পঞ্চাশ বছর আগে হারিয়েছিলেন পরিবার, আর এক গণঅভ্যুত্থানে দেশ হারালেন মুজিব-কন্যারা

Sheikh Hasina: সোমবার দুপুরে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন শেখ হাসিনা। সঙ্গে রইলেন তাঁর সেই চিরন্তন সঙ্গী শেখ রেহানা।

Sohini Das
৩ মিনিট
পঞ্চাশ বছর আগে হারিয়েছিলেন পরিবার, আর এক গণঅভ্যুত্থানে দেশ হারালেন মুজিব-কন্যারা

প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে একই রকম ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন শেখ মুজিবর রহমান ও তাঁর পরিবার। তখন শেখ হাসিনা বোন রেহানার সঙ্গে জার্মানিতে। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট গণঅভ্যুত্থান হল বাংলাদেশে, যার নেতৃত্ব দিয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কয়েকজন নিম্নপদস্থ কর্তা। পদচ্যুত করা হল শেখ মুজিবুরকে। শুধু পদচ্যুতই করা হল না, সপরিবারে খুন পর্যন্ত করা হল তাঁকে। একই সঙ্গে হত্যা করা হল আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ও দেশের মন্ত্রীদেরও। এক লহমায় মা-বাবা-ভাই, গোটা পরিবারকে হারিয়ে ফেললেন দুই বোন। অথচ যখন জার্মানি যাওয়ার জন্য বিমানে চেপে রওনা দিলেন তাঁরা, তখনও বিমানবন্দরে ছাড়তে এসেছিলেন মুজিবুররা। তখনও কি ঘুনাক্ষরে ভেবেছিলেন তাঁরা, এ দেখাই শেষ দেখা। বাবা-মা-ভাইয়ের সঙ্গে আর জীবনেও দেখা হবে না দুই মুজিব-কন্যার।

শেখ মুজিবুর ও বেগম ফজিলাতুন্নেসার পাঁচ সন্তান। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় শেখ হাসিনা, তার পরেই শেখ রেহানা। সব সময়েই দিদির সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি সফরে গিয়েছেন রেহানা। আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিলেন তিনি। শেখ হাসিনার নিত্যসঙ্গী তো বটেই, ২০০৭-০৮ সালে দেশে যখন জরুরি অবস্থা জারি হয়, হাসিনাকে কারাবন্দি করা হয়, তখন হাসিনার হয়ে দলীয় সভাও করেছিলেন রেহানা। সেই শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতা ত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলেন, তখনও তাঁর সঙ্গী হয়ে রইলেন সেই রেহানাই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলাদেশ ইস্যুতে কোন পথে এগোবে ভারত? হাসিনাকে নিয়ে যা জানালেন জয়শঙ্কর

S Jaishankar on Bangladesh Crisis: বাংলাদেশ পরিস্থিতি ও শেখ হাসিনার ভারতে এসে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে দিল্লিতে এদিন সর্বদল বৈঠক করেছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

সোমবার দুপুরে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন শেখ হাসিনা। সঙ্গে রইলেন তাঁর সেই চিরন্তন সঙ্গী শেখ রেহানা। সেটা যেন ছিল রেহানার দ্বিতীয় দুর্ভাগ্যজনক উড়ান। ১৯৭৫ সালে যখন মুজিবরকে হত্যা করা হল, তখন দুই বোন জার্মানিতে। সেসময় জার্মানিতে ছিলেন হাসিনার স্বামী পদার্থবিদ এমএ ওয়াজেদ মিয়া। ওখানেই কাজ করতেন তিনি। যখন তাঁরা জার্মানির উদ্দেশে রওনা হলেন, বিমানবন্দরে তাঁদের বিদায় জানাতে এসেছিল গোটা পরিবার। তখনও কি হাসিনা-রেহানা জানতেন, বাবা মা, ভাইদের সঙ্গে আর কক্ষনও দেখা হবে না। তার পাঁচ দশক পরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল শেখ হাসিনার সঙ্গেও। তবে মুজিবের মতো করুণ পরিণতি হয়নি হাসিনার। তিনি দেশ থেকে প্রাণ হাতে করে পালাতে পেরেছেন অন্তত। হাসিনার ছেলে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ছেড়ে আসার ইচ্ছা ছিল না তাঁর। একপ্রকার জোর করেই তাঁকে সরিয়ে আনা হয় হাসিনাকে। নাহলে হয়তো তাঁদের পরিণতিও হত বাবা-মা-ভাইদের মতোই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বারবার জেগেছে বাংলাদেশ! অবাক করবে সে দেশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস

