বিজেপি তৃণমূলের দুর্নীতি ধরতে পারছে না, নাকি ধরতে চাইছে না?

Abhishek Banerjee Delhi : বিজেপিও মানুষকে বোঝাতে পারল না যে ১০০ দিনের কাজ হোক বা আবাস যোজনার টাকা — এগুলি নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে।

Sambit Pal
৪ মিনিট
বিজেপি তৃণমূলের দুর্নীতি ধরতে পারছে না, নাকি ধরতে চাইছে না?

তৃণমূলের যুবরাজ রাজ্য থেকে তৃণমূলের কর্মী সমর্থকদের দিল্লি নিয়ে যাচ্ছেন। ইস্যু কী? দিল্লির বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের প্রাপ্য আর্থিক পাওনা আটকে রেখেছে। ১০০ দিনের কাজের টাকা বা আবাস যোজনার টাকা কেন্দ্রের সরকার দিচ্ছে না। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা আটকে রেখেছে কেন্দ্র। কাজেই রাজ্যের মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। গ্রামের যেসব খেটে খাওয়া মানুষ ১০০ দিনের প্রকল্পে কাজ করল, তারা তাদের মেহনতের টাকা পাচ্ছে না! সুতরাং 'দিল্লি চলো'। দিল্লির রাজপথে আন্দোলনকে নিয়ে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের এবং জাতীয় মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করো।

এই আন্দোলনে প্রাপ্য টাকা সত্যি আদায় করা যাবে কিনা বা এই আন্দোলনের ফলে কেন্দ্রীয় সরকার মাথা নোয়াবে কিনা অথবা কৃষকদের আন্দোলনের মতো এই আন্দোলনেরও জোর আছে কিনা, তা অন্য কথা। কিন্তু এই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে যে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার ইস্যুতে রাজ্যের মানুষের সহানুভূতি কুড়ানো যাবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সেই বামফ্রন্ট আমল থেকেই রাজ্যের মানুষ কেন্দ্রীয়-বঞ্চনার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত। তৃণমূল সরকারও জানে এই ইস্যু রাজ্যের মানুষ বেশ ভালো খায়।

এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও দু'টি বিষয়। এই আন্দোলনে সামিল হতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন দিল্লিতে থাকবেন বলে ঠিক রয়েছে, তখনই এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দুর্নীতির তদন্তের মামলায় ডেকে পাঠিয়েছে। অন্য বিষয়টি হলো, তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের দিল্লি নিয়ে যাওয়ার জন্য দল যে ট্রেন ভাড়া করতে চেয়েছিল, তার আবেদন রেল মন্ত্রক খারিজ করে দিয়েছে। ট্রেন না পেয়ে বাসে করেই সমর্থকদের দিল্লি নিয়ে যাওয়া হবে বলে ঠিক করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। ফলে 'বঞ্চনা' বা 'নিপীড়নের' ইস্যু নতুন মাত্রা পেয়েছে।

এটি আর কারও অজানা নয় যে, সিবিআই বা ইডির মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক বসদের কথাতেই ওঠা বসা করে। এটা ঠিক যে, এবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অমৃতা সিনহার ধমক খেয়েই ইডি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তড়িঘড়ি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বিচারপতি এটি বলে দেননি, যেদিন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দিল্লিতে থাকতে পারেন, সেদিনই তাঁকে ডাকতে হবে। কিন্তু আগের কয়েকবারের মতো ইডি কর্তারা ঠিক এই কাজটিই করেছেন। এর আগে ইন্ডিয়া জোটের সমন্বয় কমিটির বৈঠকের দিন ইডি অভিষেককে তলব করেছিল। তারও আগে পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় নবজোয়ার যাত্রা চলাকালীন তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদককে ডেকে পাঠিয়েছিল ইডি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অভিষেকের সম্পত্তির পরিমাণ ঠিক কত

Abhishek Banerjee: অভিষেকের সম্পত্তির পরিমাণ কি বিপুল? হাজরার বিরাট প্রাসাদোপম বাড়ির মালিকের ঠিক কত টাকা?

