বিনয় মজুমদার: আমার তিন টুকরো স্মৃতি

Binoy Majumdar: অকস্মাৎ বিনয় মজুমদার দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, “ভালোউ? ভালোউ কারে বলো? আমি কি আর কোনওদিন ভালোউ হবো? একটা দশ বছরের বালকের মতো মন কি আমি আর পাবো কোনওদিন?”

সেটা ১৯৮১ সাল। পুজো সবে শেষ হয়েছে। শুনেছিলাম বিনয় মজুমদার ঠাকুরনগর নামে এক গ্রামাঞ্চলে থাকেন। একবার যদি দেখা করা যেত! কিন্তু মা কিছুতেই আমাকে একা ছাড়বে না। আগে একা একা কলকাতায় কত নাটক দেখতে গেছি। কিন্তু সম্প্রতি পর পর দু’বার হাসপাতালে ঘুরে আসার পর মায়ের ভয় বেড়েছে। তাছাড়া ঠাকুরনগর জায়গাটা কোথায়, কী করে পৌঁছতে হয় সেখানে, তা-ও আমি মাকে বলতে পারছি না ঠিকমতো।

মা গজাইকে ডাকল। গজাই আমার ভাইয়ের বন্ধু। সব সময় মুখে মিষ্টি হাসি। কবিতার ধারকাছ দিয়ে যায় না। কিন্তু আমার সঙ্গে ক্রিকেট খেলা নিয়ে গল্প করে। গজাই সন্ধান এনে দিল, আমরা যেখানে থাকি, সেই রাণাঘাট থেকে প্রথমে বনগাঁর ট্রেন ধরতে হবে। তারপর বনগাঁ থেকে কলকাতামুখী কোনও লোকালে উঠলেই একটা বা দু’টো স্টেশন পরে ঠাকুরনগর। "গজাই তুই যাবি তো সঙ্গে?" -মায়ের প্রশ্ন। গজাই এক পায়ে খাড়া। অবশ্য সে বিনয় মজুমদারের নাম শোনেনি।

বনগাঁয় পৌঁছনোর পর আমরা লোকাল ট্রেনে ঠাকুরনগর স্টেশনে নামলাম। স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা দোকানে জিজ্ঞেস করতেই তারা একবাক্যে বিনয় মজুমদারকে চিনতে পারল। পথনির্দেশও দিয়ে দিল কীভাবে পৌঁছতে হবে তাঁর বাড়িতে।

পৌঁছলাম। গাছপালা ঘেরা মস্ত একটা জমি সামনে, তার পিছনে বসতবাড়ি। ওই জমিটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। গজাইকে জিজ্ঞেস করলাম, "কী করি বল তো?" গজাই অকুতোভয়। হাঁক পাড়ল দু’বার- “বিনয়দা আছেন? বিনয়দা?” কিছুক্ষণ পর হাফ শার্ট আর প্যান্ট পরা মধ্যম উচ্চতার এক ব্যক্তি বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়ালেন। হাত-ইশারা করে ডাকলেন তাঁর দিকে যাওয়ার জন্য। এগিয়ে গেলাম দু’জনে। হ্যাঁ, তিনিই বিনয় মজুমদার। জ্যোতির্ময় দত্ত সম্পাদিত ‘কলকাতা’ পত্রিকার একটি সংখ্যায় পুরো প্রচ্ছদব্যাপী বিনয় মজুমদারের মুখের ছবি ছাপা হয়েছিল। তখন টিভি আসেনি। সংবাদপত্রেও কবিদের ছবি ছাপার রেওয়াজ ছিল না। ভাগ্যিস জ্যোতির্ময় দত্ত তাঁর কাগজের প্রচ্ছদ করেছিলেন বিনয় মজুমদারের মুখচ্ছবি দিয়ে। তাই চিনতে পারলাম।

