জীবনযাপনে ছোট্ট বদল, আমার আপনার থেকে অনেক বেশিদিন বাঁচেন জাপানিরা

সুস্থ শরীরে বেশিদিন পর্যন্ত বাঁচতে কে না চায়!  তথ্য বলছে ভারতীয়দের গড় আয়ু ৭০.৮ বছর এবং সুস্থভাবে একজন ভারতীয় মাত্র ৬০ বছর অবধিই বাঁচেন। তবে জীবনকে আরও একটু বেশি করে পেতে হলে পথ দেখাতে পারে জাপানিদের জীবন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, জি -৭ এর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলির মধ্যে জাপানের মানুষদের গড় আয়ু সবচেয়ে বেশি। টোকিয়োর শাইচির সুগানে অব দ্য সেন্টার ফর হেলথ এর রিপোর্টে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, জাপানিদের মধ্যে হৃদরোগ ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা অনেকটাই কম। আর তাতেই নাকি গড় আয়ু বেড়ে গেছে জাপানিদের। নেচার পত্রিকা এবং ইউরোপের জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন নামক পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে এই রিপোর্ট।

যে ম্যাজিকে দীর্ঘায়ু জাপানিরা

গবেষকদের মতে, জাপানিদের খাদ্যাভাসই তাঁদের মধ্যে হৃদরোগ ও ক্যানসারের সম্ভাবনা হ্রাস করেছে। তাঁদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় মাছ, এন - থ্রি পলিস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, শাকসবজি, সোয়াবিন, চিনি ছাড়া গ্রিন টি - এর মত খাবারগুলি জাপানিদের সঠিক ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাঁঠার মাংস, স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাবারগুলি দেহের ওজন বৃদ্ধি করে ফলে  ক্যানসার ও হৃদরোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। কিন্তু জাপানিরা এই ধরণের খাবার এড়িয়ে চলায় তাঁরা বেশিদিন পর্যন্ত সুস্থভাবে বেঁচে থাকেন। ওয়ার্ল্ড হেলথ স্ট্যাটিসটিক্স- এর মতে বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু ৭৩.৩ বছর। সেখানে শুনলে অবাক হবেন, জাপানিদের গড় আয়ু ৮৫ বছর। তবে গবেষকরা বলছেন শুধু খাদ্যাভ্যাস নয় জীবনযাত্রা ও চিন্তাভাবনাও নাকি জাপানিদের গড় আয়ু বৃদ্ধির জন্য দায়ী। তাই তাঁদের জীবনযাত্রার খুঁটিনাটি জেনে নেওয়া যাক যা সুস্থভাবে দীর্ঘদিন বাঁচতে সাহায্য করবে আমাদেরও-

ইকিগাই দর্শন

জাপানিরা ইকিগা' দর্শনে বিশ্বাসী। জীবনে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার পরিবর্তে আনন্দ ও উদ্দেশ্য অন্বেষণ করাই 'ইকিগাই' দর্শনের মূল কথা। আর জাপানিরা মনে করেন প্রাত্যাহিক জীবনে এই দর্শন অনুশীলনের মাধ্যমেই জীবনে পরিপূর্ণতা পাওয়া সম্ভব। জীবনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা জীবনবৃত্তকে সম্পূর্ণ করে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আত্মনুসন্ধন ও নিজের ক্ষমতার সাথে সমন্বয়ই জাপানিদের দীর্ঘ জীবনযাপনের পথে সাহায্য করে।

জিনেই লুকিয়ে রহস্য

জীবনদর্শন, খাদ্যাভাস ও উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা ছাড়াও জাপানিদের জিনের গঠনই  তাঁদের গড় আয়ু বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ। ডিএনএ-৫১৭৮ এবং এন্ডি- ২৩৭ মেট জিনোটাইপ দুটি অনেক জাপানিদের শরীরে পাওয়া গেছে।এই ধরণের জিনগুলি টাইপ টু ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এবং নার্ভের সমস্যার মত বয়সজনিত রোগগুলির সম্ভবনা কমিয়ে দেয়। যার ফলে জাপানিদের জীবনকাল দীর্ঘ হয় বলে মনে করা হয়।

আরও পড়ুন-ট্যুইটারও কি ডানপন্থীদের দিকেই ঝুঁকে?