Bangladesh coups: এমনই এক অগস্টে সেনার হাতে খুন হয়েছিলেন সপরিবার শেখ মুজিবর। আর তার কন্যা শেখ হাসিনাকেও কুর্সি ছাড়তে হল গণঅভ্যুত্থানের জেরে। বাংলাদেশের মাটিতে বারবার জনগণ জেগেছে।

১৯৭৫ সালে মুজিবুর রহমান, তাঁর স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা, তাঁদের তিন ছেলে ও দুই পুত্রবধূকে ধানমান্ডির বাড়িতে হত্যা করা হয়। গণঅভ্যুত্থানের নামে মুজিব-সহ মোট ৩৬ জনকে হত্যা করেছিল সেনাবাহিনী। সে সময়ও হাসিনা তাঁর স্বামী-সন্তান ও বোন রেহানাকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতে। এবারও কপ্টার নিয়ে ভারতে উড়ে এসেছিলেন হাসিনারা। গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানবন্দরে এসে ভেড়ে তাঁদের কপ্টার। সেখান থেকে লন্ডন উড়ে যাওয়ার কথা ছিল হাসিনার। সেখানেই থাকেন হাসিনাপুত্র। তবে শেষ মুহূর্তে ব্রিটেন হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে। দীর্ঘদিনের বন্ধু হাসিনাকে ফেরায়নি ভারত। দেশের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, নয়াদিল্লিতেই রয়েছেন হাসিনা। তবে তিনি মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত। ফলে পরবর্তী পদক্ষেপ এখনই ভেবে উঠতে পারছেন না তিনি। তাঁকে সময় দেওয়ার পক্ষেই রয়েছে ভারত সরকার।

১৯৭৫ সালে মুজিবকে যখন হত্যা করা হল, তখনও বিয়ে হয়নি রেহানার। তার কয়েক বছর পর বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ শফিক আহমেদ সিদ্দিকীকে বিয়ে করেন রেহানা। লন্ডনেই বসেছিল সেই বিয়ের আসর। যেখানে অর্থাভাবে যোগ দিতে পারেননি শেখ হাসিনা। জীবন বদলেছে, সময়ও। তবে দিদির হাত ছাড়েননি রেহানা। তিন সন্তানের মা রেহানা। তাঁদের মধ্যে একজন রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক স্ট্র্যাটেজি কনসাল্টেন্ট। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের রিসার্চ শাখার ট্রাস্টিও তিনি। রেহানার কন্যা টিউলিপ সিদ্দিকি ব্রিটেনের লেবার পার্টির রাজনীতিবিদ এবং কেয়ার স্টারমার ডিসপেনসেশনে ট্রেজারি এবং সিটি মিনিস্টারের অর্থনৈতিক সচিবও বটে।

মুজিবকে যখন খুন করা হল, কাকতালীয় ভাবে হাসিনা-রেহানা তখন জার্মানিতে। নাহলে হয়তো পরিবারের বাকিদের মতোই পরিণতি হত তাঁদেরও। আর এবার যখন প্রাণ হাতে নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলেন তাঁরা, তখন দরজায় দাঁড়িয়ে উন্মত্ত বিক্ষোভকারীরা। বুঝতে পারছিলেন, ক্রমশ সময় ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন হাসিনা। কিছুতেই নিজের দেশ ছাড়বেন না তিনি। তাঁর উপদেষ্টারা বারবার তাঁকে বোঝান, যাতে প্রাণের ঝুঁকি তিনি না নেন। কিন্তু তা মানেননি হাসিনা। শেষমেশ রেহানা এসে বোঝান দিদিকে। তবে তাতেও কাজ হয়নি। শেষপর্যন্ত ছেলে সজীব ওয়াজেদের ফোন পেয়ে সিদ্ধান্ত বদলান হাসিনা। যখন দরকারি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে কপ্টারে উঠছেন তাঁরা, বিক্ষোভকারীরা তখন গুঁড়িয়ে দিচ্ছে মুজিবুরের মূর্তি। এক গনঅভ্যুত্থান কেড়েছিল পরিবার, দ্বিতীয় গণবিক্ষোভ কেড়ে নিল দেশ, জন্মভূমি। মুজিবের রক্তে ভেজা মাটিতে আর কি কখনও ফেরা হবে দুই কন্যার, তার উত্তর জানেন না এখনও কেউ-ই।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।