Agnipath: দেশসেবার স্বপ্ন দেখা ছেলেদের উপদ্রবকারী বানাল কে!

পিঠে ঝোলানো ব্যাগ থেকে পরনের জামা, কালো রঙের আধিক্যে আলো আঁধারির রাস্তায় আলাদা করা যাচ্ছিল না। কিন্তু জহুরির মতোই অন্ধকারে ‘প্রদীপে’র শিখা দেখতে পেয়েছিলেন চিত্র নির্মাতা বিনোদ কাপরি। রূপোলি পর্দায় না হোক, সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরতে পেরেছিলেন হার না মানা মানসিকতাকে।আর তাতেই মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিলেন ১৯ বছরের প্রদীপ মেহরা। ফাস্টফুট জয়েন্ট ম্যাকডোনাল্ড’স-এ কাজ সেরে ১০ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন কৈশোর না পেরনো প্রদীপ। পরিচালক লিফট দিতে চাইলেও রাজি হননি। গর্বের সুরে জানিয়েছিল, সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চান। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি মায়ের চিকিৎসার খরচ এবং সংসার চালাতে গিয়ে আলাদা করে অনুশীলনের সময় পান না। তাই বাড়ি ফেরার পথে রোজ ১০ কিলোমিটার রাস্তা দৌড়ে নিজেকে ‘ফিট’ রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান।

পরিচালকের ক্যামেরাবন্দি প্রদীপের অদম্য জেদকে সেই সময় কুর্ণিশ জানিয়েছিলেন নেতা-মন্ত্রী থেকে আম জনতা। প্রতিকূলতা, অসহায়তার নাকে কান্না না কেঁদে, যুবসমাজকে প্রদীপের মতো প্রত্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দিতে দেখা গিয়েছিল অনেককেই। তার পর তিন মাসও কাটেনি। লক্ষ্যছোঁয়ার আগেই প্রদীপের মতো হাজার হাজার ছেলে সেনাবাহিনীর চাকরিতে কার্যত ‘আনফিট’ হয়ে গেলেন। প্রত্যয়ের অভাবে নয়, সরকারি সিলমোহরের আঁচড়ে তাঁদের সেনাবাহিনীতে স্থায়ী সরকারি চাকরির স্বপ্ন মুহূর্তে বিলীন হয়ে গেল। আর স্বপ্নভঙ্গের ক্ষোভ, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতঙ্কই নেমে এল আক্রোশ হয়ে। তার জেরে জায়গায় জায়গায় পুড়ল ট্রেন, তছনছ হয়ে গেলে নগর-শহর, ঝরল রক্তও। সেনাবাহিনীর উর্দি গায়ে চাপিয়ে দেশের সম্ভাব্য রক্ষকদের গায়ে সেঁটে গেল উপদ্রবকারী এমনকি সন্ত্রাসী তকমাও। আগুন জ্বালিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো এই ছেলেরা ‘অগ্নিবীর’ হওয়ার যোগ্য নয় বলে নিদানও শোনা গেল।

সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা অবশ্যই অন্যায়। কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী সরকারই। লাগাতার একের পর এক সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেসরকারিকরণ করে চলেছে তারা। দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িয়ে যেখানে, সেই সেনাবাহিনীর চাকরিতেও কার্যত ঠিকে প্রথা চালু করতে উদ্যোগী হয়েছে তারা। তাই ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্পের আওতায় পদাতিক, নৌ এবং বায়ুসেনার ১৫ বছর চাকরির সময়কালকে একধাক্কায় কমিয়ে চার বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে। ‘অগ্নিবীর’-এর মতো গালভরা নাম দেওয়া হলেও, আগুনের উপর দিয়ে হাঁটার জন্য এত দিন ধরে চলে আসা পেনশন এবং গ্র্যাচুইটিও পাবেন না সেনাবাহিনীর জওয়ান, নৌবাহিনীর নাবিক এবং বায়ুসেনার সৈনিকরা।

চার বছরের চাকরিতে সর্বাধিক প্রথম ছ’মাস পর্যন্ত প্রশিক্ষণ কাল। বাকি সাড়ে তিন বছর কার্যকাল। প্রথম বছরে মাসে ৩০ হাজার বেতন মিলবে। কেটেকুটে হাতে মিলবে ২১ হাজার টাকার মতো। বাকি ৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ বেতনের ৩০ শতাংশ আলাদা জমা হবে। সরকারও ওই আলাদা ধাকে সম পরিমাণ টাকা জমা করবে। দ্বিতীয় বছরে বেতন মিলবে ৩৩ হাজার টাকা, তৃতীয় বছরে ৩৬ হাজার টাকা। চতুর্থ বছরে মাসে ৪০ হাজার টাকা বেতন মিলবে। আলাদা খাতে জমা হওয়া বেতনের ৩০ শতাংশ এবং সরকারের
তরফে দেওয়া সম পরিমাণ টাকা মিলিয়ে চার বছর পর ১১ লক্ষ ৭১ হাজার টাকার মতো হাতে পাবেন ‘অগ্নিবীর’রা। চার বছরের মেয়াদ শেষে যোগ্যতার নিরিখে তাঁদের মধ্যে থেকে ২৫ শতাংশকে স্থায়ী ভাবে নিয়োগ করা হবে সেনাবাহিনীতে। বাকি ৭৫ শতাংশকে সাধারণ নাগরিক জীবনে ফিরে যেতে হবে। অর্থাৎ চার বছর সেনাবাহিনীতে কাটিয়ে বিকল্প রোজগারের খোঁজ
করতে হবে তাঁদের। কিন্তু এককালে ‘অগ্নিবীর’ ছিলেন, এই পরিচয়ে পরবর্তীকালে চাকরির ক্ষেত্রে কোথাও বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পাবেন না তাঁরা।