আরও পড়ুন: মণিপুর ২০২৩: জয় গোস্বামী

জিজ্ঞেস করলেন, “কী চাই?” বললাম, “আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে এসেছি।” ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। একটা খাট, খাটের পাশে বড় জানলা। জানলার বাইরে মাঠ দেখা যায়। এতই হতভম্ব আমি, যে একটা প্রণাম পর্যন্ত করিনি। খাটে কিছু লিটল ম্যাগাজিন ছড়িয়ে আছে। একটা মোটা খাতা। জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কোথা থেকে আসছো?” বললাম। নাম জানতে চাইলেন। তা-ও বললাম। “কী করো?” গজাই বলল, “আমরা কিছু করি না।” তার মুখে সেই মিষ্টি হাসিটা দেখা গেল। বিনয় মজুমদার বললেন, “চাকরি পাওয়া তো শক্ত এখন।” তারপর হাতের ঘড়ির দিকে তাকালেন। তাকিয়ে বললেন, “একটা বেজে চল্লিশ মিনিট।” আবার নীরবতা। “এবার একটা রেলগাড়ি যাবে”, বললেন। আমার মনে পড়ল, আমরা যখন এ বাড়ির ফাঁকা জমির ভিতরে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলাম, তখন গজাইয়ের হাতঘড়িতে বেলা দেড়টা বেজেছিল। অর্থাৎ, দশ মিনিট হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে যাকে বলে কথালাপ, তা কিছুই শুরু করা যায়নি।


এই সময়ে একটু দূরে একটি লোকাল ট্রেন চলে যাচ্ছে, জানলার দিয়ে তা দেখা গেল।

বললেন, “বলেছিলাম না রেলগাড়ি যাবে!”

আবার নীরবতা। একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি এর মধ্যে, তাঁর চোখের দৃষ্টি আমাদের মুখের দিকে তাকাচ্ছে কখনও কখনও, কিন্তু কিছুই যেন দেখছে না। আমরা সামনে বসে আছি না নেই, তা বোঝা যায় না তাঁর তাকানো থেকে। তাঁর চোখ অবশ্য বেশিরভাগ সময়েই জানলা দিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে বারবার।

“তোমরা কি পত্রিকা করো?”

গজাই বললো, “পত্রিকা করি মানে?” তাড়াতাড়ি আমি সামাল দিলাম। “না না, পত্রিকা করি না।”

“তবে আমার কাছে কেন? অনেকেই আসে। তারা পত্রিকা করে। লেখা চায়।” - বলে আবার চুপ।

আমি এতক্ষণে সাহস করে বললাম, “আপনার কবিতা খুব ভালো লাগে, তাই একটু দেখা করতে এসেছি।” মুখ ও দৃষ্টি আগের মতোই সমান নির্লিপ্ত। ভাবলাম, 'আপনার কবিতা ভালো লাগে'- এই কথাটা নিশ্চয়ই শত শত মানুষের কাছে আগেও শুনেছেন তিনি। এ কথার আর নতুন করে কী-ই বা অর্থ হবে বিনয় মজুমদারের মতো কবির কাছে! পরে বুঝেছিলাম, আমি একটা মূর্খ। তাঁর নির্লিপ্তি এতদূর যে তাঁর মন আমার কথার দিকে নেই। বরং আছে তাঁর হাতের ঘড়ির দিকে। বললেন, “একটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট। রেলগাড়ি আবার যাবে আড়াইটায়।” গজাই জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি কোথাও যাবেন?”

আমাদের দিকে না তাকিয়ে উত্তর, “না। আমাকে একটা ওষুধ খেতে হবে।”

আমি বললাম, “ওষুধ?” ওষুধ খাওয়ার গুরুত্ব আমি জানি। আমাকেও ঘড়ি ধরে ওষুধ খেতে হয়। তাই ব্যস্ত হয়ে বলে উঠি, “কখন ওষুধ খাবেন আপনি? দেরি হয়ে যাচ্ছে না তো?”

