'যে তোমার গায়ে হাত তোলেনি কক্ষনও, সে এসেছে', ফিসফিস করে বললেন মানিককাকা

'তিন কন্যা'-য় অভিনয়ের আগে, পারিবারিক বন্ধুত্বের সূত্রে আমি কখনওসখনও গিয়েছি সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে। যেমন, সন্দীপের (সন্দীপ রায়) মুখেভাতে। সেসময়ে আমিও খুব ছোট, ছ'সাত বছর বয়স হবে। কিন্তু ঘটনাটা আমার পরিষ্কার মনে আছে। বাবা-মায়ের বন্ধু ছিলেন মানিককাকা, ফলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাঝেমধ্যে দেখা হত। ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে যেমন হয়। কিন্তু সেরকম ঘনিষ্ঠতা যে ছিল, তা নয়।

তারপর একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছিল‌‌। যেহেতু আমরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়তাম, মা বাংলা শেখানোর জন্য খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে, গ্রীষ্মের ছুটিতে স্কুলের হোমওয়ার্ক ছাড়াও মায়ের দেওয়া হোমওয়ার্ক থাকত। 'গল্পগুচ্ছ' পড়ে শেষ করতে হবে, এই গোছের হোমওয়ার্ক আর কি। আমার তখন তেরো কি চোদ্দ বছর বয়স। হবি ত হ' 'গল্পগুচ্ছ'-তে 'সমাপ্তি'-ই পড়ছি তখন। ততদিনে আমি স্কুলের নাটকে অভিনয় করেছি, পুরস্কারও পেয়েছি ন'দশ বছর বয়েসে। সেই সময়ে আমার মনে হয়েছিল, বাবা-মাকে বলেওছিলাম, আমি বড় হয়ে অভিনেত্রী হব, অর্থাৎ ভবিষ্যৎ কেরিয়ারের কথাটা ইতিমধ্যেই মাথায় এসে গিয়েছিল। তো 'সমাপ্তি' গল্পটা পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল, ইশ, এটা নিয়ে যদি কেউ ছবি করত, আমাকে যদি মৃণ্ময়ীর চরিত্রে নিত, কী ভালো হত! ঠিক এইসময়েই একটা ফোন এল। ভেতর থেকে কেউ যেন বলে উঠল, এটা সত্যজিৎ রায়েরই ফোন। কেন এমন হল, সেই প্রশ্ন করলে অবশ্য উত্তর দিতে পারব না। আমি যদিও শুনেছিলাম, রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তিনটি গল্প নিয়ে ছবি করছেন সত্যজিৎ রায়। ফোন ধরলাম। যথারীতি সেই ভারী গলা। বললেন, "চিতু আছে?", চিতু ছিল আমার বাবা চিদানন্দ দাশগুপ্তর ডাকনাম। বুঝতেই পেরেছি কে বলছেন, তাও জিজ্ঞেস করলাম। সেই ভারী গলাতেই উত্তর এল, "আমি সত্যজিৎ রায়।" বলার কোনও দ‍রকার ছিল না, তাও আমি বললাম, "আমি ওঁর বড় মেয়ে, অপর্ণা কথা বলছি। একটু ধরুন, বাবাকে ডেকে দিচ্ছি।"

এরপর বিকেলবেলা বাবা-মা যখন চা খাচ্ছেন, আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তো জানি কী বলবেন! বাবা বললেন, "মানিক তোকে একটা ছবিতে নিতে চায়। কিন্তু ডোন্ট গেট ইওর হোপস আপ। কারণ, তার আগে একটা ফিল্ম টেস্ট হবে।"

আরও পড়ুন: তপন সিংহ বলতেন, ‘চারুলতার থেকেও তোমার আরতিকে আমার বেশি ভালো লাগে’

আমি ভেবেছিলাম, সেই ফিল্ম টেস্টে আমাকে বোধহয় অনেক অভিনয়-টভিনয় করে দেখাতে হবে। খুব আগ্রহীও ছিলাম, অভিনয় করতে। ভেবেছিলাম নিদেনপক্ষে হয়তো একটা কবিতা বলতে হবে। কিন্তু সেসব কিছুই হল না। আমাকে ডুরে শাড়ি আর নাকছাবি পরানো হল। মাথায় খোঁপা বাঁধা হয়েছিল কি না, বা কাজল পরানো হয়েছিল কি না, তা আমার মনে নেই। মোদ্দাকথা, আমাকে ওপরে তাকাও, নীচে তাকাও, ডানদিকে তাকাও, বাঁদিকে তাকাও ইত্যাদি বলে লুক টেস্ট করা হল। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল দেখা হল। এবং তারপর বলা হল, হ্যাঁ, আমাকে নেওয়া হবে।