এই সব জিজ্ঞসাবাদের নিট ফল যে শূন্য তা দাবি করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলেছেন অভিষেকই। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, এই জিজ্ঞাসাবাদ শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই করা হচ্ছে। কারণ, না তো আদালতে কোনও তথ্য প্রমাণ হাজির করতে পেরেছে ইডি, না গ্রেফতারের মতো কোনও পদক্ষেপ করতে পেরেছেন তদন্তকারীরা।

রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তুলে এনে যেরকমই আত্মসুখ লাভ করুন না কেন ইডি কর্তারা বা তাঁদের রাজনৈতিক অভিভাবকেরা, তাতে না তো বিজেপির রাজনৈতিক কোনও লাভ হচ্ছে, না লাভ হচ্ছে জনগণের। কারণ ১০০ দিনের বা আবাস যোজনার প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ হোক বা শিক্ষা ও অন্যান্য দুর্নীতিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগ — সব বিষয় নিয়ে রাজ্যের বিজেপি নেতারা নিজেদের আঙুল চুষছেন।

তবে কি পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি শেষ হয়ে গেল? শুধুমাত্র আদালতের প্রশ্ন ও নির্দেশই কি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখবে? গত ১২ বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার বিরোধীদের কম ইস্যু উপহার দেয়নি। সারদা চিট ফান্ড দুর্নীতি থেকে শুরু করে হালের শিক্ষক নিয়োগে কারচুপি— পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দুর্নীতির ঘনঘটা। তবুও ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচন ছাড়া তৃণমূলকে বেগ পেতে হয়নি কখনও।

বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের দুর্বল ও ছন্নছাড়া সংগঠন যদিও তৃণমূলকে ওয়াকওভার দিয়েছে, কিন্তু ২০১৮-১৯ সালে বিজেপির উপর ভরসা রাখার কথা ভেবেছিল রাজ্যের জনগণের একাংশ। এমনকী ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে সরকারে না আনলেও, নিরঙ্কুশ ভাবে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা বিজেপিকে দিয়েছে এ রাজ্যের নির্বাচকেরা। কিন্তু তারপর?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মমতা-বর্জিত একনায়কতন্ত্রের চেষ্টা আদৌ সফল হবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের?

Abhishek Banerjee - Mamata Banerjee : কয়েকজনকে বলির পাঁঠা করে এক নতুন পণ্য বাজারে এনে তাকে বেচার এক আপ্রাণ চেষ্টা বাংলা দেখছে।

তারপর খোলা মাঠেই গোল দিয়ে চলেছে তৃণমূল!

এই যে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার দাবি তুলে তৃণমূল কয়েক হাজার কর্মী সমর্থকদের দিল্লি নিয়ে যাচ্ছে, তা তো বিজেপির নেতাদের অজানা ছিল না। সেই জুলাই মাসেই এই আন্দোলনের ঘোষণা করেছিলেন অভিষেক। কিন্তু এই দাবির পাল্টা কোনও তথ্য বা যুক্তি বিজেপি নেতাদের হাতে ছিল না?

এই 'বঞ্চনার' দাবি কি সত্যিই যুক্তি সঙ্গত? কেন্দ্রীয় সরকার ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে পশ্চিমবঙ্গের সরকারকে ১০০ দিনের কাজের টাকা দিচ্ছে না এটি সত্যি। তার ফলে যাঁরা ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে কাজ করেছিলেন, তাঁদের প্রাপ্য টাকা আটকে রয়েছে। অন্য দিকে নতুন করে ১০০ দিনের কাজও শুরু করা যাচ্ছে না। নতুন পঞ্চায়েত বোর্ড নির্বাচিত হয়ে গেছে। যেহেতু পঞ্চায়েতের মাধ্যমেই ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প রূপায়িত হয়, ফলে তারা এবার উঠে পড়ে লাগবেই। কিন্তু কেন টাকা আটকে রাখা হয়েছে?

কারণ ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প নিয়ে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। ভুয়ো জব কার্ড বানানো থেকে প্রকল্পের টাকা নয়ছয়ের অভিযোগের ভিত্তিতেই কেন্দ্রের গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক এই প্রকল্পের টাকা আটকে রেখেছে। তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কেন্দ্রের অফিসারেরা এসে সরেজমিনে তদন্তও করে গেছেন। মহাত্মা গান্ধী রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি আইনের ২৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী অনুদান বন্ধ করার নির্দেশ কেন্দ্রীয় সরকার দিতেই পারে। কিন্তু সেই ধারাতেই রয়েছে, একটি পরিমিত সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার প্রকল্পটি যাতে আবার ঠিক মতো চলে তার জন্য ব্যবস্থা নেবে।