শুধু তাই নয়, সেনাবাহিনীর কর্মক্ষমতা বাড়াতে ১৭.৫ থেকে ২১ বছর বয়সি ছেলেমেয়েরাই ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্পে চাকরি পাওয়ার যোগ্য বলে প্রথমে জানায় কেন্দ্র। বিক্ষোভের মুখে পড়ে পরে ‘এককালীন’ পরিবর্তন হিসেবে বয়সসীমা বাড়িয়ে ২৪ করা হয়েছে। কিন্তু কোভিডের জেরে গত দু’বছরে সেনাবাহিনীতে নিয়োগই হয়নি। তাই প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র বয়সের জন্য চাকরির পরীক্ষাতেই বসতে পারবেন না হাজার হাজার ছেলেমেয়ে। এই চার বছরের চাকরিতে কারও মৃত্যু হলে বিমাবাবদ তাঁর পরিবারকে ৪৪ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। চাকরিতে বাকি থাকা মেয়াদের বেতন, বেতন থেকে আলাদা খাতে জমা হওয়া পুরো টাকা এবং তার সুদও মিলবে। যুদ্ধক্ষেত্রে বা সংঘর্ষ চলাকালীন কারও অঙ্গহানি হলে গুরুত্ব বিচার করে ক্ষতিপূরণ বাবদ সর্বোচ্চ ৪৪ লক্ষ টাকা দেবে সরকার। সে ক্ষেত্রেও বাকি থাকা মেয়াদের বেতন, এবং আলাদা খাতে জমা হওয়া টাকা ও সুদ মিলবে। অর্থাৎ প্রাণহানি এবং অঙ্গহানির ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র এই মোটা অঙ্কের টাকা মিলবে, আগের নিয়ম অনুযায়ী ১৫ বছর টানা চাকরি করলে যা এমনিতেই মোটামুটি উঠে আসত।

কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে মেয়েদের সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা শোনা গিয়েছে। ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্পে মেয়েদের আলাদা কোনও উল্লেখ নেই। প্রকল্পের ঘোষণার পর নৌবাহিনীর প্রধান ‘অগ্নিবীর’ হিসেবে মেয়েদের শামিল করার কথা বললেও, প্রয়োজন বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে দিল্লি সূত্রে জানা গিয়েছে। মেয়েদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে এখনও পর্যন্ত কিছু জানানো হয়নি বায়ুসেনার তরফে। মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলেই ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্পের আওতায় চাকরির পরীক্ষায় বসা যাবে। কিন্তু চার বছর সেনায় কাটিয়ে কত জন ফের পড়াশোনার জগতে ফিরতে পাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা
রয়েছে। সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ জেনারেল মনোজ পান্ডে জানিয়েছেন, পাকিস্তান এবং চিন সীমান্তে ‘অগ্নিবীর’দের মোতায়েন করা হবে। কিন্তু সর্বাধিক মাত্র ছ’মাসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জওয়ানরা সীমান্তে শত্রুপক্ষের মোকাবিলা করতে কতটা সফল হবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যেখানে চাকরিরই নিশ্চয়তা নেই, কিছু টাকার জন্য তরতাজা তরুণরা প্রাণ বিসর্জন দেবেন, সরকারের তরফে এমন আশা করা অমূলকই নয়, অন্যায়ও।

তাই তিলে তিলে নিজেদের তৈরি করা সেনায় চাকরিপ্রার্থী তরুণরা প্রতিবাদ করবেন, বিক্ষোভ দেখাবেন, তা কি একেবারেই কাম্য নয়, উঠছে প্রশ্ন। লাগাতর বিক্ষোভের মুখে পড়ে সম্প্রতি প্রকল্পে বেশ কিছু রদবদল ঘটিয়েছে কেন্দ্র। যেমন, চার বছরের মেয়াদ শেষে ‘অগ্নিবীর’দের জন্য উপকূলরক্ষী বাহিনীতে ১০ শতাংশ সংরক্ষণ, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীতে ১০ শতাংশ সংরক্ষণ
এবং বয়সের ঊর্ধ্বসীমায় তিন বছর ছাড়, অসম রাইফেলসেও তিন বছর ছাড়, মার্চেন্ট নেভি ও জাহাজমন্ত্রকে কাজের সুযোগ। পুলিশবাহিনীতেও ‘অগ্নিবীর’দের প্রাধান্য দেওয়ার কথা জানিয়েছে কিছু রাজ্য। বাস্তবে তার কতটা প্রতিফলন হয় তা দেখার। কিন্তু এই টানাপোড়েন, অনিশ্চয়তার কি আদৌ প্রয়োজন ছিল? কেন্দ্রের যুক্তি সেনার আধুনিকীকরণে, যুবসমাজকে এনে সেনাকে আরও কর্মচঞ্চল করে তুলতেই এই ‘যুগান্তকারী’ সিদ্ধান্ত।

আরও পড়ুন-অগ্নিপথ থেকে দলীয় কোন্দল, ঘরে-বাইরে চাপ! এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে কী হবে বিজেপির?

যদিও এর পিছনে অর্থনৈতিক কারণই জড়িয়ে রয়েছে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। কারণ ২০২২-’২৩ অর্থবর্ষে প্রতিরক্ষায় ৫.২৫ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করে কেন্দ্রীয় সরকার, যার মধ্যে ১.১৯ লক্ষ কোটি টাকা শুধুমাত্র পেনশনখাতেই চলে যায়। সেনাকর্মীদের ক্রমবর্ধমান বেতন, পেনশন এবং গ্র্যাচুইটি বাবদ বিপুল অর্থব্যয়ের দায় ঝেড়ে ফেলতেই ‘অগ্নিপথ’ নামক স্বল্পমেয়াদী নিয়োগ প্রকল্প আনা হয়েছে বলে মত প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের। কিন্তু দেসশের জাতীয় নিরাপত্তা নির্ভর করছে যে সেনাবাহিনীর হাতে, যাদের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, বালাকোট অভিযান ভাঙিয়ে নির্বাচনে ভোট ঘরে তোলা হয়,
তাদের ভবিষ্যতের দায়-দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলা কতটা যুক্তিসঙ্গত, উঠছে সেই প্রশ্নও।

প্রশ্ন তোলার বদভ্যাস জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী বলে গত কয়েক বছর ধরেই প্রতিষ্ঠা করার টেষ্টা চলছে। কিন্তু দেশভক্তি, জাতীয়তাবাদের প্রতীক যে সেনাবাহিনী, তাতে অংশ নিতে চাওয়া ছেলেমেয়েদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রচেষ্টা কি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী নয়? উত্তর সকলেরই জানা, কিন্তু সরকার তথা বিশেষ একটি শক্তির প্রতি আনুগত্যে বাঁধা পড়ে থাকায়, না জানার ভান করে রয়েছেন এক শ্রেণির মানুষ। এই আনুগত্য এতটাই প্রবল যে নিজের বাড়ির ছেলেটির ভবিষ্যৎ শিকেয় উঠলেও, সরকারের গায়ে আঁচড় তো দূর, সরকারি সিদ্ধান্তের কোনও রকম সমালোচনাকে ধর্তব্যের মধ্যে আনতে চাইছেন না তাঁরা। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেন চার বছরের ঠিকে চাকরি করতে যাবেন তরতাজা তরুণের দল, সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা থেকে কেন বঞ্চিত হবেন তাঁরা, পড়াশোনা-প্রস্তুতি ফেলে কেন রাস্তায় নামতে হবে তাঁদের, কোনও প্রশ্নকেই আমল দিতে চান না।

অথচ ছবিটি কিন্তু জলের মতো পরিষ্কার। মেধার নিরিখে তথাকথিত গড়পরতার দলে পড়লেও, যুগ যুগ ধরে দেশের যুবসমাজ,
বিশেষ করে গ্রাম বাংলার ছেলেদের নিশ্চিত ভবিষ্যতের ঠিকানা হয়ে থেকেছে সেনাবাহিনী। আধুনিক, ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছেলেরা তাই নির্দিষ্ট বয়সের পর থেকেই নিজেদের ঘষামাজা করতে শুরু করেন। সঠিক আহার না জুটলেও, সকাল-বিকেল দৌড়নো, সাঁতার, খেলা, কিছু বাদ যায় না। জীবনের ঝুঁকি রয়েছে জেনেও, শুধুমাত্র সরকারি চাকরি দেখে সন্তানকে
যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে দেন মা-বাবাও। কিন্তু সেই সরকারি চাকরির নিশ্চয়তাই নেই যেখানে, ‘ঠিকে শ্রমিক’ হিসেবে কেন জীবনের ঝুঁকি নিতে যাবেন ওই ছেলেরা? দেশসেবার আবেগ খাড়া করে, নামমাত্র টাকায় তাঁদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া কি অন্যায় নয়? একেবারেই অবান্তর নয় এই প্রশ্ন।

 

মতামত প্রতিষ্ঠানের নয়। লেখকের ব্যক্তিগত।

More Articles

;