“চারটে বেজে পনেরো মিনিটে আমার পরের ওষুধটা। একটা বেজে পনেরো মিনিটে আগের ওষুধ খেয়েছি। তিন ঘণ্টা পর পর। ডাক্তার বলে দিয়েছে।”

A Remembrance of eminent poet Binoy Majumdar by Joy Goswami on Robibarer Royak

এবার আমি থমকে গেলাম। একটা পনেরোয় একজন মানুষ ওষুধ খেয়েছেন। তার পর চারটে পনেরোয় আবার খাবেন। তার জন্য এই তিন ঘণ্টা ধরে প্রতি দশ মিনিট অন্তর তিনি ঘড়ি দেখে যাচ্ছেন?
মাঝে মাঝে স্বগতক্তির মতো দু-একটা কথা বলছিলেন, আমাদের দিকে লক্ষ্য করে নয়। থিঙ্কিং অ্যালাউড যাকে বলে। একটা কথা মনে আছে, শুনতে পেলাম, “এ-ই ঝন্টুদের... বাড়ির ওদিকটায়…” বাকিটা শোনা গেল না। কে ঝন্টু, কোথায় তার বাড়ি, এসব জিজ্ঞস করব, এমন মনের জোর নেই। আমাদেরও তো কিছু বলছেন না। অনেকক্ষণ হল।

মরিয়া হয়ে বলে ফেললাম, “আপনার একটা কবিতা পড়ে শোনাবেন? নতুন কবিতা?”

“নাহ। এখন ইচ্ছা নাই।” চোখের দৃষ্টি সমানই নিষ্প্রভ।

আমি বললাম, “আপনার একটা কবিতা আমি বলব? ”

“বলবা? তা বলো।”

একটা কবিতাও অবশ্য পুরো বলতে পারিনি। বলতে পেরেছিলাম, মাত্র একটা লাইন। কেন? আমি কি ভুলে গিয়েছিলাম কবিতাটা? না, সম্পূর্ণই মুখস্থ ছিল। কিন্তু এক লাইনের বেশি এগোতে পারেনি আমার বলা।

শুরু করলাম- “যাক তবে জ্বলে যাক জলস্তম্ভ ছেঁড়া যা হৃদয়”-
ফিরে এসো চাকা-র এই কবিতাটির প্রথম লাইন বলামাত্র আশ্চর্য এক পরিবর্তন ঘটল মানুষটির। আমার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে সক্রোধে বলে উঠলেন, “ছেঁড়া ‘ঘা’ হৃদয় তিন সংস্করণ ধরে পরপর একই ছাপার ভুল।”

পাঠক লক্ষ্য করবেন, এই বাক্যটিতে আমি কোনও কমা ব্যবহার করিনি। কারণ গর্জনের মতো এই বাক্যটি তিনি একটানা বলেছিলেন। এবং সেই সঙ্গে একটি অপ্রত্যাশিত বিষয় প্রত্যক্ষ করলাম। এতক্ষণ ধরে যে চোখে নির্লিপ্তি ছাড়া কিছুই ছিল না, সেই চোখে এক অসম্ভব আগুন জ্বলে উঠল, ‘ঘা’ শব্দটি উচ্চারণের সময়। ‘ছেঁড়া ঘা হৃদয়’ অর্থাৎ হৃদয়ের এক ক্ষত বারংবার ছিঁড়ে ছিঁড়ে যা তীব্র ভাবে জাগ্রত এখনও, সেই শব্দ ভুল ছাপা হওয়ায় তার যন্ত্রণা বিনয় মজুমদারের চোখের মধ্যে দিয়ে যেন অগ্নির উৎসারণ ঘটালো। অর্থাৎ বিনয় মজুমদার তাঁর কবিতা কতখানি হৃদয়ের ভিতর থেকে নিক্ষেপ করেছিলেন পৃথিবীর দিকে, তার যেন একটা জ্বলন্ত সাক্ষ্য পেলাম এই একটি বাক্যের উচ্চারণে। এটা ভেবেও আশ্চর্য লাগল, যে-কবির কবিতা নিয়ে সমগ্র পাঠকসমাজ এত উচ্ছ্বসিত, তাঁর কোনও কবিতায় তিন সংস্করণ ধরে কীভাবে একই শব্দ ভুল ভাবে ছাপা হয়ে যেতে পারে! পরে অবশ্য নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি যে এমন হওয়া বিচিত্র নয়।

সেদিন আর বসতে সাহস পেলাম না। উঠে পড়ছি। বললেন, “তোমরা চা খাবা নাকি?” গজাই তাঁর সুন্দর হাসিটি দিয়ে বলল, “না না চা খাবো না।”

“ইচ্ছা হলে খেতে পারো, স্টেশনের দিকে চায়ের দোকান পাবা।”

উনি তক্তপোষেই চুপ করে বসে রইলেন। আমরা বেরিয়ে এলাম। বেরোনোর সময় ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, আরও যেন নির্লিপ্ত, নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছেন তিনি। আমাদের দিকে ঘুরে তাকালেনও না বিদায় জানানোর সময়। তখন অবশ্য প্রণাম করেছিলাম। ছাপার ভুল, ওই ‘ছেঁড়া ঘা’ কি তাঁকে অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল?

এবার বাড়ির সামনের জমিটুকু পেরনোর সময় দেখলাম একটি লোক নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করছে।

A Remembrance of eminent poet Binoy Majumdar by Joy Goswami on Robibarer Royak

এর পাঁচ বছর পরের কথা। বিনয় মজুমদার অসুস্থ হয়ে কলেজ স্ট্রিটের মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে আছেন। এ খবর নিয়মিত ছাপা হচ্ছে দৈনিক 'আজকাল' সংবাদপত্রে। তাঁর আরোগ্য প্রার্থনা করে অনেক মানুষ চিঠি দিচ্ছেন, তা-ও ছাপা হচ্ছে ওই কাগজেই। একসময় এ-ও পড়লাম, তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। ডাক্তারেরা বাড়ি যেতে বলেছেন তাঁকে।

বিকেলে ভিজিটিং আওয়ারে একদিন দেখা করতে গেলাম হাসপাতালে। এজরা ওয়ার্ডে ছিলেন তিনি। আমি যখন পৌঁছলাম, তখন বিনয় মজুমদার তাঁর বেডের উপর কাত হয়ে শুয়ে প্রায় এক শিশুর মতো ঘুমোচ্ছেন। বেডের পাশে ছোট্ট টেবিলে ওষুধের শিশির সঙ্গে একটি সন্দেশের বাক্স রাখা। একজন বয়স্ক সিস্টার, পরে শুনেছি তিনি তাঁর শুশ্রুষার দায়িত্বে ছিলেন, আমাকে বললেন, “ওই তো উনি, স্যারেরা ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু উনি বাড়ি যেতে চাইছেন না।” সিস্টাররা সাধারণত ডাক্তারদের ‘স্যার’ বলেই উল্লেখ করেন।

বেডের পাশে একটি টুল ছিল। সেই টুলে বসে আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম, কখন তাঁর ঘুম ভাঙে।

একটু পরেই তিনি চোখ মেলে তাকালেন। আমাকে দেখে উঠে বসলেন, “কী নাম তোমার?”

বললাম।

“সন্দেশ খাবা?”

আমি নম্র ভাবে বললাম, “ না।”

“তা’লে আমি একটা খাই?” বলে সন্দেশের বাক্স খুলে একখানা সন্দেশ খেতে লাগলেন। আজকে তাঁকে কেমন শিশুর মতো লাগছে আমার। আগের দিনের সঙ্গে তেমন মিল নেই। শুধু দৃষ্টির নির্লিপ্তি অনেকটাই আগের মতোন।