এত দিনেও সেই তদন্তের ফলাফল জানা গেল না। প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হল না। কেন্দ্রীয় সরকার এটা প্রমাণই করতে পারল না যে ১০০ দিনের টাকা নিয়ে সত্যিই দুর্নীতি হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে বিজেপিও মানুষকে বোঝাতে পারল না যে ১০০ দিনের কাজ হোক বা আবাস যোজনার টাকা — এগুলি নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে।

বরং উল্টে ইডিকে দিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তলব করিয়ে বা ট্রেন না দিয়ে তৃণমূলকে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিল বিজেপি।

লিখেছেন
Sambit Pal
Sambit Pal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বাম বসন্ত ফিরবে বার্লিনে? শতাব্দীর সংগ্রাম শেষে আবার নতুন ভোর

Left-Wing Resurgence in Hitler’s Berlin: হিটলারের বার্লিনে ফিরছে বামপন্থা। তরুণরা সংক্রমিত। ইতিহাসের এই বিদ্রূপ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন দুঃস্বপ্নের নগরীতে।

চশমা যখন টেকসঙ্গী, কীভাবে কাজ করে এআই গ্লাস?

Meta AI Glasses: চশমা ব্যক্তিগত এআই সহকারী। চোখের ইশারা ও মৌখিক নির্দেশে কল, ছবি তোলা, ভিডিও রেকর্ডিং থেকে গুগল সার্চ—সবই যখন সম্ভব, তখন এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে? আর ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও এআই-নির্ভর এই চশমা আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কতটা সুরক্ষিত রাখবে?

টাকার বিনিময়ে বিজেপি-র প্রচার করেছেন সায়ক! আর আইনি জালে জড়ালেন অলিপাবের নিরীহ কর্মী

Sayak Chakraborty Olypub controversy: নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পাঁচটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনে বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরের মোট খরচ ছিল ৫২৯.৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই খরচ হয়েছে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা। সেই প্রচারের একটি অংশ ছিল সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্ট।

SRFTI: কীভাবে অনুষ্ঠান থেকে পরিস্থিতি গড়াল সংঘর্ষে?

SRFTI Clash: SRFTI-তে ডানপন্থী সংগঠনের অনুষ্ঠান ঘিরে কেন আপত্তি জানালেন পড়ুয়ারা? বক্তৃতায় কী বলা হয়েছিল, যা নিয়ে তৈরি হয় উত্তেজনা? কীভাবে অনুষ্ঠান থেকে পরিস্থিতি গড়াল সংঘর্ষে? পড়ুয়া ও আয়োজকদের পাল্টা অভিযোগের মধ্যে আসল ঘটনা কী?

যে নির্বাচন কমিশনার ভোট চুরি আটকেছিলেন

Election reforms of T. N. Seshan: ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন কমিশনারের চেয়ারে বসেছিলেন যে ব্যক্তি, সেই টি. এন. শেষন বলেছিলেন, 'আমাকে এই পদে বসাবেন না, আমি আপনাদের অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়াব।'

ছদ্ম-বিরোধী তৈরিই কি তবে ভারতের রাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন কৌশল?

Indian opposition politics: বিরোধীদের সরাসরি নিষিদ্ধ না করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার চাপ, আইনি ফাঁকফোকর এবং সুপরিকল্পিত দল ভাঙার মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে অনুগত ‘ছদ্ম-বিরোধী’।

EXCLUSIVE: কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে ভোট না-করানো তৃণমূলের বড় ভুল, নিজেদের ভুল নিয়েও আলোচনার দরকার ছিল: কুণাল

Kunal Ghosh on Mamata Banerjee: ইনস্ক্রিপ্টে ‘অনিন্দ্য এবং’ পডকাস্টে তিনি একদিকে যেমন দাবি করেছেন মমতাকে ভয় পেয়েই তাঁকে বারবার নিশানা করা হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে দলের ভুলত্রুটি স্বীকার করে আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।

EXCLUSIVE: শেষদিকে দল পরিচালনায় গ্যাপ ছিল, অভিষেকের অফিসও ঠিকঠাক ম্যানেজ করা হয়নি: কুণাল

Kunal Ghosh on Abhishek Banerjee: ইন্সক্রিপ্টের ‘অনিন্দ্য এবং’ পডকাস্টে অভিষেক প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কুণাল জানিয়েছেন, শেষ পর্যায়ের দল পরিচালনায় আরও ‘সতর্কতা’ প্রয়োজন ছিল। তাঁর দাবি, অভিষেকের অফিসও সব সময় ঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি।