মোৎজার্ট অন্ত প্রাণ, বেঠোফেনকে নিয়ে ছবি করতে চাইতেন সত্যজিৎ রায়

Satyajit Ray as Music Director: সত্যজিৎ রায়, তাঁর চলচ্চিত্রের সংগীতের ব্যবহারে কিন্তু পাশ্চাত্যকে পাশ্চাত্য হিসেবে রাখলেন না আর।

Debojyoti Mishra
৩ মিনিট
মোৎজার্ট অন্ত প্রাণ, বেঠোফেনকে নিয়ে ছবি করতে চাইতেন সত্যজিৎ রায়

প্রথমেই বলব, আমি খুব গভীরভাবে সত্যজিৎ রায়ের সংগীত-অনুরাগী। খুব ছোটবেলা থেকেই সত্যজিতের সংগীত তো আমাদের কানে আসছে, বিশেষত 'গুপী গাইন বাঘা বাইন'-এর জন্য। যে বয়সে 'গুপী গাইন বাঘা বাইন'-এর গান শুনেছি, তখন গানগুলো যে ওঁরই লেখা, ওঁরই সুর করা, এতকিছু জানতাম না। এটা আমি আমার ছোটবেলার কথা বলছি। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাহিত হয়েছে এই শ্রুতি। আজ যে আঠারো, তার ছোটবেলা, যে চল্লিশের দোরগোড়ায়, তার ছোটবেলা, যে পঞ্চাশ বা ষাটের কোঠায়, তারও ছোটবেলা কেটেছে দুটো চলচ্চিত্রের সংগীত শুনে। এক, 'গুপী গাইন বাঘা বাইন', দুই, ফেলুদা। ফেলুদাতে কোনও গান ছিল না। কিন্তু ফেলুদার সংগীত সকলকে খুব মুগ্ধ করেছিল, আলোড়িত করেছিল। খুব নতুন মনে হয়েছিল তা সকলের কাছে। 'গুগাবাবা'-র গানও ভীষণভাবে মোহিত করে রেখেছিল ছোট-বড় সকলকে। সেসময় তো ভিডিও বা ভিএইচএস-এ দেখেনি মানুষ ছবিগুলো, সিনেমা হলেই দেখেছে। তার অভিঘাত ছিল আরও বেশি। সেই মুগ্ধতা আমারও ছিল, এবং তা আজও অটুট রয়ে গেছে।

এর মাঝে একটা ঘটনা ঘটল। আমি পেশাদার সংগীতশিল্পী হলাম, এবং ডাক পেলাম ভায়োলিনিস্ট হিসেবে 'ঘরে বাইরে'-তে বাজানোর জন্য। 'ঘরে বাইরে'-র ফ্লোরে একটা বিশেষ মুহূর্ত আমাকে একেবারে বিস্ময়কর একটা জায়গায় নিয়ে গেল, যে বিস্ময় আমার এখনও রয়ে গেছে। যখন বিমলা অন্দরমহল থেকে বাহিরমহলে আসছে, তখন আমরা 'এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ'-এর একটা বিশেষ সাংগীতিক অর্কেস্ট্রেশন শুনলাম। আমার কাছে যা খুব আশ্চর্যের, তা হল, একটা সেতারে কত অল্প মিড় দিয়ে বাজানো হচ্ছে মেলোডিটা, এবং তার সঙ্গে ভিয়োলা, ভায়োলিন, চেলো- এগুলো যেন এই সাংগীতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করছে এই সুরকে। এটা অকল্পনীয় সুন্দর তো বটেই, একই সঙ্গে যা বলার, এটা সম্পূর্ণ নতুন। রবীন্দ্রনাথের গানকে অন্যরকমভাবে দেখার পাঠ দিয়েছিল আমাকে সেই মূর্চ্ছনা।

এরপর 'চারুলতা' দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করি, সেখানেও তিনি এমন একটা বিষয় ঘটিয়েছিলেন। সেখানে 'মম চিত্তে' গানটাকে ধীর লয়ে ভূপতির বেদনার আবহে ব্যবহার করেছেন, এবং একটা অর্কেস্ট্রেশন করেছেন। যার কাঠামো-টা ভীষণভাবে ইউরোপীয়।

