স্বাধীনতা অলীক স্বপ্ন, তালিবানের অধীনে যেভাবে দিন কাটে আফগানিস্তানের মেয়েদের

Afganistan Crisis: মাথার উপর ঠেকানো রয়েছে বন্দুকের নল। শিক্ষা বন্ধ, স্বাধীনতার গন্ধ তো এদ্দিনে ভুলেছে দেশবাসী। এবার আফগানিস্তানে জারি নয়া নিষেধাজ্ঞা।

Sohini Das
৪ মিনিট
স্বাধীনতা অলীক স্বপ্ন, তালিবানের অধীনে যেভাবে দিন কাটে আফগানিস্তানের মেয়েদের

"রাজা করিতেছে রাজ্য শাসন, রাজারে শাসিছে রানি, রানির দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।" কবি নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন এ কথা। কোনও একটি জাতির উন্নতির সূচক শুধুমাত্র পুরুষের শিক্ষা দ্বারা চিহ্নিত হতে পারে না। বিবেকানন্দও বলেছিলেন একই কথা। সংসারের একটি মেয়েকে যদি শিক্ষিত করা যায়, তাহলে গোটা সংসার, গোটা সমাজকে শিক্ষিত করা সম্ভব। যুগ যুগ ধরে নারী স্বাধীনতার পক্ষেই সওয়াল হয়ে এসেছে, অন্তত সভ্য সমাজে তেমনটাই হওয়া কাম্য। তাতে পরিস্থিতি পুরোটা না বদলালেও কিছু বদল তো এসেইছে। তবে তালিবান আছে তালিবানেই।

তাদের কাছে বাঘ-সিংহের মতোই ভয়ঙ্কর নারী স্বাধীনতা। কারণটা সম্ভবত আন্দাজ করা কঠিন হয় না। শিক্ষিত সুস্থ সমাজে কখনওই তালিবানি শাসন কায়েম হতে পারে না। তাই হীরক রাজার মতোই তারা বলে ওঠে, 'এরা যত বেশি পড়ে যত বেশি জানে, তত কম মানে।' অতএব দাও জানলা-দরজা সব বন্ধ করে। যাতে একফোঁটাও আলো না আসতে পারে। শুধু শিক্ষায় মারলে চলবে কেন! মেয়েদের ছুঁড়ে ফেলে দাও এমন অন্ধকারে, যেখানে কোনও স্বর না পৌঁছয়। এমনকী মেয়েদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হোক সুন্দর থাকার অধিকারটুকুও। কারণ ওই যে একজন নারীর কাছে আলো পৌঁছে যাওয়া মানে তা ক্রমে ছড়িয়ে পড়বে গোটা সমাজ, দেশে। মালালার মতো আরও অনেক মেয়ে চোখে চোখ রেখে সওয়াল করার সাহস করবে। এমনকী গুলিতে মাথার ঘিলু ছিটকে পড়লেও থামবে না প্রশ্ন। তাই আলো আসা বন্ধ হোক সবার আগে।

না, এ কোনও বানিয়ে তোলা কথামালা নয়। আফগানিস্তানের ছবিটা এর থেকেও শোচনীয়। যবে থেকে তালিবান দখল নিয়েছে দেশ, তখন থেকেই দুরবস্থার শেষ নেই বাসিন্দাদের। মাথার উপর ঠেকানো রয়েছে বন্দুকের নল। শিক্ষা বন্ধ, স্বাধীনতার গন্ধ তো এদ্দিনে ভুলেছে দেশবাসী। এবার জারি নয়া নিষেধাজ্ঞা। সে দেশের মেয়েদের বিউটি স্যালো বা পার্লার ব্যবহারের উপরে টানা হল রোখ। মেয়েদের শুধুমাত্র যৌনদাসী ভাবা একটা দল বা গোষ্ঠীর থেকে আর কী-ই বা প্রত্যাশা করা যায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাদ গেল না ম্যানিকুইনও! তালিবান শাসনে প্লাস্টিকে মাথা ঢাকার নির্দেশ মেয়ে পুতুলদের

Taliban Mannequins: পলিথিন ব্যাগ, স্কার্ফ এমনকী অ্যালুমিনিয়ামের ফয়েল দিয়েও পোশাক পরিহিত পুতুলের মুখ ঢেকে রাখতে বাধ্য করা হয়েছে দোকানিদের।

ইতিমধ্যেই রাস্তাঘাটে পার্লারে হোডিংয়ে পোস্টারে যত মেয়েদের মুখ ছিল, সেসব কিছু কালো কালি লেপেছে তালিবান। তাতেও শান্তি হয়নি। কাবুল-সহ গোটা দেশ জুড়ে সম্প্রতি নয়া নির্দেশিকা জারি করেছে তালিবান সরকারের অসৎ ও সদগুণ (ভাইস অ্যান্ড ভার্চু) মন্ত্রক। হ্যাঁ, এমন মন্ত্রক তালিবান শাসনেই সম্ভব। ইতিমধ্যেই এই মর্মে কাবুলের সমস্ত মহিলা বিউটি পার্লারদের লাইসেন্স বাতিল করার নির্দেশ এসেছে। ইতিমধ্যেই মেয়েদের শিক্ষা ও বাইরে চাকরি করার উপরে জারি হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এবার সাজগোজের উপরও বসল কড়াকড়ি। আসলে প্রসাধন মানে তো শুধুই বহিরঙ্গের সাজগোজ নয়। নিজেকে সুন্দর করে তোলার মধ্যে দিয়েও তো অনেকটা আত্মবিশ্বাসী অনুভব করার সুযোগ থাকে। সেই জায়গাটাকেও নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করছে তালিবান।