তারপর মানিককাকাকে আরও কিছুটা চিনলাম ছবিটা করতে গিয়ে। প্রথম প্রথম একটু ভয় পেয়েছিলাম। অত লম্বা, ওরকম গমগমে একটা গলা! কিন্তু দেখলাম উনি মানুষটা আসলে কী অসম্ভব জেন্টল! আর ছোটদের সঙ্গে কথা বলতেন এমনভাবে, যেন সমবয়সি। একটা ডায়লগ ছিল মৃণ্ময়ীর, "আমার বাবা আমার গায়ে হাত তোলেনি কক্ষনও, কক্ষনও না।" আমার বাবা শুটিংয়ে এসেছেন একদিন। সাধারণত মা-ই আসতেন। বাবা আসতেন না কখনও। মানিককাকা আমার কাছে এসে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, "যে তোমার গায়ে হাত তোলেনি কক্ষনও, সে এসেছে।"

অভিনেতাদের সুবিধে-অসুবিধে সম্পর্কে মানিককাকা অসম্ভব আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিলেন। প্রথম যখন শুটিংয়ে গেছি, আমাকে একটা ডুরে শাড়ি দেওয়া হয়েছিল পরতে। সেটা খুব পাতলা। তখন আমার বয়স চোদ্দ। যেহেতু আমার বছরের শেষের দিকে জন্ম, ছবিটা যতদিনে রিলিজ হল, ততদিনে আমার বয়স পনেরো হয়ে গেছে। যাই হোক, ওই বয়সে মেয়েদের একটা স্বাভাবিক জড়তা থাকে। ওই শাড়ি দেখে মাকে আমি বললাম, না এই শাড়িতে গা দেখা যাচ্ছে, আমি কিছুতেই পরব না। মা তখন মঙ্কুমাসিকে, মানে বিজয়া রায়কে বললেন। আমি বললাম, মানিককাকাকে বলতে পারবে না কিন্তু। মঙ্কুমাসি বললেন, "সে কী! মানিক তো ডিরেক্টর! ওকে তো বলতেই হবে।" আমি ভয়ে, লজ্জায় কাঠ হয়ে ঘরের কোণে লুকিয়ে রইলাম। যাই হোক, সেদিন শুটি‌ং হল না। পরের দিন দেখলাম, একটা মোটা শাড়ি এসেছে আমার জন্য। সেটা পরেই শুটিং হল অবশেষে। আমার যেটা সবচেয়ে ভাল লেগেছিল, মানিককাকা কিন্তু এই শাড়ির ব্যাপার নিয়ে কোনও কথাই তুললেন না! শুধু যখন আমি বারবার শাড়িটা টেনে ঠিক করার চেষ্টা করতাম, বয়সোচিত আড়ষ্টতায়, তখন বলতেন, "কেউ দেখছে না তোমাকে। তুমি এখানে একা।" এভাবে আমার অস্বস্তিটা কাটিয়ে দিতেন। আর শটের সময় বলতেন, "ফাইন, ফাইন! কিন্তু আরেকটা নেব।" আমি বুঝতাম, পুরোপুরি 'ফাইন' নিশ্চয়ই হয়নি। কিন্তু ওঁর ধরনটাই ছিল অমন। বলতেন, "খুব ভালো হয়েছে। তবে আরেকটা নেব।"

তারপরে তো আমার সঙ্গে একরকম বন্ধুত্বই হয়ে গিয়েছিল ওঁর। ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে উনি জুরির চেয়ারপার্সন ছিলেন। আমাকে কলকাতা থেকে দিল্লিতে ডেকে আনিয়েছিলেন জুরি মেম্বার হতে। আমি তো অবাক! বললাম, "আমি কী করে জুরি মেম্বার হব? আমি তো কিছুই বুঝি না এসবের।" মানিককাকা বললেন, "তুই ছোটবেলা থেকেই বাবা-মার সঙ্গে ফিল্ম সোসাইটিতে ভালো ভালো ছবি দেখেছিস। একটা এক্সপোজার হয়েছে! ওটাই যথেষ্ট!" তারপর সেই জুরির মেম্বার হয়ে মানিককাকার সঙ্গে দিল্লিতে একটা বন্ধুত্ব হয়ে গেল। সেই বন্ধুত্বটা অনেকদিন ছিল। আমি যেতাম ওঁদের বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে, ওঁর সঙ্গে আড্ডা হত, গল্প হত। ওই বাড়িতে রোজ সন্ধেবেলা চামচিকে আসত। আমি চামচিকে খুব ভয় পেতাম। অথচ গল্প করাও চাই। তাই মাথার ওপর একটা কুশন চাপা দিয়ে বসে আড্ডা চালিয়ে যেতাম। মানিককাকা কিছু লিখতে লিখতে অথবা স্কেচ করতে করতে গল্প করতেন। এমন আড্ডা প্রচুর হয়েছে। আমার খুব ভাল লাগত ওঁর সঙ্গে ওই আড্ডাগুলো।

