কুয়াশা দেখে এঁকে ফেলেছিলেন তাজমহল, অবিশ্বাস্য প্রতিভা ছিল অবনীন্দ্রনাথের

Debabrata Mondal
২ মিনিট
কুয়াশা দেখে এঁকে ফেলেছিলেন তাজমহল, অবিশ্বাস্য প্রতিভা ছিল অবনীন্দ্রনাথের

এই গল্পটার শুরু হচ্ছে চিৎপুর রোড, বা আরও ভালোভাবে বলতে গেলে দ্বারকানাথ ঠাকুরের গলিকে কেন্দ্র করে। চিৎপুর রোড, যা বর্তমানে পরিচিত রবীন্দ্রকানন নামে, সেই রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোলেই চোখে পড়বে দ্বারকানাথ ঠাকুরের গলি। এই গলির পাঁচ এবং ছয় নম্বর বাড়ি হয়ে উঠেছিল নবজাগরণের ভরকেন্দ্র। রবীন্দ্রনাথ থেকে অবন ঠাকুর, একঝাঁক ক্ষণজন্মা প্রতিভার বিচরণভূমি এই দুই বাড়ি, যে বাড়ি ঊনবিংশ শতকের বাঙালিকে বাধ্য করেছিল নতুনভাবে ভাবতে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটি মোটেই উজ্জ্বল নয়। চিৎপুর রোডের ঠাকুরবাড়িকে কেন্দ্র করে যখন প্রবাহিত হচ্ছে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির হাওয়া, ঠিক তখনই চিৎপুর অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হচ্ছে বাঙালির 'বাবু কালচার'। এই প্রসঙ্গে সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর বলছেন, "সন্ধ্যে হলেই চিৎপুরের মাঠকোঠা থেকে গানের সুর আর ঘুঙুরের মিঠে আওয়াজ আরম্ভ হয়ে গেছে। চিৎপুরের আশপাশে চোখে সুরমাটানা বাবুদের ভিড়, জুড়িগাড়ি, গলায় ঝোলানো প্যাঁচানো চাদরের বাহার, চুনোট দেওয়া ধুতি… গা থেকে আতরের খুশবু চিৎপুরের সন্ধ্যের হাওয়া ও পরিবেশ মাতাল করে তুলতো।"

এই চিৎপুর রোডে বসেই তাজমহলকে বিষয়বস্তু করে অবনীন্দ্রনাথ মূলত তিনটি ছবি আঁকেন, 'ড্রিম অফ তাজ', 'বিল্ডিং অফ তাজ' এবং ‘পাসিং অ্যাওয়ে অফ শাহজাহান’। এই প্রসঙ্গে সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর 'ঠাকুরবাড়ির জানা অজানা' বইটিতে। কথা প্রসঙ্গে তিনি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একবার বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তাঁর মনে হয়, তাজমহল বেদনার প্রতীক, যদিও এই নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়। এই প্রসঙ্গেই তিনি অবনীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করেন, তাজমহল দেখে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কী অনুভূতি? উত্তরে অবনীন্দ্রনাথ তাঁকে জানান, তিনি নিজের চোখে কোনওদিন তাজমহল দেখেননি। তাজমহল সিরিজের ছবিগুলো তিনি এঁকেছিলেন তাজমহল না দেখেই, এমনই ছিল তাঁর প্রতিভা। এমনকী, তিনি সুমিতেন্দ্রনাথকে এও জানান, মুসৌরি যাওয়ার সময় যমুনার ব্রিজের ওপর কুয়াশাময় প্রকৃতিকে দেখেই তিনি এঁকে ফেলেছেন তাজমহল। অথচ এই সিরিজের প্রতিটি ছবি ছিল অসম্ভব প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর।

একবার বাড়ির গুরুজনদের সঙ্গে তাঁর প্রচণ্ড তর্ক হয়। বাড়ির বাকি সবার ধারণা ছিল, অয়েল পেন্টিং আঁকা আয়ত্ত করলেও পোর্ট্রেট আঁকতে অবনীন্দ্রনাথ এখনও অপারগ। অবনীন্দ্রনাথ হাসিমুখে বাড়ির বাকিদের বলেন, তিনি পোর্ট্রেট এঁকে দেখিয়ে দিতে পারেন। সেই সময় দ্বারকানাথ ঠাকুরের গলির পাঁচ নম্বর বাড়িতে ছিল দ্বারকানাথ ঠাকুরের একটি পোর্ট্রেট। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বললেন একইরকম পোট্রেট তিনিও আঁকতে পারেন। বাকিদের মুখে তখন অবিশ্বাসের হাসি। কিছুদিনের মধ্যেই বাড়ির অন্যান্যরা ভুলে গেলেন অবনীন্দ্রনাথের সেই পোট্রেট আঁকার কথা, কিন্তু অবন ঠাকুর ভোলেননি। কিছুদিনের মধ্যেই দ্বারকানাথের প্রায় একইরকম একটি পোর্ট্রেট এঁকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন বাড়ির বাকিদের।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঠাকুরবাড়ির হাতেই যেমন দিকনির্দেশ হত বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির, ঠিক একইভাবে ঠাকুরবাড়ির আনাচ-কানাচে ছড়িয়ে ছিল এরকম হাজারও মজার বা প্রতিভার প্রাচুর্যে হতবাক করে দেওয়ার মতো স্মৃতি।

লিখেছেন
Debabrata Mondal
Debabrata Mondal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বইয়ের জন্য হাঁটতে হয় কেন?

Walk for Books 2026: প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বইমেলাকে মনে করে বইয়ের জন্য একবার হেঁটেছিল বাঙালি। তারপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবার এই ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এ দেখা গেল সেই ছবি। হুড়দুড় করে ছেলেবুড়োমেয়েমদ্দ সব রাস্তায় নেমে এল—এ কী আজব খেলা রে ভাই!

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।