ট্রাম্পের সাহায্য প্রার্থনা! পাকিস্তানের জেলে বসে যা লিখলেন ইমরান খান

Imran Khan: ইমরান খান লিখেছেন, "এখন অন্ধকার সময়, পাকিস্তানের মানুষ এখনকার মতো জাগ্রত ও সচেতন কখনও ছিল না। তাঁরা মিথ্যার ফাঁকফোকর দেখতে পাচ্ছে"।

পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলে বর্তমানে বন্দি আছেন পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। দু'বছর আগে আল কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় জামিন নিতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি। পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, পিটিআই পার্টির নেতা, সে দেশের বিশ্বকাপ জয়ী দলের অধিনায়ক ইমরান খানের একটি লেখা ২৮ ফেব্রুয়ারি টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। এই লেখায় তিনি পাকিস্তানি সেনার সমালোচনা করেছেন, তাঁর লেখায় উঠে এসেছে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উদ্বেগ। পাশাপাশি তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তাঁর কাছে আর্জি জানিয়েছেন, পাকিস্তানের সংঘাত ও চরমপন্থার মতো পরিস্থিতি প্রতিরোধে সহায়তা করতে এবং নিরাপত্তার দিকটি খতিয়ে দেখতে। ঠিক কী লিখেছেন ইমরান? পাঠকের জন্য রইল সম্পূর্ণ লেখাটির অনুবাদ।

২০২৫ সাল শুরু হতে না হতেই আমি পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্থির এবং চ্যালেঞ্জের সময়ের কথা বলছি। একটি নির্জন কক্ষে বন্দিদশায় (সলিটারি সেল) থেকে আমি কর্তৃত্ববাদী শাসনের কবলে থাকা একটি জাতির শোচনীয় অবস্থা দেখতে পাচ্ছি। তবু এই সব কিছু সত্ত্বেও, আমার বিশ্বাস আছে পাকিস্তানের জনগণের ন্যায়বিচারে প্রতি অঙ্গীকারে, তারা নিজেদের প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে পুনরুদ্ধার করবেই।

আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আনা অভিযোগগুলি আমার গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইকে থামিয়ে দিতে চাওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এটি আমার একার সংগ্রাম নয়। পাকিস্তানের গণতন্ত্রের ক্ষয়ক্ষতি দীর্ঘ প্রভাব ফেলবে। পাকিস্তানের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যেমন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তেমনই এর জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে অবনতি হচ্ছে এবং বিশ্ব জুড়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেও দুর্বল করে তুলছে। বিশ্বের এই সংকট বোঝা জরুরি। শুধুমাত্র পাকিস্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নয়, দক্ষিণ এশিয়া এবং তার বাইরেও পাকিস্তানের স্থায়িত্ব বজায় রাখতে।

আরও পড়ুন- কোটি টাকার উপহার ইমরান বিক্রি করছেন চোরবাজারে?

একটি দেশের গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বর কেড়ে নেওয়া হলে সেই দেশের যে কী পরিণতি হয় সেই বিপজ্জনক নজির দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানে, এটি দেশের অভ্যন্তরীণ এবং পাশাপাশি বিশ্বের নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ, মুক্ত ও সুষ্ঠ শাসন ব্যবস্থায় বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষের কাছে এটি চিন্তার বিষয় হওয়া উচিত।

গত বছর তুলনাহীন জুলুম চলেছে। আমার রাজনৈতিক দল, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) সমর্থকদের উপর নৃশংস আক্রমণ বিশ্বকে অবাক করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং জাতিসংঘ বিনা বিচারে আটক করা এবং রাজনৈতিকভাবে আদালতে ট্রায়াল চালানোর ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এখনও পর্যন্ত ১০৩ জন পিটিআই-এর সদস্যকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক মানবধিকার কনভেনশন, যেমন- আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বা আইসিসিপিআর-এর অধীনে পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। ইইউ, যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ আন্তজার্তিক কমিউনিটিগুলি এই নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

এই সমস্যাগুলি পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের উপর প্রভাব ফেলছে। পাকিস্তান ইইউ-এর সঙ্গে পক্ষপাতমূলক বাণিজ্যের জায়গা হারাতে পারে, এতে আমাদের অর্থনীতি, বিশেষ করে বস্ত্রশিল্প শেষ হয়ে যেতে পারে। তবুও পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনরা তাদের বেপরোয়া নীতিই মানছে, আমাদের নাম খারাপ করতে আমার এবং আমাদের দলের সদস্যদের সম্পর্কে বানানো গল্প এবং ভিত্তিহীন গল্প ছড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বকে অবশ্যই এই নিয়ে ভাবতে হবে কারণ, পাকিস্তানের গণতন্ত্র ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বালোচিস্তানের মতো অঞ্চলগুলিতে সন্ত্রাসবাদ বাড়ছে। আর এই পরিস্থিতি যেমন দুর্ঘটনাক্রমে তৈরি হয়নি, তেমনই খুব সহজেও তৈরি হয়ে যায়নি।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী, যারা নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছে, তারা ব্যস্ত পিটিআইকে নিয়ে। আমি মনে করি, বিচারবিভাগ তাদের নীতি মেনে ন্যায়বিচার দিয়ে প্রতিরক্ষার স্তম্ভ হওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক নিপীড়নকেই হাতিয়ার করছে। অযৌক্তিক অভিযোগের ভিত্তিতে সন্ত্রাসবিরোধী আদলতগুলিতে পিটিআই সমর্থকদের নিয়ে গিয়ে ভরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বাড়িতে বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে, পরিবারগুলোকে ভয় দেখানো হয়েছে, এমনকি নারী ও শিশুদেরও এই আক্রমণ থেকে বাদ রাখা হয়নি। ভিন্নমত দমন করতে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার স্বেচ্ছাসেবক, প্রবাসী সমর্থক ও সদস্যদের হয়রানি এবং অপহরণ করা হয়েছে। নভেম্বরের শেষে ইসলামাবাদে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন আমাদের ১২ জন সমর্থক, আমাদের দল সেই তথ্য রেখেছে।

