ভালবাসার মানুষের প্রতি বিশ্বাস নেই, কেন প্রেমের সম্পর্কে থাকতে চান না কিছু মানুষ?

টুরু লাব… এই শব্দের সঙ্গে, বা আরও খোলসা করে যদি বলা যায়, এই 'খিল্লি'-র সঙ্গে আমাদের জেনারেশন সবচেয়ে বেশি পরিচিত। তার মানে আপনি আগের জেনারেশন হলেও খুব পিছিয়ে আছেন এটা ভাববেন না, এটিকে একটি আধুনিক মজার কোট হিসেবে ধরা যেতে পারে, যার মানে হল সত্যি ভালবাসা; আসলে যেটা আমরা চাই, আসলে যেটাকে চাইলেও আমরা জাস্ট পাত্তা না দিয়ে থাকতে পারি না, আসলে যেটাকে আমি-আপনি-আমরা সকলেই খুঁজছি পরশপাথরের মতো। কিন্তু কেন এই চাওয়া? কেন এত ব্যঙ্গ করলেও এড়িয়ে যেতে পারি না ভালবাসাকে? আসুন অল্প গভীরে ঢুকি এই প্রশ্নের, আর একটু অতীত ঘুরে আসি।‌

 

কিচ্ছু চাইনি আমি আজীবন ভালবাসা ছাড়া, অনির্বাণ এই গান যখন গাইলেন, সালটা তখন ২০১৮, যখন এই গানের লাইন আমাদের সকলের মনের গভীরে গিয়ে ধাক্কা দিল, আমরা সকলেই রিলেট করে ফেললাম এই লাইনের সঙ্গে। তবে মনোবিদ্যায় একটু অন্যরকম ব্যাখ্যা আছে ভালবাসার, যা নিয়ে অনেকেই সচেতন নন, যদিও এই নিয়ে আগ্রহ অনেকেরই বিস্তর।

 

থিওরি বা এক্সপেরিমেন্ট- এই শব্দগুলোকে আমরা অনেকেই খুব জটিল করে ভেবে ফেলি অনেক সময়‌। কিন্তু কোনও বিষয়ে যদি আমায় সার্বিক সত্যে পৌঁছতে হয়, তখন এই থিওরি বা এক্সপেরিমেন্টের মধ্য দিয়ে গেলে ব্যাখ্যা করতে সুবিধে হয়। তাই প্রথমেই একটি এক্সপেরিমেন্টের গল্প দিয়ে শুরু করব। হারলো নামে একজন মনোবিজ্ঞানী ছিলেন। যেহেতু যে কোনও এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ হয় পশুরাই, তাঁর এক্সপেরিমেন্টের ক্ষেত্রেও তাই হলো। একটি ছোট্ট বাঁদরছানাকে তার জন্মানোর ৬ ঘণ্টা পর তার মায়ের থেকে তাকে আলাদা করে দেওয়া হয়। খুবই নিষ্ঠুর এই এক্সপেরিমেন্ট। কিন্তু এর থেকেই প্রথম বোঝা যায় attachment বা সংযুক্তি। দুটো খাঁচা রাখা হয়। একটিতে তারজড়ানো একটি পুতুল এবং ফিডিং বোতল মানে খাবার। আরেকটিতে কাপড় জড়ানো একটি পুতুল। বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, বাঁদরছানাটি কাপড় জড়ানো পুতুলের কাছেই বেশি সময় কাটাচ্ছে। পাশের খাঁচায় যাচ্ছে শুধু খাবার খেতে। মূলত এর থেকে যা বোঝা যাচ্ছে, তা হলো, সে চাইছে contact comfort, উষ্ণতা বা সাহচর্য‌। তার গুরুত্ব খাবারের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে‌। আসলে এমনটাই ঘটে যাচ্ছে আমাদের জীবনেও। ভালবাসা, প্রেম, রোমান্টিকতা এসবের মধ্য দিয়ে আমরাও খুঁজছি contact comfort, যা আমরা ছোটবেলায় পেয়েছি আমাদের কেয়ারগিভারের থেকে‌। যার বেশিরভাগ ভূমিকা আমাদের মা-ই পালন করেছেন। সেই attachment-ই বড় হয়ে আমরা খুঁজেছি আমাদের ভালবাসায়‌। এ-বিষয়ে বলে রাখা ভালো, attachment বিভিন্ন রকমের হয়। প্রতিটা মানুষের attachment style বা সংযুক্তির ধরন আলাদা, সেই জন্য তাদের ভালবাসার বৈচিত্র্যও আলাদা। বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় attachment-এর ক্ষেত্রে। যেমন, নৈকট্য, নিরাপত্তা এবং কখনও বিচ্ছেদের ভয়। এগুলো সবই ছোটবেলায় কেয়ারগিভারের (বেশিরভাগের ক্ষেত্রে মা বা আসলে শিশু যার কাছে বড় হচ্ছে) সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। এবং এই সম্পর্কই হচ্ছে শিশুর বড় হয়ে যাওয়ার পর তার ভালবাসার ভিত।

 

আরও পড়ুন: একই মানুষের বহু যৌনসম্পর্কে আগ্রহ, কেন এমন হয়!


