এই বিশ্বকাপটা মেসির চাই-ই, কিন্তু...
World Cup 2022: হেরে বিশ্বকাপ শুরু করেছেন মেসি। করেছেন মারাদোনাও। এখন দেখার বিষয় এই দলের শেষ পরিণতি কী হয়।

ঘটনা ঘটার আগেই অঘটন ঘটে গেল। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হেরে গেল মেসির আর্জেন্টিনা। কোন আর্জেন্টিনা? গতবারের কোপা আমেরিকা জেতা আর্জেন্টিনা। কোন আর্জেন্টিনা? টানা ৩৬টা ম্যাচ অপরাজিত থাকা আর্জেন্টিনা। কোন আর্জেন্টিনা? মেসির আর্জেন্টিনা। এই ‘মেসি’-র আর্জেন্টিনাই কাল হয়ে দাঁড়াল আজকের আর্জেন্টিনার জন্য। এই নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই যে, এই প্রজন্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় লিওনেল মেসি। তাঁর মতো খেলোয়াড় নির্বিকল্প। তবে ফুটবল একটি দলগত খেলা। মেসির ব্যক্তিগত ক্যারিশমা যতই থাক না কেন, আজকে তা ফিকে করে দিল ৫১তম স্থানে থাকা একটি দল। আমরা সকলেই জানি, এই বিশ্বকাপ মেসির শেষ বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা আশায় বুক বাঁধছেন বিশ্বকাপ নিয়ে কেরিয়ার শেষ করবেন মেসি। কিন্তু সেই অভিযানের শুরুতেই বিরাট বড় ধাক্কা।
সৌদি আরব দ্বিতীয়ার্ধে দেখিয়ে দিল, কীভাবে কামব্যাক করতে হয়। প্রথমার্ধে মেসি নিঃসন্দেহে মেসিসুলভ খেলাটা খেলেছেন। বেশ কয়েকটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়েছে। মুহুর্মুহু আক্রমণ উঠে এসেছে সৌদির গোলে। একটা বেশ পজিটিভ আর্জেন্টিনা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে যেই সৌদি আরব পাল্টা আক্রমণ করে একটা গোল তুলে নিল, খেই হারিয়ে ফেলল আর্জেন্টিনা। ফলস্বরূপ ৫ মিনিটের ব্যবধানে দ্বিতীয় গোল তুলে নিল সৌদি আরব। মেসিকে কড়া মার্কিংয়ে রেখে কার্যত আর্জেন্টিনাকে বোতলবন্দি করে দিল সৌদি। চূড়ান্ত ব্যর্থ ডি'মারিয়া, লাউতারো মার্তিনেজরা। ট্যাগলিফিকো, রড্রিগো ডি'পল-রা যে ধরনের শট মেরেছেন তা মোটেই কোনও বিশ্বমানের দলের থেকে কাঙ্ক্ষিত নয়। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডারদের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখা গিয়েছে মেসিকেন্দ্রিক আক্রমণ গড়ে তোলার। মেসি-ও সুযোগ পেয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সৌদির ডিফেন্সের কাছে তিনিও হার মেনেছেন। মেসিকে আটকে দেওয়ায় আটকে গেছে আর্জেন্টিনার আক্রমণ। সেই ডিফেন্স-চেরা পাসগুলি উধাও দ্বিতীয়ার্ধে। সময় যত এগিয়েছে, চাপ তত বেড়েছে, আর আর্জেন্টিনা ততই ব্যাকফুটে গেছে। ফলস্বরূপ এই পরিণাম।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Argentina vs Saudi Arabia: বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই অপেক্ষাকৃত অনেক সহজ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হারতে হলো লাতিন আমেরিকান পাওয়ারহাউজ আর্জেন্টিনাকে।
গত বিশ্বকাপে অনেকেই বলেছিলেন, মেসি ক্লাবের যতটা, দেশের ততটা নন। কিন্তু বিগত চার বছরে সকলকে ভুল প্রমাণ করেছেন মেসি। আন্তর্জাতিক স্তরে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে নিজের জাত নিয়েছেন তিনি। মেসির ওপর বরাবরই একটি আরোপ লাগানো হত, যে তিনি কোনও আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতেননি দেশের হয়ে। গতবার কোপা আমেরিকা জিতে নিন্দুকদের চুপ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপের আগে কার্যত অশ্বমেধের ঘোড়া ছিল। সেই পাহাড় প্রমাণ চাপ মাথায় নিয়েই কি বিশ্বকাপে নেমেছিল আর্জেন্টিনা, নেমেছিলেন মেসি? উত্তর মেসিই জানেন, তবে উত্তর যাইই হোক না কেন, দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কেউ আশা করেনি যে, সৌদি আরবের কাছে হেরে যাবে আর্জেন্টিনা। বলা ভালো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি নিজেরাও ভাবতে পারেনি, তারা আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দেবে। কিন্তু হলো তাই। এক্ষেত্রে অনেকেরই মনে আশঙ্কার মেঘ দেখা দিচ্ছে, তাহলে কি এভাবেই শেষ হবে মেসির জার্নি?