বিছানার উপর নড়াচড়া করতে গিয়ে দেখা গেল, এক খণ্ড ভাঁজ করা কাগজের উপর তিনি ঘুমিয়েছিলেন এতক্ষণ। তিনি কাগজটা খুললেন। তারপর আমি যা আশা করিনি, তাই ঘটল। “একটা কবিতা। শুনবা? দুপুরে লিখিছি।” বলে পড়তে লাগলেন কবিতাটা। “একখান পত্রিকায় দিতে হবে। কেমন লাগল?” আমি বললাম, “ভালো, খুব ভালো।” বলে আমি সেই কথাটাই আাবার বললাম, যে কথাটা আমি বিনয় মজুমদার ঘুম থেকে উঠবার পর থেকেই বারবার বলে যাচ্ছিলাম। কী সেই কথা?

“আপনি এখন ভালো হয়ে গিয়েছেন। এবার বাড়ি ফিরে যাবেন। কত আনন্দের কথা আমাদের।” যেহেতু বিনয় মজুমদার কথা বলছেন খুবই কম, আমি একা বসে আছি। তার উপরে আমাকে সন্দেশ খেতে বলেছেন, এবং একটা কবিতা শুনিয়েছেন। যা সবই আমার আশার অতীত! তাই আমি জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকার মতো বারবারই বলে যাচ্ছি- “আপনি এখন ভালো হয়ে গিয়েছেন। কত আনন্দের কথা। এবার আপনি বাড়ি ফিরে যাবেন।”

বিনয় মজুমদার এ কথার কোনও জবাব দিচ্ছেন না। কথাটি তিনি শুনতে পাচ্ছেন বলেও মনে হচ্ছে না। সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছেন কথাটি। ভিজিটিং আওয়ারস শেষ হল। আমি আমার কাঁধের ঝোলা, হাতের ছাতা গুটিয়ে রওনা দিচ্ছি, বিনয় মজুমদার আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার সঙ্গে সঙ্গে আসছেন দরজা পর্যন্ত। আমি, মূর্খের অধম মূর্খ, আবারও ওই কথাটা বললাম- “আপনি এখন ভালো হয়ে গিয়েছেন। বাড়ি ফিরে যাবেন। কত আনন্দের কথা।”

পাশাপাশি রাখা বেডের মাঝখান দিয়ে যে প্যাসেজ, সেখান দিয়ে আমরা বেরোচ্ছিলাম দরজার দিকে। অকস্মাৎ বিনয় মজুমদার দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, “ভালোউ? ভালোউ কারে বলো? আমি কি আর কোনওদিন ভালোউ হবো? একটা দশ বছরের বালকের মতো মন কি আমি আর পাবো কোনওদিন?”

আমি দেখলাম, তাঁর চোখে আবার সেই আগুন জ্বলে উঠেছে, যা সেদিন ‘ছেঁড়া ঘা’ বলবার সময় জ্বলে উঠেছিল।

সঙ্গে সঙ্গে প্রণাম করে স্থানত্যাগ করলাম।

কলেজস্ট্রিটের মেডিক্যাল কলেজ থেকে হেঁটে শিয়ালদা ফিরছি। বিনয় মজুমদারের শেষ কথাটায় মনের ভিতরটা তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে। শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে বেঞ্চিতে বসে বসে ভাবছি, একটা দশ বছরের ছেলের মন নিয়ে বিনয় মজুমদারের মতো কবির কী লাভ হবে? একটা দশ বছরের ছেলে কি বিনয় মজুমদারের মতো কবিতা লিখতে পারবে?

