রবীন্দ্রনাথ-ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, ভালবাসার ৫৮ দিন

একজন ৩৪ , অন্যজন তখন ৬৩। কিন্তু তাঁদের বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বয়স। রবীন্দ্রনাথ তখন খ্যাতির মধ্যগগনে। ১৯১৩ সালের সাহিত্যে নোবেল তাঁকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। অন্যদিকে ভিক্টোরিয়া তখন ব্যাক্তিগত জীবনের নানা সমস্যায় জর্জরিত। ১৯২৪ এ পেরুর শতবর্ষ উদযাপনে প্রধান অতিথি রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু 'বিধির বাঁধন' কাটবে কে? শারীরিক অসুস্থতার জন্য থামতে হল আর্জেন্টিনায়। রবীন্দ্রনাথ বুয়েনস আইরেসে এসেছেন শুনে ছুটে এলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। ততদিনে কবির লেখার মাধ্যমে কবির সঙ্গে পরিচয় ঘটে গিয়েছে ভিক্টোরিয়ার। গীতাঞ্জলি নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হওয়ার পরই আন্দ্রে জিদ ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেন গীতাঞ্জলি। ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষতবিক্ষত ভিক্টোরিয়া গীতাঞ্জলির ভিতরে খুঁজে পান প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তি। তখন থেকেই এই ভারতীয় কবির সঙ্গে আলাপের জন্য অপেক্ষা করতেন ভিক্টোরিয়া। ১৯২৪-এ রবীন্দ্রনাথের অসুস্থতাই ভিক্টোরিয়া ও রবীন্দ্রনাথকে পরস্পরের কাছে এনে দিল। রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়ার এই সম্পর্কের সুন্দর মুহূর্তগুলির মালা গেঁথেই আর্জেন্টাইন পরিচালক পাবলো সিজার তৈরি করেছেন 'থিঙ্কিং অফ হিম' নামের একটি চলচ্চিত্র। যেখানে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ভারতীয় অভিনেতা ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ওকাম্পোর চরিত্রে অভিনয় করেছেন এলোনোরা ওয়েক্সলার।

কেমন ছিল এই অসমবয়সি বন্ধুত্ব?


সব মিলিয়ে ৫৮ দিন বুয়েনস আইরেসে ওকাম্পোর কাছে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের অসুস্থতার খবর শুনে যখন প্রথম কবির সাথে দেখা করতে এলেন ভিক্টোরিয়া তখন কবি হোটেলে। সঙ্গী লেনার্ড কে এলমহারস্ট। তাঁর প্রিয় কবিকে কিছুতেই হোটেলে থাকতে দিতে রাজি হলেন না ওকাম্পো। কবিকে নিজের কাছে রেখে যত্ন করার জন্য ভাড়া নিলেন এক সুদৃশ্য বাংলো বাড়ি। সান ইদ্রিসো শহরে প্লাতা নদীর ধারের নির্জনে অবস্থিত বাড়িটির নাম ছিল 'মিরালরিও'। এই বাড়িতেই দুজন ভিন্ন ভাষাভাষী যাবতীয় প্রতিকূলতাকে দূরে সরিয়ে হয়ে উঠেছিলেন পরস্পরের নিবিড় আশ্রয়।


ভিক্টোরিয়া নিজে ছিলেন আর্জেন্টিনার এক বিখ্যাত লেখিকা। বিখ্যাত পত্রিকা ' সুর' সম্পাদনা করতেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ পড়ে অভিভূত ওকাম্পো 'La Nacion' পত্রিকায় লিখছেন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ 'La Algeria de leer a Rabindranath Tagore' অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ পড়ার আনন্দ। এই ভিক্টোরিয়াই হয়ে উঠছেন রবীন্দ্রনাথের 'বিজয়া'। আর ভিক্টোরিয়া রবীন্দ্রনাথকে ডাকতেন 'গুরুদেব' বলে।


