কাশ্মীরে মদ নিষিদ্ধ হোক! কেন তীব্র প্রতিবাদে নামছেন সাধারণ মানুষ?
Jammu Kashmir Alcohol Ban: ২০১৯ সালের ৫ অগাস্টের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে কমপক্ষে ১৮৩টি মদের দোকান খোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
জম্মু ও কাশ্মীরের কাজিগুন্ড শহরে প্রথম মদের দোকানটি খুলেছিল ২০২৩ সালের মে মাসে। কয়েকদিন পরে, এর প্রতিবাদ জানিয়ে পুরো বাজারটিই বন্ধ রাখা হয়। প্রতিবাদ তেমন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি ঠিকই কিন্তু তারপর থেকেই কাজিগুন্ডের বাসিন্দাদের ভয়াবহ আশঙ্কাই যেন সত্যি হয়ে গিয়েছে। কাজিগুন্ডের ব্যবসায়ীরা বলছেন, অল্পবয়সি মেয়েরা, মহিলারা স্কুলে বা কাজের যাওয়ার সময় এই দোকানের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে আর নিরাপদ বোধ করেন না। কাজিগুন্ড ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যরা বলছেন, মদের দোকানে সাধারণত বহিরাগতদের ভিড় বাড়ছে। এই বহিরাগতরা প্রায়শই রাস্তায় ঝামেলা করে বা ছোটখাটো মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। খেলার মাঠ বা কবরস্থান যাই হোক না কেন, প্রায় সব খোলা জায়গায়ই খালি মদের বোতল পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে এখন।
কাজিগুন্ড শহরটি পড়ে অনন্তনাগ পশ্চিম বিধানসভা অংশের আওতায়। সেখানকার ন্যাশনাল কনফারেন্স দলের বিধায়ক আব্দুল মজিদ ভাট বলছেন, মদের দোকানের বিরুদ্ধে প্রতিদিন ফোন পান তিনি। শুধু কাজিগুন্ড নয়, উড়ি শহরের বাসিন্দারাও মদের দোকান খোলার বিরুদ্ধে একই রকম বিক্ষোভ করেছেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীরে মদ্যপানকে কখনই ভালো চোখে দেখা হয়নি। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে জম্মু কাশ্মীরের মানুষ মদ্যপানকে মেনে নিতে পারেননি সেভাবে। ২০১৯ সালের ৩৭০ ধারা বাতিলের পরে কাশ্মীর উপত্যকায় মদ খাওয়া নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে লেফটেন্যান্ট জেনারেলের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কাশ্মীর উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০টি মদের দোকান খুলেছে। এর জেরেই ক্রমেই বাসিন্দাদের প্রতিবাদ তীব্র হয়েছে।
আরও পড়ুন- হাজার হাজার মানুষ বুঁদ নেশায়! কয়েক বছরে কাশ্মীরে কেন হু হু করে ছড়াল মাদক মহামারী?
২০২৪ সালের নভেম্বর মাস থেকে জম্মু ও কাশ্মীরে নির্বাচিত সরকার স্থাপিত হওয়ায় এই অসন্তোষ এখন রাজনৈতিক জমিতে শিকড় ছড়াচ্ছে। নির্বাচিত নেতারাই এখন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে মদ্যপানের নিষিদ্ধের দাবি তুলছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ২০১৯-এর পরে, কাশ্মীরের এক শ্রেণির রাজনৈতিক দলের কাছে এটা স্পষ্ট যে আজাদির মতো ইস্যু বা নয়াদিল্লিকে আক্রমণ করার মূল্য চোকাতে হবে৷ তাই তাদের বেশিরভাগই এই বিষয়ে নীরব। তবে মদ্যপানের নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করাটা কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন করা বা জম্মু ও কাশ্মীরের উপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো বিষয় নয়।
এপ্রিল মাসেই জম্মু ও কাশ্মীরের বিভিন্ন দলের তিনজন বিধায়ক মদ নিষিদ্ধ করার জন্য ব্যক্তিগত সদস্যদের বিল উত্থাপনের কথা ভাবছেন। পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির বিধায়ক মীর মহম্মদ ফায়াজ ফেব্রুয়ারিতে প্রথম এই প্রস্তাব দেন। তাঁকে সমর্থন করেন ন্যাশনাল কনফারেন্সের বিধায়ক আহসান পরদেশি এবং আওয়ামী ইত্তেহাদ পার্টির শেখ খুরশিদ আহমদ। আহসান পরদেশি প্রশ্ন তোলেন, "জম্মু ও কাশ্মীর একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল এবং মদ স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাবাবেগে আঘাত করে। বিহারে যখন মদ নিষিদ্ধ হতে পারে, জম্মু কাশ্মীর কেন নয়?” শ্রীনগরের সাংসদ, আগা সৈয়দ রুহুল্লাহ মেহেদিও মদের দোকানের বাড়বাড়ন্তের বিরোধিতা করেছেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীর উপত্যকা থেকে মদ নিষিদ্ধ করার দাবি যেমন উঠছে, তেমনই উঠছে জম্মু থেকেও। সেখানে আবার ভারতীয় জনতা পার্টির এক নেতাও এই দাবিকে সমর্থন করেছেন। উল্লেখ্য, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৯৫%-এরও বেশি মদের দোকান জম্মু বিভাগে রয়েছে।
