অবহেলিতা নেপালি মেয়ের চিত্রনির্মাতা হয়ে ওঠার কাহিনি: প্রথম পর্ব

Anasuya Sen
৪ মিনিট
অবহেলিতা নেপালি মেয়ের চিত্রনির্মাতা হয়ে ওঠার কাহিনি: প্রথম পর্ব

ক্যামেরা হাতে তুলে নেওয়ার পরে মেয়েটির চোখ মুখে ফুটে উঠল সেই পুরোনো প্রাণোচ্ছলতার ঝিলিক | মেয়েটি বলে উঠল-"নেপালী মেয়েরা যে শৃঙ্খল ও অবদমনের মধ্যে দিনযাপন করে, তার কাহিনী আমি মানুষের সামনে তুলে ধরতে চাই | আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই |"

'আই আম বেলমায়া' এই তথ্যচিত্রটির উপজীব্য চরিত্র হল সেই মেয়েটি | বেলমায়া নেপালি সেই তথ্যচিত্রটির কেবলমাত্র বিষয়বস্তু নয়, সহ-পরিচালিকাও বটে |

নেপালের পশ্চিমপ্রান্তে একটি দারিদ্র-দীর্ণ-পাহাড়ী গ্রামে নিম্নবর্ণের পরিবারে বেলমায়ার জন্ম| বেলমায়ার বয়স যখন মাত্র আট, তখনই সে অনাথ| মাথার ওপর চার বড় ভাই আর এক বোন, এদের সংসারেই কোনরকমে ঠাঁই পেল বেলমায়া | হতদরিদ্র পরিবারে যেটুকু অন্নের সংস্থান হতো, তা প্রথমে যেত বাড়ীর ছেলেদের পাতে | প্রায় দিন বেলমায়া অভুক্ত থাকত | খিদের জ্বালায় কোনও কোনও দিন পড়শীর গাছের কুল চুরি করে খেত | যে বয়সে ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়তে যায়, সে বয়সে বেলমায়ার দিন কাটতো বাড়ীর গরুদের জন্য ঘাস কেটে আর জঙ্গল থেকে জ্বালানির কাঠ কেটে | পিঠে বাঁশের ঝুড়িতে করে বোঝা বয়ে নিয়ে আসতে হত |

শত বাধাবিপত্তি এড়িয়ে একদিন বেলমায়া যখন লেখাপড়া শেখার আশায় স্কুলে গেল তখন মাস্টারমশাই তাকে ভর্তি না করে বললেন যে তার মাথায় 'গোবর পোড়া'| এবারেও তার লেখাপড়ায় ছেদ পড়ল | তার বড় ভাইয়েরাও তাকে লেখাপড়া শেখানোর কোনও চেষ্টা করল না | নেপালের প্রায় সর্বত্র মেয়েদের শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, বিশেষ করে নিম্ন বর্ণের দলিত পরিবারে | এ ধরনের পরিবারের মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়| বিয়ের পর স্বামীর সংসারেই গোটা জীবন কাটে তাদের | অতএব মেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে টাকা ঢেলে লাভ কী?

খালি পায়ে গ্রামের মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়ানো অবাধ্য মেয়েটি এরপর হাতের কাজ শেখার তাগিদে গিয়ে ভর্তি হল পোখাবাং শহরে একটি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে | সেখানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন 'ইউ' ম্যাগাজিনের তরফে দায়িত্ব মহিলা সাংবাদিক সিউ কার্পেন্টার গিয়ে উপস্থিত হন | তখন ২০০৬ সাল| কার্পেন্টারের দায়িত্ব ছিল কাঠমান্ডু শহরের একটি মেয়েদের আশ্রয়কেন্দ্র সম্মন্ধে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন রচনা লিখে পাঠানো| যে সমস্ত নেপালি কিশোরীরা দুর্দশাগ্রস্থ পরিবার থেকে এসেছে, যারা গৃহহীন, যারা অনাথ, যারা অবহেলিত ও প্রায় অশিক্ষিত- তাদের ফটোগ্রাফি শেখানোর একটি প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্যেও কার্পেন্টার পোখারা শহরে গেছিলেন | এখানকার অভিজ্ঞতাই তাকে প্রণোদিত করেছিল ইংল্যান্ডবাসীদের দানে 'আশা নেপাল' নামে এক দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে যার কাজ নেপালের মহিলাদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করা | এইখানেই বেলমায়ার সঙ্গে পরিচয় হয় কার্পেন্টারের| কার্পেন্টার প্রথম থেকেই লক্ষ করেছিলেন যে, বেলমায়া একটি প্রাণবন্ত, সাহসিনী ও স্পষ্টবক্তা কিশোরী | যখন অন্য মেয়েরা শিখেছিল শান্ত ও বিনীত হয়ে সমাজের অনুশাসন মানতে, তখন বেলমায়াকে দেখা গেল স্পষ্ট ভাষায় নিজের অনুভূতির কথা স্বচ্ছন্দে ব্যক্ত করতে| কার্পেন্টারের প্রস্তাবে বেলমায়া সোজা উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠল- "আমি একজন ফটোগ্রাফার হতে চাই | আমি দেখতে চাই কেমন করে মেয়েরা কষ্ট করে পাথর কাটে, জ্বালানির কাঠ কাটে, আর ছেলেরা আরাম করে বসে শুধু মেয়েদের ওপর কর্তৃত্ব চালায় আর ফরমায়েশ করে |"