এখন এই ইউরোপীয় কাঠামো তিনি কীভাবে পেলেন? আমার মনে হয়, পাশ্চাত্য সংগীত পাশ্চাত্যের নিরিখেই আমাদের দেশে বহু বছর আগে এসেছে। ঠাকুর পরিবারে যেমন এসেছে। রবীন্দ্রনাথের ভেতরেও বিশ্বভুবনের ধারণার মধ্যে মিশে গিয়েছিল পাশ্চাত্যের সেই সাংগীতিক চলাচল। কিন্তু সত্যজিৎ রায়, তাঁর চলচ্চিত্রের সংগীতের ব্যবহারে কিন্তু পাশ্চাত্যকে পাশ্চাত্য হিসেবে রাখলেন না আর। সত্যজিতের দেখায় এক নতুন পাশ্চাত্যকে আমরা ওঁর মিউজিক্যাল ফর্মের মধ্যে পেলাম। ফেলুদাতে পেলাম, 'ঘরে বাইরে'-তে পেলাম। বিশেষত আমার মনে পড়ে, 'মণিহারা'-তে উনি যেভাবে 'বাজে করুণ সুরে' ব্যবহার করলেন। সিংঘেন্দ্র মধ্যম রাগের নোটসগুলোকে খুব ভৌতিকভাবে ব্যবহার করতে পারাটা একটা অবিশ্বাস্য কাজ ছিল। বাঁশিতে সেই মোটিফটা বারবার ফিরে এসেছে। বা 'তিন কন্যা'-য় 'সমাপ্তি'-তে যে সাংগীতিক প্রয়োগ, যে কম্পোজিশন, যে অ্যারেঞ্জমেন্ট- তা অসাধারণ।

সত্যজিতের চলচ্চিত্রের সংগীতে যেমন কম্পোজিশনের সৌন্দর্য পাওয়া যায়, তেমনই ছবিকে যে আলাদা দ্যোতনা দেয় এই সংগীত, তাও বোঝা যায়। 'ঘরে বাইরে'-পরবর্তী সময়ে যখন তিনি শারীরিক কারণে সেটের মধ্যে ছবি করছেন, অনেক ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তা পূরণ করতে পারছেন না, তখনও কিন্তু ওঁর সংগীতের প্রয়োগ মুগ্ধ করে। 'গণশত্রু', 'শাখাপ্রশাখা' বা 'আগন্তুক'-এর সংগীতের নেপথ্যে যে ভাবনা, তা অনবদ্য! আমার মনে হয়, সাংগীতিকভাবে সত্যজিৎ সবসময় পরিণত হতে থেকেছেন। 'শাখাপ্রশাখা'-তে যেমন সরাসরি সত্যজিৎ ফিরে যান বেঠোফেনের কাছে, বাখের কাছে, গ্রেগরিয়ান চান্ট-এর কাছে। মোৎজার্ট ওঁর অসম্ভব প্রিয় ছিল। বেঠোফেনের ওপর উনি ছবি করতে চেয়েছিলেন।

ফলে, আমার মনে হয়, সত্যজিতের সিনেমার ভাষা নিয়ে যে চর্চা হয়, তা ওঁর সংগীত নিয়ে ততটা হয় না। চলচ্চিত্র এসেনশিয়ালি পশ্চিমের শিল্প আঙ্গিক। কিন্তু ভারতীয় চলচ্চিত্রের যে অভিষেক ওঁর হাত ধরে ঘটেছে, তা নিয়ে কথা বলতেই হবে। কিন্তু ওঁর সংগীত নিয়ে কথা হয়েছে অনেক কম। অথচ, ওয়েস অ্যান্ডারসন তাঁর 'দ্য দার্জিলিং লিমিটেড' ছবির জন্য সত্যজিতের ছবির সংগীতের কপিরাইট নিয়েছেন এবং সমগ্র ছবিতে তা ব্যবহার করেছেন।

'পথের পাঁচালী'-ও, আমার মতে, যতটা রবিশঙ্করের, তার কিছুটা সত্যজিতেরও। যে বাঁশির সুর আমরা ওই ছবিতে শুনেছি, সেই অলংকারবর্জিত বাঁশি, যে গ্রামবাংলাকে আমাদের চিনিয়েছে, তা আমরা আগে দেখিনি। কাজেই সত্যজিৎ রায় এক্ষেত্রে নতুন এক পথের দিশারী। আজ শতবর্ষ পেরিয়ে তাই, নিজে একজন সংগীতকার হিসেবে সত্যজিৎকে আমি স্মরণ করব একজন শিক্ষক হিসেবে। চলচ্চিত্রে সংগীত কেমনভাবে করতে হয়, তা তিনিই আমাদের শিখিয়েছেন।

লিখেছেন
Debojyoti Mishra
Debojyoti Mishra
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।