মূলত ৪ ধরনের attachment style আমরা দেখতে পাই।

 

সিকিউর অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল

 

ঠিক যেমনটা হওয়া উচিত, এই স্টাইল হচ্ছে একদম সেরকমই। এই ধরনের বাচ্চারা বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে কষ্ট পায়। তবে ফিরে এলে আনন্দও পায় এবং সাদরে তাদের গ্রহণ করে। মানে বিশেষ অভিমান, ‘তুমি আমায় বুঝলে না, আমায় ছেড়ে কীভাবে চলে গেলে' টাইপে এরা পড়ে না। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের শিশুরা বড় হয়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুবই বিশ্বস্ত এবং যত্নশীল হয়। দূরত্ব তৈরি হলেও অন্য মানুষের অসুবিধা বোঝার চেষ্টা করে, এরা এদের ভালবাসার মানুষের সঙ্গে দুঃখ-কষ্ট-আনন্দ ভাগ করে নিতে পারে। এদের আত্মবিশ্বাসও বেশ জোরালো হয় এবং এদের ক্ষেত্রে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ীও হয়।

তাই এরা আছেন ‘সেফ জোন’-এ, মানে এদের নিয়ে তেমন কোনও অসুবিধায় পড়তে হয় না।

 

ইনসিকিউর অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল


সমস্যা তৈরি হয় এই ধরনের স্টাইলের ক্ষেত্রে। এই ধরনের স্টাইলে ৩টি ভাগ থাকে।

প্রথমে আসি অ্যাম্বিভ‍্যালেন্ট অ্যাটাচমেন্টের প্রসঙ্গে। ছোটবেলায় এই ধরনের বাচ্চারা বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে খুবই উদ্বেগপ্রবণ হয়ে ওঠে এবং তারা ফিরে আসার পরেও কোনওভাবেই তাদের গ্রহণ করতে পারে না। এরা অচেনা মানুষদের নিয়ে ভীষণভাবেই সতর্ক থাকে। এরা বড় হওয়ার পর সম্পর্কে জড়াতে ভয় পায়, মনে করে যে তাদের ভালবাসার মানুষ তাদেরকে ভালবাসা ফেরত দেবে না। সেই থেকে বিচ্ছেদও হয় অনেক বেশি, কারণ এই ক্ষেত্রে সম্পর্ক প্রচণ্ড শীতল এবং বেশ দূরত্বও থাকে সম্পর্কে। সম্পর্ক শেষে এদের ভেঙে পড়াও প্রবল। এই ধরনের মানুষরা অন্যদের তুলনায় বারবার আশ্বস্ত হতে চায় এবং নিজেদের সম্পর্কে বৈধতা চায়।

 

অ্যাভয়ডেন্ট অ্যাটাচমেন্ট স্টাইলের ক্ষেত্রে বাবা-মা বা কাছের মানুষ, যার কাছে শিশু বড় হচ্ছে, তাদের অনুপস্থিতির পর তারা তাদের কাছে ফিরে যাওয়ার বিশেষ টান বোধ করে না। বড় হওয়ার পর সামাজিকতা বা রোম্যান্টিক সম্পর্কে বেশ সমস্যা দেখা দেয় কারণ আবেগের প্রকাশ বা ধরন খুবই সীমিত। নিজস্ব ভাবনা, চিন্তা বা আবেগের প্রকাশে এরা অক্ষম হয়ে থাকে। পার্টনারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাতেও এদের বেশ সমস্যা দেখা যায়, ক্যাসুয়াল সেক্স এদের কাছে অসুবিধাজনক নয়। 'ক্যাসুয়াল সেক্স' কথাটিকে যদিও আমরা বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই ধরব সংস্কারকে দূরে সরিয়ে রেখে।

 

যখন বাবা-মা দীর্ঘদিন ধরে তাদের সন্তানের সঙ্গে মানসিক দূরত্বে থাকেন, বা বাচ্চা যদি দীর্ঘদিন ধরে তাদের সমস্যার কথা বাবা-মাকে কমিউনিকেট না করতে পারে, তখন এই ধরনের স্টাইল গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে, নিজেদের অজান্তেই। যার প্রভাব পড়ে বয়স হলে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সময়। এরা কেয়ারগিভারকে চায়, আবার তাদের উপস্থিতি তাদের মধ্যে ভয়েরও জন্ম দেয়। ঠিক এই অনুভূতি প্রেমিক বা প্রেমিকাকে নিয়েও তৈরি হয়। কাছে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে, তার সঙ্গে প্রত্যাখ‍্যাত হওয়ার চূড়ান্ত ভয়। গভীরে থেকে যাওয়া লজ্জাবোধ, নিজের সম্পর্কে গড়ে ওঠা নেতিবাচক প্রতিচ্ছবি- এই সমস্তকিছুর প্রভাব পড়ে নিজের ওপর এবং সম্পর্কেও।