কার্পেন্টারের ভাষায়- "বেলমায়ার ছিল অদম্য উৎসাহ আর বাঁধন ভাঙার আনন্দ | তার ঘন কালো চোখদুটিতে ছিল তারুণ্যের ঝলকানি | ক্যামেরা হাত নিয়ে ছবির বিষয়বস্তুর ওপর গভীর মনযোগ দিয়ে সে একের পর এক ছবি তুলত | সে প্রায়ই ক্যামেরার লেন্সগুলিকে নিজের দিকে তাক করত- সেলফি তখন ভবিষ্যতের গর্ভে | এই সাহসী ও অহমিকাপূর্ণ ছবিগুলির ভাণ্ডারই তাকে ১৫ বছর পরে সাহায্য করেছিল 'আই অ্যাম বেলমায়া' তথ্যচিত্রে তার নিজের কাহিনি শোনাতে এবং নিজের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে | কিন্তু তার এই প্রাণোচ্ছলতার নীচে লুকিয়ে ছিল এক গভীর বিষন্নতা ও তীব্র অভাববোধ | ফটোগ্রাফি শিক্ষায় তার সাফল্যকে এবং তার সত্তাকে কে আমি সম্মান দিয়েছিলাম, মূল্য দিয়েছিলাম | তাকে আমি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একটা পথ দেখিয়েছিলাম | তাই প্রকল্পের কাজের শেষে আমার যখন দেশে ফিরে যাওয়ার সময় হল, তখন তার কাছে বিষয়টা হৃদয়বিদারক মনে হল | সে কান্নায় ভেঙে পড়ল | তার বিপন্নতা আমার কাছে স্পষ্ট হল |"

বস্তুত কার্পেন্টার নেপাল ছেড়ে যাওয়ার পর ঐ আশ্রয় কেন্দ্রের পরিবেশ মেয়েদের পক্ষে সম্পূর্ণ প্রতিকূল হয়ে উঠল | বহিরাগতদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল | মেয়েদের ক্যামেরাগুলো তালাবন্ধ করে রাখা হল | বাইরের জগতের সঙ্গে মেয়েদের যোগাযোগ সম্পূর্ণ ভাবে বিচ্ছিন্ন হল | বাধ্য ছাত্রীদের মতো মতো পড়ার বই নিয়ে আঁকড়ে না থেকে, মেয়েরা নিজেদেরকে মেলে ধরার এবং মতপ্রকাশ করার স্বাধীনতা কিছুটা উপভোগ করেছিল | তাই বুঝি মেয়েদের শাসনে বাঁধা শুরু হল |

এই আশ্রয়কেন্দ্রে একটি যুবকের সঙ্গে বেলমায়ার পরিচয় হয় | পরিচয় থেকে হয় পরিণয় | সে খুব আশা করেছিল যে বিয়ের পর সে সুদিনের মুখ দেখবে | কিন্তু সুদিনের পরিবর্তে দুর্দিন দেখতে হল | বেলমায়ার ভাষায়- "সংসার জীবনে কখনও সুখের মুখ দেখিনি | তা দেখার আসায় ত্যাগ করেছি | যদি একটু লেখাপড়া শিখতাম, তাহলে একটা ভদ্রস্থ চাকরী জোটাতে পারতাম | আমাকে আমার স্বামী আর তার ভাইদের ওপর নির্ভর করতে হত না |" বস্তুত, এই বিয়ের পরে বেলমায়া একটি কন্যাসন্তান, দারিদ্র্য, মদ্যপ স্বামীর হাতের মার ভিন্ন আর কিচ্ছু পায়নি |

লিখেছেন
Anasuya Sen
Anasuya Sen
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।