হাঁটার অভ্যাস

বিশ্বে উন্নত মানের গাড়ি ও মোটরবাইক উৎপাদনকারী দেশগুলির মধ্যে অন্যতম জাপান। কিন্তু আপনি কি জানেন জাপানিরা গাড়ি চড়তে একেবারেই পছন্দ করেন না?  হ্যাঁ,প্রযুক্তিগত বিষয়ে জাপান উন্নত হলেও জাপানিরা আজও হেঁটে যাতায়াত করতেই পছন্দ করেন। ট্রেন বা মেট্রো নয়, বহু মানুষই অফিসে যান পায়ে হেঁটে ।

৮০% খাবার গ্রহণ

'হারা হাচ বান মি' অর্থাৎ জাপানিরা মনে করে খাবার খাওয়ার সময় সম্পূর্ণ পেট ভরে না খেয়ে ৮০ শতাংশ খাবার খাওয়া উচিত। তাঁদের ধারণা শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি গ্রহণের পর মস্তিষ্ক থেকে সংকেত আসতে অন্তত ২০ মিনিট সময় লাগে। ফলে সেই সময়ে অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ করা শরীরের জন্য ঠিক নয়। জাপানিরা অনেকটা বেশি সময় ধরে অল্প পরিমাণে খাবার খায়।

পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা

জাপানে উন্নত মানের চিকিৎসা পরিষেবার ব্যবস্থা রয়েছে দেশের নাগরিকদের জন্য। প্রচার অভিযান চালিয়ে তাঁদের সুস্থ জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতন করা হয়। ১৯৫০ ও ১৯৬০ এর সময়ে জাপান জনস্বাস্থ্য খাতে যে পরিমাণে অর্থ ব্যয় করেছেন তাঁর ফলেই বৃদ্ধি পেয়েছে জাপানিদের গড় আয়ু। এমনই দাবি করা হয়েছে ল্যানসেটের একটি গবেষণাপত্রে।

খাদ্যাভ্যাসের নিয়মকানুন

জাপানে মানুষ চেয়ার টেবিল নয় বরং বাড়ির মেঝেতে বসে খাবার খায়। পাশাপাশি এঁরা চপস্টিক ব্যবহার করেন ফলে খাওয়ায় খেতেও বেশি সময় লাগে। এছাড়াও জাপানিদের খাদ্যতালিকায় মৌসুমী শাকসবজি ও ফলমূল, ওমেগা সমৃদ্ধ মাছ, চাল, গোটা শস্য, টোফু এবং সবুজ শাকসবজির মত চর্বিহীন ও সুষম খাবার রয়েছে। ফলে তাঁদের মধ্যে ওজন বৃদ্ধির সমস্যার পরিমাণও কম।

চা পানের অভ্যাস

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এই পানীয় জাপানিদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। গ্রিন টি ক্যানসারের সম্ভাবনা হ্রাস করার পাশাপশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিউরোনের স্বাস্থ্য বজায় রাখে।ফলে বয়সজনিত রোগগুলির সাথে লড়াই করা সহজ হয়ে যায়।

 বৃদ্ধদের যথাযথ যত্ন

পরিবারের বয়স্ক মানুষদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে জাপানিরা তাঁদের যথাযথভাবে যত্ন করেন। পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটান বাড়ির বৃদ্ধরা। নাতি নাতনিদের সাথে সময় কাটানোর ফলে তাঁরা ছোটদের মধ্যে জাপানি সংস্কৃতির বীজ বপন করতে সক্ষম হন এবং নিরাপত্তারও অভাব বোধ করেন না । ফলে দীর্ঘ সময় বেচেঁ থাকেন জীবনে।

More Articles

;