 

এবার বলি এই নিয়ে কেন এত কথা বললাম। মানুষ আসলে নানা রকমের, যা আমরা জানি প্রত্যেকেই, কিন্তু যা জানি না বা বুঝি না, তা হলো তাদের ভালবাসার মধ্যে নানা রঙ আছে।। কিন্তু যে বেরংগুলো প্রকট এবং বীভৎস- সেখানে আমরা মানুষটাকে আসলে জাজ করে ফেলি। যেমন ইনসিকিউর অ্যাটাচমেন্টের নানা স্টাইল। আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় সেই মানুষটাকে, যেহেতু তারা তথাকথিত যে মডেল, সেখানে ফিট করছে না। আমরা ধরেই নিই যে, কারও প্রেম হলে তার স্টাইল হবে সিকিউর। আমার নিজের ক্ষেত্রেও যে ইনসিকিউর স্টাইল আছে তা নিয়ে আমি নিজেও সচেতন নই। তাই অসহায়তার জায়গা বুঝি না, নিজের ঘটিয়ে ফেলা ঘটনার ওপর নিজেরই কন্ট্রোল থাকে না, এতটাই অসহায়। কিন্ত কেন? ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনায়? আমার বেড়ে ওঠার কোনখানে, কোন গলদের জন্য আজ আমি এইরকম হয়ে গেলাম? কেন যাকে ভালবাসি, তার সংস্পর্শে এত অসুবিধা? আমি কোন স্টাইলে পড়ি, এ-বিষয়ে সচেতন হলে আমার নিজেকে বা আমার প্রেমিককে বা আমার কোনও এক বন্ধুকে আমি হয়তো সাহায্যের একধাপ এগিয়ে দিতে পারব। বিশদে জানতে পারব গুগল থেকে। এবং অবশ্যই এর সমাধানের দিকে এগতে পারব। যা আসলে সত্যিই সম্ভব বিভিন্ন উপায়ে। সাইকোথেরাপির কথা আমরা জানি অনেকেই, কিন্তু সাহস করে গিয়ে উঠতে পারি না। তবে এই ধরনের সমস্যা নিরাময় করার জন্য সাইকোথেরাপির দ্বারস্থ হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ আমার নিজের তৈরি করা অনেক ভাবনা, অনেক ধারণা, যা আমি পুষে রাখি, সেগুলোর জট ছাড়াতে সক্ষম একজন অভিজ্ঞ মানুষই। তবে একথাও ঠিক, সবকিছু জানলেও সচেতনতা থাকলেও হয়ে ওঠা ওঠে না আমাদের কারও। শারীরিক সমস্যায় আমরা কমবয়সিরা যেভাবে জর্জরিত মানসিক সমস্যা নিয়ে, তার ডাক্তারের কাছে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই বিলাসিতা। তাই উপায় হল বন্ধু বা মনের মানুষের সঙ্গে দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নেওয়া। এই বিষয়ে একটু বলে রাখি, কাউকে মনের কথা বললে মন হালকা হয়, সেকথা একদম সত্যি। কিন্তু কাকে বলছি, সেটাও কিন্তু বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং সে কি ভাবনা তৈরি করছে, সেটাও একটু বিবেচনা করা জরুরি। কারণ এঈ ধরনের বিষয় নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম।

কিন্তু এছাড়াও যে হাতে গরম উপায় আছে তা হল ইউটিউব । মানসিক সমস্যার বিভিন্ন দিকের সমস্যার সমাধানের উপায় নিয়ে মনোবিদরা আলোচনা করে থাকেন। যেখানে মনোবিদ কীভাবে আমার প্রেমে টিপস দেওয়া বন্ধুর চেয়ে কিঞ্চিত আলাদা, সে-বিষয়ে স্বচ্ছতাও তৈরি হয়। কাজেই নিজের অসুবিধা বুঝে ইউটিউবে টাইপ করা যেতেই পারে। কারণ একথা মানতেই হবে, যতই আমরা আমাদের সমস্যার কথা বলি, ইউটিউব কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে এই হতাশায় ভরে যাওয়া জীবনে সমস্যার ভার অনেক কমিয়ে দিয়েছে। তাই এই স্মার্ট টেকনিকটা প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়া যেতেই পারে। তবে এখানেও মনে রাখব, যার কথা শুনছি, তিনি যেন অভিজ্ঞ হন, বিষয়চর্চার সঙ্গে তিনি যেন যুক্ত থাকেন। এখন বাকি রইল ‘আমার আমি’। এই যে পাঠক পড়ছেন এই লেখা, চিনছেন নিজেকে নতুন করে, হয়তো রিলেট করছেন নিজের সাথে বা কোনও প্রিয়জনের সঙ্গে, এর পরের পদক্ষেপে আপনি হয়তো আবিষ্কার করতে পারেন নিজেকে বা হয়তো এরকম কোনও সমস্যায় জড়িয়ে থাকা কোনও মানুষকে বাড়িয়ে দিতে পারেন সাহায্যের হাত।

More Articles

;