'অরণ্যের দিনরাত্রি' আর 'জনঅরণ্য' দুটো ছবিতেই গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্স ছিল আমার। আমি ঠাট্টা করে বলতাম, "তুমি তো আমাকে শুধু স্টেপনি হিসেবেই ব্যবহার করো!" অথচ 'জনঅরণ্য'-র চিত্রনাট্য লেখার সময়ে আমার সঙ্গে উনি স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলোচনা করতেন। আমার খুব আশ্চর্য লাগত! মানিককাকা তো আমার বাবার চেয়েও বয়সে কয়েক মাসের বড়। কিন্তু আমার সঙ্গে সিরিয়াসলি আলোচনা করতেন চিত্রনাট্য নিয়ে। শেষ দৃশ্যে বন্ধুর বোনকে গণিকাবৃত্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে সোমনাথ, এটা বোধহয় ওঁর কোথাও বাধছিল। সেকথা বলেওছিলেন আমাকে। তারপর কিছুদিন বাদে আবার ফোন। "পেয়ে গেছি সমাধান!" উনি যে আমার কাছে সমাধান খুঁজছিলেন, একেবারেই তা নয়। ওঁকে সমাধান বাতলে দেওয়ার দুঃসাহস আমার ছিল না, সে প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু আমার ভালো লেগেছিল এটাই, যে, ওই অসমবয়সি বন্ধুত্বকেও উনি অতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

এরপর যখন 'পিকু'-তে অভিনয় করছি টেলিভিশনের জন্য, তখন আমার প্রথম ছবি '৩৬ চৌরঙ্গী লেন'-এর চিত্রনাট্য উনি পড়েছেন। উনিই আমাকে বলেছিলেন, "শশী কাপুরের কাছে যা তুই।" শশী কাপুর প্রযোজনা করেছিলেন আমার ছবিটা। ছবিটা দেখে খুশি হয়েছিলেন মানিককাকা। প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ছবিটা উনি সম্পাদনা করে দিতে পারেন আমি চাইলে। হয়তো আমাদের এডিটটা ওঁর খুব মনমতো হয়নি। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত ওঁকে দিয়ে এডিট করাইনি। করালে হয়তো আরও ভালো হত ছবিটা, কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, ওঁকে দিয়ে এডিট করানোটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারণ, আমার যদি পছন্দ না হয়, ওঁকে বলব কী করে? সেই দুঃসাহস আমার ছিল না। আমি ওঁকে ছবিটার মিউজিক করতে বলেছিলাম অবশ্য। কিন্তু তখন উনি সন্দীপের ছবির মিউজিক নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, ফলে করে উঠতে পারেননি।

বাবা, অর্থাৎ চিদানন্দ দাশগুপ্ত, মানিককাকা, এঁরা ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টটা পরিচালনা করার ফলে একটা সচেতনতা তৈরি হয়েছিল ভাল সিনেমা সম্পর্কে। মানিককাকার প্রথম থেকেই ছবি দেখার শখ ছিল। বাবা আর মানিককাকা মিলে বোধহয় ডেভিড লিনের 'ব্রিফ এনকাউন্টার' ছবিটা বারো বার দেখেছিলেন। ওইভাবেই হয়তো মানিককাকা নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন পরিচালক হওয়ার জন্য। আর এই ফিল্ম সোসাইটির মাধ্যমে মানিককাকা হলিউড ছাড়াও সারা পৃথিবীর ছবি দেখার সুযোগ পেলেন। তারপর যা হল, সে তো ইতিহাস। ডি সিকা-র 'বাইসাইকেল থিভস' থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সৃষ্টি হল সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী'। ভারত জায়গা করে নিল বিশ্ব চলচ্চিত্রের মানচিত্রে।

More Articles

;