আজ যখন বিনয় মজুমদারের ওই উক্তি এবং সেই সময়ে বলা তাঁর অভিব্যক্তি মনে পড়ে, তখন কীভাবে যেন আমার স্মরণে এসে যায় ডাকঘর নাটকের একেবারে শেষ দৃশ্যের কথা। রাজকবিরাজ এসেছেন। তিনি বলছেন, “এইবার তোমরা সকলে স্থির হও। এলো, এলো, ওর ঘুম এলো। আমি বালকের শিয়রের কাছে বসব--- ওর ঘুম আসছে। প্রদীপের আলো নিবিয়ে দাও--- এখন আকাশের তারাটি থেকে আলো আসুক…” বালক অমল যাঁর প্রধান সম্বল, অমলের সেই প্রতিপালক মাধব দত্তের সংলাপ এখানে এই রকম: “ঠাকুরদা, তুমি অমন মূর্তিটির মতো হাতজোড় করে নীরব হয়ে আছ কেন?... এরা আমার ঘর অন্ধকার করে দিচ্ছে কেন! তারার আলোতে আমার কী হবে!” পরের সংলাপে আসছে, ঠাকুরদার এই উত্তর, “চুপ করো অবিশ্বাসী! কথা কোয়ো না।”

আজ এই সত্তর বছরে পা দিয়ে আমার মনে হয়, বিনয় মজুমদারের শেষ পর্যায়ের কবিতা পড়তে পড়তেও আমার মনে হয়, একজন বালকের যে স্বচ্ছ্ব, বিস্ময়াকুল উড়াল দেওয়া মন হয়, তেমনই মনের সন্ধান আমরা পাই বিনয় মজুমদারের অনেক কবিতায়। বারবার অসুস্থতার পর সেই মন হারিয়ে ফেলেছেন বলে পরিতাপ জন্মেছিল তখন কবির। যে পরিতাপ আমার মতো নির্বোধ বুঝতে পারেনি। যেমন তারার আলোর মাহাত্ম্যের প্রকাশ বুঝতে পারেনি মাধব দত্তের মন।

 

তারপরেও অতিবাহিত হয়েছে আরও অনেক বছর। ততদিনে আমি কলকাতাবাসী। স্ত্রী-কন্যা নিয়ে পুরোপুরি গৃহস্থ। ভাগ্যজোরে একটা চাকরি পেয়েছি। আমার কাজ হল, কবিতা নির্বাচনের এবং কবিতা বিভিন্ন কবির থেকে সংগ্রহ করে তা প্রকাশের, এক পাক্ষিক পত্রিকায়। বিনয় মজুমদারের কাছ থেকে দু’বার কবিতা আনানো সম্ভব হয়েছিল। তখন বিনয় শেষজীবনে পৌঁছেছেন, তাঁকে ঘিরে আছে সাহিত্য উৎসাহী যুবকেরা। তাদেরই কারওর মাধ্যমে সংগ্রহ করেছি একটি কবিতা। ছাপাও হয়েছে পত্রিকায়। পার হয়ে গিয়েছে কয়েক মাস। একদিন বাড়ির ল্যান্ডলাইনে একটা ফোন এল। আমি ফোন ধরতে একজন যুবক নিজের নাম বলে জানাল, “আমি ঠাকুরনগর থেকে বলছি।” যুবকটির নাম এখন আর আমার মনে নেই। সেই একবারই শুনেছিলাম তো, তাই।

আমি বললাম, “ঠাকুনগর। সেখানে তো বিনয় মজুমদার থাকেন।”

যুবকটি জানায়, হ্যাঁ বিনয়দার জন্যই আপনাকে ফোন করছি- ওঁর যে কবিতা বেরিয়েছিল, ছ’মাস হয়ে গেল, উনি এখনও তার চেক পাননি।”

আমি মরমে মরে গেলাম, শুধু ‘বিনয় মজুমদার, ঠাকুরনগর, উত্তর ২৪ পরগনা’ লিখলেই তো চেক চলে যাওয়ার কথা!