আমার মূল চিন্তা দেশের নেতৃত্ব নিয়ে, একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার অভিযোগ থাকলেও, আমি পিটিআইয়ের নেতৃত্বকে সহিংসতা এবং মানবধিকার লঙ্ঘন রোধ করতে বর্তমান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য অনুরোধ করেছি।

আমাদের স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল: পিটিআই দলের কর্মী এবং নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের উপর যে হামলা হয়েছে তার তদন্তের জন্য একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। পাশাপাশি আমরা সকল রাজনৈতিক বন্দির মুক্তির দাবি জানিয়েছিলাম।

জবাবে, পিটিআই-এর অস্পষ্ট 'রাজনৈতিক স্থান'-এর জন্য আমাকে গৃহবন্দি রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল কিন্তু আমি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি।

আমি এবং আমার দল মনে করি কর্তৃত্ববাদী শাসন চালানোর জন্য এদের উপর সংসদে রবার স্ট্যাম্প পড়ে গেছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা, বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া এবং ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে কোনও রকম বিতর্ক ছাড়াই আইন আনা হয়েছে। এখন রাজনৈতিক মতবিরোধকে 'রাষ্ট্রবিরোধী' কার্যকলাপ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, শাস্তি হিসেবে তাদের গায়েব করে দেওয়ার এবং কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। পাকিস্তানের গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নগুলিও প্রায় মুছে ফেলা হচ্ছে।

সংসদের বাইরেও, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান সৈয়দ আসিম মুনিরেরু সামরিক বাহিনীর সাংবিধানিক সীমা স্বীকার করা এবং সম্মান করা অত্যাবশ্যক। কেবলমাত্র এটি করলেই পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর মধ্যে উন্নতি হতে পারে, যা জনগণ বেছে নিয়েছে, জনগণের জন্য। ইতিহাসে দেখেছি, পাকিস্তানে একনায়কতন্ত্র ক্ষণস্থায়ী কিন্তু তারা যা ক্ষতি করে যায় তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রয়ে যায়, যারা এই ক্ষতির জন্য দায়ী তাদের চেয়েও বেশি স্থায়ী। গণতন্ত্রকে রক্ষা করলেই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে, গণতন্ত্রকে দাবিয়ে রাখলে নয়।

এখন অন্ধকার সময়, পাকিস্তানের মানুষ এখনকার মতো জাগ্রত ও সচেতন কখনও ছিল না। তাঁরা মিথ্যার ফাঁকফোকর দেখতে পাচ্ছে এবং তাদের এই দৃঢ় সংকল্প আমাকে আশা দেয়। ন্যায়বিচার এবং মর্যাদার জন্য লড়াই করা সহজ নয়, তবে এই লড়াই চালিয়ে যাওয়া জরুরি। আমি বিশ্বাস করি সত্যের জয় হবেই। আমরা একসঙ্গে এমন একটি পাকিস্তানের পুর্নগঠন করব যেখানে জনগণের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা হবে।

আরও পড়ুন- ভারত পাকিস্তানের চেয়ে ভাল, কেন মনে করছেন ইমরান খান?

পাকিস্তানের বাইরেও বিশ্ব এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সংঘাত থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, বিশ্বব্যাপী এই চ্যালেঞ্জগুলি যত গুরুতর হচ্ছে ততই একজন শক্তিশালী নীতি-নির্ধারণকারি নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে আমি জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঐতিহাসিক জয়ের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন জনগণের ভরসা এবং ইচ্ছের প্রমাণ।

তাঁর প্রথম মেয়াদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তানের মধ্যে শ্রদ্ধার উপর ভিত্তি করে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তিনি আবার ক্ষমতায় আসার পর আমরা তাঁর প্রশাসনের গণতান্ত্রিক নীতি মানবাধিকার আইন শাসনের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করার অপেক্ষায় রয়েছি। বিশেষ করে সেই অঞ্চলগুলিতে যেখানে কর্তৃত্ববাদ এই মূল্যবোধগুলিকে ক্ষুণ্ণ করে। একটি গণতান্ত্রিক এবং স্থিতিশীল পাকিস্তান আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলির প্রতি আগ্রহ রাখে এবং আমরা সেই ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।

উল্লেখ্য, আমি তাঁর প্রশাসনকে এমন অংশীদারিতে জোর দিতে আহ্বান জানাচ্ছি যা পাকিস্তানের মতো দেশগুলিকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করে দেবে। যা ন্যায্য বাণিজ্য নীতি, গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রতি অঙ্গীকার বাড়াবে এবং সংঘাত ও চরমপন্থার মতো পরিস্থিতি প্রতিরোধে সহায়তা করবে। আমি আশাবাদী, মার্কিন নেতৃত্বের এই নতুন অধ্যায় এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে সম্পৃক্ততা আনবে, শান্তি এবং অগ্রগতি বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।

আমরা এগিয়ে চলেছি, আমি পাকিস্তানকে ন্যায়বিচার এবং সমতার উপর তৈরি একটি দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সামনের পথ কঠিন হতে চলেছে কিন্তু আমার এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে পাকিস্তানের জনগণ তাদের সংকল্পে ঐক্যবদ্ধ, তারা চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করবে। আমরা একসঙ্গে আগামী প্রজন্মের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব।

More Articles