বিজেপি তথা কেন্দ্র৷ বিজেপি'র অভ্যন্তরেও কিন্তু এই আইন নিয়ে আপত্তি রয়েছে৷ সিএএ নিয়ে কেন্দ্রের অহেতুক জেদ ব্যুমেরাং হয়ে ফিরেছে বিজেপির দিকেই৷ বোঝাই যাচ্ছে,সে সব সামাল দিতেই বাংলায় এসে ফের সিএএ প্রসঙ্গ তুলেছেন শাহ। সিএএ কার্যকর হবেই বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন৷

শাহি-বচনে এটাও ধরা পড়েছে, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও এই আইনকেই হাতিয়ার করে মানুষকে ভুল বোঝাতে নামবে গেরুয়া শিবির৷ কিন্তু সে তো পুরোপুরি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিষয়৷ প্রশ্ন অন্য, ওই আইন চালু করা নিয়ে একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কীভাবে বলেন, "মমতাদিদি, আপনি কিছুই করতে পারবেন না। কান খুলে শুনে রাখুন, সিএএ লাগু হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না।" রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং শাসক দলের প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, "তৃণমূলের লোকেরা কান খুলে শুনে নিন, সিএএ বাস্তব ছিল, আছে এবং থাকবে। মমতা দিদি, আপনি কিছুই করতে পারবেন না।"

সিএএ চালু করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে প্রশাসনিক পদ্ধতি মেনে কেন্দ্র তা করতেই পারে৷ বিরোধীদের আপত্তি থাকলে গণতান্ত্রিক পথে তারা প্রতিবাদও করতে পারে৷ কিন্তু বিষয়টিকে যেন ব্যক্তিগত শত্রুতার পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে এ কোন ভাষায় কথা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? এটাই কি শাহি-সহবত ? 'কিছুই করতে পারবেন না', 'কান খুলে শুনে রাখুন', 'কেউ আটকাতে পারবে না', এমন ভাষাতেই তো এলাকার গুণ্ডা- মস্তানরা হুমকি দেয়! দলীয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে, কর্মীদের উৎসাহ দিতে এমন কথা বলার দরকার থাকলে, তা তো পরিশীলিত ভাষাতেও বলতে পারতেন শাহ৷ তা না করে কার্যত দেখে নেওয়ার হুমকি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে, হালের রাজনীতি কি এতটাই তলিয়ে গিয়েছে ?

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে অমিত শাহ বাংলায় এসে গরম গরম হুমকি দিয়ে গেলেও, তা স্রেফ কথার কথা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ৷ লোকসভা ভোটের মুখে এই আইন দেশবাসীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যে চরম ঝুঁকির, তা বিজেপি নেতৃত্বের না বোঝার কথা নয়৷ কেন্দ্র সিএএ কার্যকর করতে গেলেই যে বিরোধীরা ফের একেবারে হাতে গরম অ্যাজেণ্ডা নিয়ে এর বিরুদ্ধে হই হই করে মাঠে নেমে পড়বে, তা সবার জানা।

কিন্তু রাজনীতি বড় বালাই, পাবলিককে গ্যাস খাওয়াতেই হয়৷ তাই বোধহয় ঢাল হিসেবে করোনা অতিমারিকে ব্যবহার করে মুখরক্ষার চেষ্টা করেছেন অমিত শাহ৷ বলেছেন, দেশ করোনা- মুক্ত হলেই সিএএ লাগু হবে৷ ওদিকে বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট অভিমত, দেশ থেকে কখনই নির্মূল, নিশ্চিহ্ন হবে না করোনা৷ কোভিড- ১৯ কে সঙ্গে নিয়েই বাঁচতে হবে। ভ্যারিয়েন্ট বদলাতে থাকবে। ওদিকে দেশে করোনার দাপট বাড়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের এই অভিমত বিজেপির শীর্ষস্তর বা শাহ জানেন না, তা হতেই পারেনা৷ শাহ জানেন, করোনা যথারীতি থাকছে। দেশ করোনা-মুক্ত হবেনা৷ ফলে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনও কার্যকর করার প্রশ্ন উঠছে না৷ কিন্তু দলীয় নেতা-কর্মী তথা সাধারণ মানুষকে তো বোকা বানাতেই হবে৷ এটাই তো রাজনীতি, এটাই শীর্ষনেতার কাজ৷ বাংলা সফরে এসে, ক্যালকুলেটিভ পথে ঠিক সেই কাজটাই করে গেলেন অমিত শাহ৷

শাহের বাধ্যকতা রয়েছে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার। জনতার একাংশকে ধরে রাখতে হবে৷ সে কাজ স্বছন্দে করতেই পারেন উনি৷ মানুষ বোকা নয়, সবই বুঝতে পারে, ধরতে পারে৷ কিন্তু হুমকি দিতে গিয়ে এতখানি অসংযমী ভাষা ব্যবহার না করলেও তো পারতেন৷ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে এ ধরনের ভাষা কি মানানসই ?

লিখেছেন
Kanad Dasgupta
Kanad Dasgupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।