যুবকটি এবার বলে, বিনয়দা আপনার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে চান।

আমি খুব ভয়ে ভয়ে ফোন হাতে নিলাম। এটা তো একটা অন্যায় কাজ হয়েছেই আমার দিক থেকে। আমার খোঁজ রাখা উচিত ছিল।

ফোনে বললাম, বিনয়দা, আমার প্রণাম নেবেন। চেক যত তাড়াতাড়ি পৌঁছয়, তার চেষ্টা আমি আগামিদিন থেকেই করব। আপনি আমায় ক্ষমা করবেন, চেক এখনও পৌঁছয়নি বলে। এটা আমারই দায়িত্ব ছিল।

বিনয় মজুমদার ফোনের অপর প্রান্ত থেকে চেকের কথা একটিবারের জন্যও তুললেন না। বললেন, তুমি ভালো আছো তো? এখন নাকি কলকাতায় থাকো শুনি?

আমি বললাম, “হ্যাঁ।”

ইতিমধ্যে আমার মেয়ে বুকুন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সে তখন সদ্য ‘ফিরে এসো চাকা’ পড়ছে। তার একটাই দাবি: “আমি একদিন বিনয় মজুমদারের কাছে যাবো।” বুকুন বলল, “ফোনটা আমাকে দাও। আমি কথা বলব।” আমি বললাম, “বিনয়দা আমার মেয়ে আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাইছে। একটু কথা বলবেন?” বিনয়দা বললেন, “হ্যাঁ, দাও। তোমার মেয়ে কোন ক্লাসে পড়ে?”

আরও পড়ুন: শেষ পঞ্চাশ বছরে বেশিরভাগ কবিই রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ার আকর্ষণ বোধ করেননি

আমি উত্তর দেওয়ার আগেই বুকুন ছিনিয়ে নিয়েছে ফোন। বলছে, “তুমি কেমন আছো? আমি বুকুন বলছি। আমি তোমার কবিতা পড়ি। খুব ভালো লাগে। আমি একদিন তোমার বাড়ি যাবো। তুমি দেখা করবে তো আমার সঙ্গে?”

বিনয়দার কথা তো শুনতে পাচ্ছি না। শুনলাম বুকুন বলছে, “আমার? আমার তো সতেরো এখন।” সেই সঙ্গেই বুকুন এ-ও বলছে,  “না, বাবার সঙ্গে আসব না, বাবা নিয়ে যাবে না। আমি একাই যাবো।” তারপর বুকুন বলল, “হ্যাঁ পারবো, নিশ্চয়ই পারবো, আমি যাবো কিন্তু, তোমার সঙ্গে দেখা করবো।” তারপর বুকুন ফোন রেখে দিল। আমি বললাম, “তুই ফোন রেখে দিলি? উনি কী বলছিলেন?” বুকুন বলল, “উনি বললেন, আমার বাড়ি আসবা? তোমার বয়স কত?” আমি বললাম, “সে তো বুঝতেই পারলাম। অতবার করে পারব, নিশ্চয়ই পারব- এইসব কেন বলছিলি তুই?”


“উনি যে আমাকে বললেন, তোমার বয়স সতেরো। তার মানে তুমি সপ্তদশী, তারপর বললেন, তুমি শহরের মেয়ে, আমাদের গ্রামের পথ চিনে চিনে অতদূর থেকে আসতে পারবা তো?”

আমার কাছে সে আমার মেয়ে বুকুন। কিন্তু কবির কাছে সে এক সপ্তদশী কন্যা। শেষবয়সে পৌঁছনো সেই কবির সঙ্গে দেখা করতে চায়, তাঁর কবিতা পড়ে। তাই বলছেন, 'তুমি শহরের মেয়ে। আমাদের এই এতদূর গ্রামের পথ চিনে চিনে আসতে পারবা তো?'

বুকুনের যাওয়া হয়নি।

বিনয় মজুমদার চলে গিয়েছেন।

আমি এখনও দেখতে পাই তাঁর বাড়ির সেই জমির উপর দাঁড়িয়ে তিনি দূরে তাকিয়ে আছেন। সপ্তদশী একটি কন্যা, শহরের মেয়ে সে, কতদূর থেকে কবির গ্রামের বাড়ির পথ চিনে চিনে চলেছে, এখনও চলেছে। কবি তাকিয়ে আছেন সেই চলাটির দিকেই...

 

 

More Articles