১৯৮০-র দশকের শেষ দিকে, জঙ্গিরা উপত্যকায় মদ বিক্রি এবং মদ খাওয়া নিষিদ্ধ করেছিল। বলেছিল, এটি 'স্থানীয় সংস্কৃতির অবমাননা' বলে অভিহিত করেছিল। কয়েকটি মদের দোকানে জঙ্গিরা হামলা চালিয়েছিল। জঙ্গিবাদের যত থিতিয়ে গেছে পর্যটনের কারণে কাশ্মীরের বিশেষ কয়েকটি জায়গাতে মদের দোকান খোলার পরিমাণ বেড়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী তা পাহারা দিয়েছে। কিন্তু ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে ৩৭০ ধারা বতিলের পর থেকে, সরকার কাশ্মীর উপত্যকায় আরও বেশি করে মদের দোকান খুলতে আগ্রহী বলেই মনে করছে মানুষ।
২০১৯ সালের ৫ অগাস্টের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে কমপক্ষে ১৮৩টি মদের দোকান খোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করে – জম্মুতে ১১৬টি এবং উপত্যকায় ৬৭টি। এখনও পর্যন্ত, কাশ্মীরে ১০টি নতুন দোকান খোলা হয়েছে।
২০১৯ সালে কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপর সরকারের দমন-পীড়নের কথা মাথায় রেখেই বিরোধীরা মূলত এই নিয়ে উচ্চবাচ্যও করেনি। এই অঞ্চলটি নয়াদিল্লির সরাসরি শাসনে থাকাকালীনই বেশিরভাগ নতুন মদের দোকানগুলি খোলা হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্দ্রের সরকার যে কাশ্মীরের সাধারণ মানূষের ভাবাবেগ বা সাংস্কৃতিক নিরাপত্তাকে মোটেও গুরুত্ব দেয় না, তা আঁচ করে, নির্বাচন পরবর্তী কাশ্মীর এখন নতুন করে প্রতিবাদের পথে।
আরও পড়ুন-ভূস্বর্গের অমৃত! শতাব্দীপ্রাচীন পানীয় ভাগ্য ফিরিয়েছে এই কাশ্মীরি তরুণীর
জানা যাচ্ছে, কাশ্মীর উপত্যকায় ক্রমেই মাতাল পর্যটকদের উপদ্রব বাড়ছে। গত বছরের জুন মাসেই, শ্রীনগর পুলিশ একদল পর্যটকদের বিরুদ্ধে মামলা করে। ডাল লেকে শিকারায় চেপে মদ খাওয়ার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পরে দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতারও করা হয়। জম্মু ও কাশ্মীরের ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মিলিত সংগঠন মুত্তাহিদা মজলিসে-ই-উলামা মিরওয়াইজ উমর ফারুকের নেতৃত্বে এই বিষয়ে কড়া বিবৃতি জারি করেছিল। বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, “কাশ্মীরের জনগণ অতিথিপরায়ণ এবং অতিথি হিসেবে উপত্যকায় আসা পর্যটকদের সম্মান করে। তবে, মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ উপত্যকায় এই ধরনের অ-ইসলামিক এবং অনৈতিক কাজকর্ম বরদাস্ত করা হবে না, এটি সাধক ও সুফিদের দেশ।”
এই বছরের গোড়ার দিকেই শ্রীনগরের লাল চক এলাকায় ব্যবসায়ীরা পর্যটকদের 'স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সম্মান করা' এবং 'মদ ও মাদকের ব্যবহার এড়িয়ে চলা'-র পরামর্শ দিয়ে পোস্টার ছড়িয়ে দেয়।
কেন সরকার মদের দোকান নিয়ে এত আগ্রহী। আবগারি দফতর থেকে সরকারের যে বিপুল লাভ হয় একথা সবারই জানা। ২০১৭-১৮ সাল থেকে, মদের উপর আবগারি শুল্কের মাধ্যমে সরকার অর্জিত রাজস্ব প্রায় ২০০% বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭-১৮ সালে সরকার জম্মু ও কাশ্মীরে দেশি মদ এবং ভারতে তৈরি বিদেশি মদের উপর প্রায় ৮৪৪ কোটি টাকার মোট আবগারি রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। ২০২৩-২৪ সালে সেই অর্থের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা।
তবে সরকারের ভাঁড়ার ভরলেও উপত্যকার নেতাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, "এর মানে কি এই যে সরকার অর্থ উপার্জন করতে চায় বলে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যতকে নষ্ট করে দেবে?”
জম্মু ও কাশ্মীরে মদ নিষিদ্ধ করার বিল পাস হলেই যে এটি রাতারাতি আইন হয়ে যাবে তা নয়। বিলটি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের কাছে পেশ করা হবে, তিনি তারপরে রাষ্ট্রপতির কছে বিলটি পাঠাবেন বিবেচনার জন্য। যদি লেফটেন্যান্ট গভর্নর বিলটি পুনর্বিবেচনা করার জন্য বিধানসভায় ফেরত দেন বা কিছু সংশোধন করেন এবং যদি বিধানসভা সেই সংশোধনীগুলি ছাড়াই বিলটি পাস করে দেয়, তবে লেফটেন্যান্ট গভর্নর তখনও বিলটিতে সম্মতি দেওয়ার বা রাষ্ট্রপতির বিবেচনার জন্য বিলটি সরিয়ে রাখতে পারেন। ফলে, কাশ্মীর মদ মুক্ত হবে কিনা তা নিয়ে গভীরতর হতে চলেছে বিধানসভা এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নরের দ্বন্দ্ব।