সম্পূর্ণ বিশ্বকাপ সম্বন্ধে ভবিষ্যৎবাণী করার জন্য এখনও অনেকটা সময় বাকি যদিও। আর্জেন্টিনার পরবর্তী দু'টি ম্যাচ মেক্সিকো এবং পোল্যান্ডের সঙ্গে। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী, তবে আর্জেন্টিনা এর আগেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়েছে। তবে যে কোনও খেলাই অনিশ্চয়তায় ভরা। এটিকে আমরা একটি অঘটন হিসেবে দেখতেই পারি। ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনা ফাইনাল খেলেছিল। ২০১৮ সালে গ্রুপ পর্বে প্রথমে আইসল্যান্ডের কাছে আটকে যায়, তারপর ক্রোয়েশিয়ার কাছে লজ্জাজনকভাবে হেরে যায়। শেষ পর্যন্ত নাইজেরিয়ার সঙ্গে জিতে কোনওক্রমে শেষ ষোলোয় পৌঁছেছিল তারা। এখানে ফ্রান্সের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে হেরে যায় মেসিবাহিনী। এক্ষেত্রে জানিয়ে রাখি, এর আগেও একাধিকবার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে হেরে শুরু করেছে আর্জেন্টিনা। তার মধ্যে একবার তারা উঠেছে ফাইনালেও। ১৯৩০ ও ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ হেরেই টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল আর্জেন্টাইনরা। ১৯৩৪ সালে অবশ্য টুর্নামেন্ট শুরু হতেই শেষ হয়ে যায় আর্জেন্টিনার জন্য। সেবার ৩-২ ফলে সুইৎজারল্যান্ডের কাছে হারে তারা। কিন্তু সেবার টুর্নামেন্ট নক-আউট ফরম্যাটে হওয়ায় প্রথম ম্যাচ থেকেই দেশে ফিরে আসতে হয় তাদের। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় ১৯৫৮ সালে। তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে তিন গোল খেয়ে বিশ্বকাপ শুরু করে আর্জেন্টিনা। ১৯৭৪ সালে পোল্যান্ড ও ১৯৮২ সালে বেলজিয়ামের কাছে ম্যাচ হেরে বিশ্বকাপ শুরু করতে হয়েছিল মারাদোনার দেশকে। এরপর ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ নিয়ে দেশে ফেরে আর্জেন্টিনা। কিন্তু ১৯৯০ সালে, অর্থাৎ পরের বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের কাছে এক গোলে হেরে নিজেদের বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু করে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। তবে সেবার একের পর এক ম্যাচ জিতে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে যায় মারাদোনার আর্জেন্টিনা। যদিও ফাইনালে লোথার ম্যাথিয়াস-যুর্গেন ক্লিন্সম্যানের জার্মানির কাছে হেরে যেতে হয় তাদের।
হেরে বিশ্বকাপ শুরু করেছেন মেসি। করেছেন মারাদোনাও। এখন দেখার বিষয় এই দলের শেষ পরিণতি কী হয়। শেষ পর্যন্ত কি ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরতে পারবেন মেসি? নাকি অতৃপ্ত থেকেই কেরিয়ার শেষ করতে হবে মর্ডান ডে ফুটবল গড-কে।