'মিরালরিও' বাড়িতে যখন লিখতেন রবীন্দ্রনাথ পাশে বসে থাকতেন কবির 'আদরের বিজয়া'। ভাষার পাঁচিল ডিঙিয়ে দুজনের মধ্যে চলত আলাপচারিতা। কবি জানলার ধারে বসে কবিতা লিখ্তেন। ভিক্টোরিয়া অপেক্ষা করতেন কখন কবি তাঁকে নিজে কবিতার মূল নির্যাস বুঝিয়ে দেবেন। ভিক্টোরিয়া ভাঙা ভাঙা ইংরেজি জানতেন। কবি তাঁকে লেখার পর পংক্তি ধরে ধরে ইংরেজিতে বুঝিয়ে দিতেন কবিতার অর্থ। আবার যখন কবি বাগানে হাঁটতে বেরোতেন সঙ্গে থাকতেন ভিক্টোরিয়া। এই সময়ই বুয়েনস আইরেসে বসে কবি লিখেছিলেন একাধিক প্রেমের কবিতা যা পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় ' পূরবী' নামে। দেশে ফিরে 'আদরের বিজয়াকে'ই ,'পূরবী' উৎসর্গ করেন রবীন্দ্রনাথ। চিঠিতে লিখলেন, 'বাংলা কবিতার একটি বই তোমাকে পাঠাচ্ছি যেটা তোমায় নিজের হাতে তুলে দিতে পারলে খুশি হতুম। বইখানা তোমায় উৎসর্গ করা। যদিও এর ভিতরে কী রয়েছে তা তুমি জানতে পারবে না। এই বইয়ের অনেক কবিতাই লেখা হয়েছিল সান ইদ্রিসো তে থাকার সময়'।

 

আরও পড়ুন-কৃষ্ণপ্রেমকে রাধার চোখ দিয়ে দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

 

'মিরালরিও' বাড়িটিতে যে আরাম কেদারায় বসে লিখতেন রবীন্দ্রনাথ ফেরার পথে ভিক্টোরিয়া এক প্রকার জোর করেই তাঁর প্রিয় গুরুদেবের জন্য সেই চেয়ার তুলে দিয়েছিলেন জোর করে। রবীন্দ্রনাথের বৌমা প্রতিমা দেবীর লেখা থেকে জানা যায় শান্তিনিকেতন ফিরে এসে প্রথম প্রথম ওই চেয়ারে বসতেন না রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু যত জীবনের শেষের দিনগুলোর দিকে এগিয়েছেন তত সেই চেয়ারই হয়েছে কবির আশ্রয়।


আবার চিত্রকর রবি ঠাকুরের উদ্ভাবনে ও ভূমিকা আছে ভিক্টোরিয়ার। রবীন্দ্রনাথের লেখার পাণ্ডুলিপিতে কাটাকুটিগুলিকে খুব নিবিড় ভাবে লক্ষ্য করতেন ভিক্টোরিয়া। সেখান থেকেই রবীন্দ্রনাথকে বড় ক্যানভাসে ছবি আঁকার উৎসাহ দেন ওকাম্পো। ১৯৩০ সালে প্যারিস শহরে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে আবার দেখা হয় রবীন্দ্রনাথের। নিজের কিছু ছবি নিয়ে বিদেশে গিয়েছেলেন কবি। প্যারিসের বিখ্যাত পিগ্যাল গ্যালারিতে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে দেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। সেই ছবির খ্যাতি দেখে একটি ক্যাটালগের ওপরে ভিক্টোরিয়া লিখেছিলেন, ' This exhibition is my work'।


ওকাম্পো ও রবীন্দ্রনাথের শেষ দেখা হয় ১৯৩০ এর ১১ মে প্যারিসের 'Gare Du Nord' রেল স্টেশনে। তারপরে ও চিঠির মাধ্যমে অটুট থেকেছে দুজনের বন্ধুত্ব। ১৯৩৯ এ রবীন্দ্রনাথের শারীরিক স্বাস্থ্যের কথা জেনে উদ্বিগ্ন ভিক্টোরিয়া চিঠিতে লিখছেন,

' প্রিয় রবীন্দ্রনাথ,

এ কথা সত্যি যে আমার ভালবাসা আমাকেই পীড়িত করে কখনও কখনও। কিন্তু সেটাই একমাত্র প্রমাণ যে এসব তোমার জন্য ভালো লক্ষণ নয়। কেন এত দ্রুত চলে গেলে? কেন তুমি তোমার স্বাস্থ্যের কথা ভাবো না? গুরুদেব আমায় ক্ষমা করো কিন্তু তোমায় এবার ভীষণ বকাবকি না করলে তুমি কিছুই শুনবে না'।

এই চিঠি, কবিতাই এই দুই ভিনদেশী মানুষের বন্ধুত্বকে অমরতা দিয়েছে। ১২ নভেম্বর, ১৯২৪ সান ইদ্রিসো তে বসে 'পূরবী' কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'বিজয়া' কে উদ্দেশ্য করে লিখছেন,

' হে বিদেশী ফুল, যবে আমি পুছিলাম--

" কী তোমার নাম',

হাসিয়া দুলালে মাথা, বুঝিলাম তরে

নামেতে কী হবে।

আর কিছু নয়,

হাসিতে তোমার পরিচয়।'

 

গ্রন্থ ঋণ

পূরবী , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্ব ভারতী

কবি মানসী, জগদীশ ভট্টাচার্য, ভারবি

ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ, শঙ্খ ঘোষ, দেজ পাবলিশিং

More Articles

;