কেন বিশ্বের তাবড় ধনকুবেরদের তালিকায় নেই রতন টাটার নাম?

Sindhu Som
৩ মিনিট
কেন বিশ্বের তাবড় ধনকুবেরদের তালিকায় নেই রতন টাটার নাম?

পৃথিবীর সবথেকে ধনী ব্যক্তি কারা আমরা কীভাবে জানতে পারি? ধনসম্পদের সিংহভাগ রয়েছে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে। এদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে অহরহ। কে এগোল কে পিছিয়ে গেল এই তথ্য নিয়ে ফোর্বস্‌ একটি তালিকা করে থাকে। সেই তালিকায় বর্তমানে সবার উপরে রয়েছেন এলন মাস্ক। একের পর এক কোম্পানি কিনে চলেছেন তিনি। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল সে সব খবর। তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ এখন ২৬৮ বিলিয়ন অর্থাৎ ২০ লক্ষ ৫৫ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। সন্দেহ নেই এই বিপুল পরিমাণ টাকা অনেকেরই নজর টানে। কিন্তু কেবলমাত্র টাকার ভিত্তিতে ব্যবসায়ী চেনার পন্থা কতদূর সঠিক? রতন টাটার নাম সমগ্র বিশ্ব জানে। কিন্তু সে নাম সবথেকে ধনীদের মধ্যে উঠে আসে না কেন?

টাটা গ্রুপ শুধু ভারতে নয়, পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম প্রধান ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। অথচ টাটার নাম নেই ফোর্বসের তালিকায়। এই নিয়ে কৌতূহল জাগাটাই স্বাভাবিক। এলন মাস্কের যাপন বা ক্ষমতা দেখানোর নজির আমরা সর্বত্র দেখছি। রতন টাটার জীবনের দিকে চোখ ফেরালে সে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে বাধ্য।

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের নামোল্লেখ হলে রতন টাটার প্রসঙ্গ আসবেই। ব্যক্তি রতন টাটাকে পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ব্যবসার ক্ষেত্রটিতে তাঁর অসামান্য দূরদৃষ্টিও কারোর অজানা নয়। তবে এইটুকুই কি সব? রতন টাটা জনপ্রিয় তাঁর লোকহিতৈষী ভাবমূর্তির জন্য। মানুষের কল্যাণে বহু কাজই তিনি করে থাকেন। এ বিষয়ে তিনি অনন্য।

মাস্কের মতো দেখনদারি তাঁর নেই। মানুষের জন্য চিন্তাভাবনা করেন বলেই একরকম মানুষ তাঁকে এতখানি ভালোবাসে। এই কারণেই পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী ব্যক্তি রতন টাটা হতে পারেননি। একের পর এক দেশ ও জাতির পক্ষে কল্যাণকর প্রকল্প তাঁকে এই বিশ্ববন্দিত পরিচিতি এনে দিয়েছে। খুব কম ব্যবসায়ী প্রসঙ্গেই এ কথা বলা যায়। কারণ সাধারণ মানুষের থেকে ধনী ব্যবসায়ীদের দূরত্ব অনেকখানি। মানুষ সেই দূরত্ব থেকে বিলাস বহুল জীবনের স্বপ্ন দেখলেও মানুষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তেমন একাত্ম বোধ করে না। বরং একটা অসূয়া কাজ করে। টাটার সে সব বালাই নেই। নিজের যাপন দিয়ে রতন টাটা প্রমাণ করেছেন মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ফোর্বসের তালিকায় স্থান পাওয়াটা কোনও বিষয়ই নয়। বরং মানবদরদী হলে বড়লোক হওয়ার অহংকার কাটিয়ে ওঠা যায়।

৮২ বছর বয়েস হল তাঁর। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বরাবরই শিক্ষা নিয়েছেন। শিখিয়েছেন মানুষকেও। সেই শিক্ষা যা মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে, মানবতার পাঠ। এই কারণেই ভারতের মানুষের কাছে এটখানি পরিচিতি, জনপ্রিয়তা। তা নাহলে আম্বানি, আদানির সঙ্গে এক করে ফেলা হত তাঁকে কবেই! কিন্তু ভারতের মানুষ এখনও তাঁকে একটু অন্যরকম চোখে দেখে।

দীর্ঘ ষাট বছর ধরে যিনি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য-প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন, টাটা সাম্রাজ্যের উপর এখনও যার প্রভাব-প্রতিপত্তি অক্ষুণ্ণ, আশাই করা যায় ভারতের সর্বাপেক্ষা ধনীদের তালিকায় তাঁর নাম থাকবে প্রথমের সারিতে। একেবারে প্রথমে যদি নাও হয় অন্তত প্রথম ১০ থেকে ২০র মধ্যে থাকার কথা। কিন্তু জানলে আশ্চর্য হবেন আইআইএফএল ওয়েলথ-এর ২০২১ সালে প্রকাশিত তালিকা অনুসারে রতন টাটার থেকেও ধনী এমন ভারতীয়র সংখ্যা ৪৩২ জন। এর প্রধান কারণ টাটা ট্রাস্টের মাধ্যমে মানব কল্যাণে ব্যয় করা বিশাল অঙ্কের টাকা।

গত বছরের হিসেব অনুযায়ী টাটা গ্রুপের মোট সম্পত্তি ১০৩ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার। অর্থাৎ ৭ লক্ষ ৮৯ হাজার ২২৭ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। ভারত তথা বিশ্বের বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান টাটা গ্রুপ। কিন্তু টাটা সন্স-এর আয়ের ৬৬% সরাসরি যায় জনকল্যাণ মূলক কাজের খাতে। গত দেড়শো বছরে টাটা গ্রুপ জনগণের আশু প্রয়োজনের কথা সর্বক্ষণ মাথায় রেখেছে। এই জন্যই কোম্পানির লাভে রতন টাটার ব্যক্তিগত সম্পত্তির কোনও হেরফের ঘটে না। যা লাভ হয় তার বেশিরভাগটাই চ্যারিটিতে যায়।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই টাটা পরিবার এই জনকল্যাণ মুলক কাজের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে রেখেছে। ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদি নানাবিধ উন্নতিতে রতন টাটার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টাটা গ্রুপের ব্যবসা ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। ধাতু, খনি, তথ্যপ্রযুক্তি, খুচরো ব্যবসা, গাড়ি, হাসপাতাল, রাসায়নিক, পরিবহণ ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে তাদের ব্যবসা সর্বজন বিদিত। এর অধীনে রয়েছে ২৯টি তালিকাভুক্ত সংস্থা এবং তালিকার বাইরেও রয়েছে বহু। এতকিছু থেকেও টাটারা কখনও নিজের কোম্পানির সম্পূর্ণ সম্পত্তির মালিক হননি। জামশেদজী টাটা স্বয়ং এই নিয়ম বানিয়ে গিয়েছিলেন, টাটা সন্স যা আয় করবে তার সিংহভাগ যাবে টাটা ট্রাস্টে।

জনকল্যাণ মূলক কাজ টাটা পরিবার করে চলে চলেছে বহুদিন আগে থেকেই। রতন টাটা পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী ব্যক্তি নাইই হতে পারেন, তাতে তাঁর জনপ্রিয়তা এতটুকুও কমে না। বস্তুত ফোর্বসের সম্পত্তির তালিকা যে কে প্রকৃত পক্ষে মহৎ মানুষ তা নির্ণয় করতে অসমর্থ, টাটার জীবনই তার প্রমাণ।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।