২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে সেনা সরিয়ে নেয় আমেরিকা ও ন্যাটো। আর তার পরেই আফগানিস্তানের দখল নেয় তালিবান। তার পর থেকেই শুরু হয়েছে নানা ধরনের অত্যাচার। ইতিমধ্যেই আরোপ হয়েছে একাধিক নিষেধাজ্ঞা। তার মধ্যেই নয়া সংযোজন এই নির্দেশ। ভাইস অ্যান্ড ভার্চু মন্ত্রক থেকে জারি করা চিঠিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ জুন তালিবানের সর্বোচ্চ নেতা হায়বাতুল্লাহ আখুনজাদা মৌখিক ভাবে এই নির্দেশ জারি করেন। কাবুল ও আফগানিস্তানের সব কটি প্রদেশেই নয়া হুকুম বলবৎ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক মাসের মধ্যে সমস্ত পার্লারের ব্যবসা বন্ধ করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তালিবান শাসনে কেমন আছে আফগানিস্তানের মেয়েরা? জানলে শিউরে উঠতে হবে

তালিবান ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তানের গার্হস্থ নির্যাতন নিয়ে কাজ করা কেন্দ্রগুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র গার্হস্থ হিংসা নয়, নারীদের ওপর আক্রমণও বেড়েছে বিস্তর।

কেন এমন সিদ্ধান্ত, সে ব্যাপারে অবশ্য খোলসা করে কিছু জানানো হয়নি। জানানোর কথাও না। তালিবানরা আর কবেই বা কোনও দেশের বাসিন্দাদের প্রতি দায়বদ্ধ থেকেছে। তা-ও আবার দখল করা দেশ। ঔপনিবেশিক দেশের উপর অত্যাচার, জুলুম করাটাই তো দস্তুর। সেখানে তালিবানরা তো শুধু ধর্মীয় ভাবে চরমপন্থীই নয়, তাদের হয়ে কথা বলে বন্দুকই। তালিবানের এমন নির্দেশে মাথায় হাত বিউটি পার্লার মালিকদের। এমন স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তে তাঁদের রুজিরুটি নিয়ে টানাটানি পড়ে গিয়েছে। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন মেকআপ শিল্পী থেকে শুরু করে অনেকেই। কীভাবে তাঁরা সংসার টানবেন, তা-ই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

নব্বই দশকের শেষ দিকে ভয়াবহ ভাবে আফগানিস্তান শাসন করেছিল তালিবান। বাসিন্দাদের নানা ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে সেই জমানায়। এ নিয়ে একাধিক ডকুমেন্টশন রয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা থেকে সাংবাদিকদের অধিকার, সব কিছুই খর্ব হয়েছিল। শিক্ষা থেকে শুরু করে চাকরি, সব কিছুর উপরেই জারি হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ছিল নারী ও শিশুদের। আমেরিকা ও ন্যাটোর হস্তক্ষেপে বেশ কিছুদিন স্বস্তিতে ছিল আফগানিস্তানবাসী। তবে সেই সুখ চিরস্থায়ী হল না। আমেরিকা সেনা প্রত্যাহার করে নিতেই ফের রাষ্ট্রের দখল নিল তালিবান। শুরু হল ফের অত্যাচার, কষ্টের দিন।

যদিও সরকার গড়ার সময় তালিবান দাবি করেছিল, আগের তুলনায় অনেকটাই নরমভাবাপন্ন এবার তারা। দেশ শাসনের ক্ষেত্রেও সে ব্যাপারটি মাথায় রাখা হবে। তবে কোথায় কী! দু'দিন যেতে না যেতে আসল রূপে ফিরেছে তালিবান। ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়েছে নারীশিক্ষার অধিকার। কেড়ে নেওয়া হয়েছে সংবাদমাধ্যমে চাকরির স্বাধীনতা। মেয়েদের বাইরে কাজ করার ক্ষেত্রেও জারি হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। পার্ক, জিম এসব জায়গাতেও অধিকার নেই মেয়েদের। পোশাক তো ছিলই, এবার তার সঙ্গে যোগ হল প্রসাধনও।

এমনিতেই তালিবান শাসন জারি হওয়ার পরে ভেঙে পড়েছে আফগানিস্তানের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মঞ্চেও একঘরে হয়ে গিয়েছে কাবুল। স্বাভাবিক ভাবেই দুঃসহ অবস্থা বাসিন্দাদের। জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদের উপায় নেই। বাইরে থেকেও সাহায্য আসার অবকাশ নেই। সবচেয়ে বড় কথা, যতটা খবর বাইরে আসছে, যতটুকু জানা যাচ্ছে, তার চেয়েও যে খারাপ অবস্থায় বাসিন্দারা রয়েছেন, তা তালিবানি জমানায় আঁচ করাই যায়। মেয়েদের এই পরাধীনতার নিগড় গোটা সমাজ, গোটা দেশটাকেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে আরও আরও পিছনে, আরও অন্ধকারে। কবে মিলবে স্বাধীনতা, কবে আসবে স্বস্তির ঘুম, উত্তরটা বোধহয় সময়ের কাছেও নেই।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।