বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর কথা সেদিন নস্যাৎ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়

Jagannath Basu
৩ মিনিট
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর কথা সেদিন নস্যাৎ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়

১৯৭৪ সালে 'সেপ্টোপাসের খিদে' যখন বেতার নাটক হিসেবে করব ঠিক করলাম, তখন একটা নাট্যরূপ দিয়ে চুক্তিপত্রসমেত পাঠাই সত্যজিৎ রায়কে। সেই চুক্তিপত্র আর খসড়া নাট্যরূপ পত্রপাঠ ফেরত দেন। সঙ্গে নিজের দেওয়া আরেকটা নাট্যরূপ, চুক্তিপত্রে উজ্জ্বল ওঁর সই। সংলাপ তো বটেই, সাউন্ড এফেক্টও উনি ধ‍রিয়ে দিয়েছিলেন সেই চিত্রনাট্যে। সেগুলো সম্পর্কে কিছু সংশয় থাকায় ওঁকে যোগাযোগ করি। তখন 'জনঅরণ্য'-র শুটিং চলছে। আমাকে বললেন, ঠিক পনেরো মিনিট সময় দিতে পারবেন, সন্ধে ছ'টায় যেতে হবে। আমি গেলাম ওঁর বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে। সেই পনেরো মিনিট দাঁড়াল গিয়ে চার ঘণ্টায়। আমার জীবনের একটা স্মরণীয় সন্ধে হয়ে থাকবে সেই দিনটা। সেইদিন আমি যা আহরণ করেছি, তা আজও ভাঙিয়ে খাচ্ছি।

সত্যজিৎ রায়ের এই গল্প, 'সেপ্টোপাসের খিদে', একটি মাংসাশী গাছ নিয়ে। বিপজ্জনক এই গাছটিকে ঘিরে যে রহস্য-রোমাঞ্চের উপাদান ছিল গল্পে, রেডিওতে তা ভাল খাপ খাবে বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু অডিওতে ওই গল্পের রূপায়ণ কীভাবে হতে পারে, সেই বিষয়ে আমার কাছে এক নতুন দৃষ্টিকোণ উন্মোচন করলেন সত্যজিৎ রায়। কোন শব্দের অভিঘাত কেমন হবে, কোথায় চাবুকের শব্দ ব্যবহার হবে, কোথায় পোষ্য কুকুরের চিৎকার, সেইসব ওঁর মাথায় ছিল মাপা। আমার উৎসাহ-উদ্দীপনা তো ছিলই, একই সঙ্গে ওঁর তাড়নায় তাই পনেরো মিনিটটা অনায়াসে গোটা সন্ধেয় পর্যবসিত হল। আর আপনি থেকে উনি নেমে এলেন তুমি-তে।

অভিনয়ের জন্য জরুরি যে পজ, সেটা আমি ওঁর কাছে সেদিন শিখি। চিত্রনাট্যে পরপর সংলাপ লেখা মানেই তো এমন নয় যে সেই সংলাপগুলো পরপর বলে দিতে হবে। আমাদের জীবনে আমরা কত সময় একটা কথা বলতে বলতে চুপ করে যাই হয়তো, পরে আবার বলি। জীবন যেরকম, উনি তো তেমনটাই নিয়ে এসেছেন ওঁর ছবিতে। অডিওর ক্ষেত্রেও কিন্তু উনি সেটাই বজায় রাখলেন। সেপ্টোপাস আস্তে আস্তে কীটপতঙ্গ ছেড়ে মানুষ খাওয়ার দিকে এগোচ্ছে। এই সময় কান্তিবাবুর সংলাপে পজ কীভাবে নিতে বলেছিলেন সত্যজিৎ, তার একটা উদাহরণ দিই।

'আচ্ছা পরিমল, (পজ) পনেরো বছর আগে (পজ) আসামের জঙ্গলে তুমি একটা বন্দুক ব্যবহার করেছিলে, (পজ) বন্দুকটা আছে এখনও?'

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মোৎজার্ট অন্ত প্রাণ, বেঠোফেনকে নিয়ে ছবি করতে চাইতেন সত্যজিৎ রায়

Satyajit Ray as Music Director: সত্যজিৎ রায়, তাঁর চলচ্চিত্রের সংগীতের ব্যবহারে কিন্তু পাশ্চাত্যকে পাশ্চাত্য হিসেবে রাখলেন না আর।

'হ্যাঁ, কেন বলুন তো?'

'টোটা? (পজ) আছে?'

'কেন বলুন তো?'

'বলা যায় না, (পজ) কাজে লাগতে পারে!'

আমি বললাম, "বীরেনদা (বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র) বলেন, নাটকের মধ্যে যদি এত পজ নেওয়া যায়, তাহলে শ্রোতা ভুল ভাবতে পারে যে, রেডিও যন্ত্রটা বুঝি খারাপ হয়ে গেছে!"

"কে তোমাকে বলেছে একথা? এগুলো অ্যাক্টিং পজ! বিবিসি-র নাটক শোনোনি?" উত্তেজিত হয়ে বললেন সত্যজিৎ।

খুব খুশি হয়েছিলেন প্রমোদ গঙ্গোপাধ্যায়কে নেওয়ার বিষয়ে। আবার জয়ন্ত চৌধুরী অভিনয় করবেন এই নাটকে, শুনে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন একবার, ন্যাচারাল অভিনয়টা আবার অতি ন্যাচারাল হয়ে যাবে না তো? আসলে ওঁর মধ্যে সম্পাদনার বোধটা ছিল তীব্র, কতটা রাখব, কতটা রাখব না, এটা খুবই ভাল বুঝতেন। অভিনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সেটা কাজ করত। সেজন্যই 'বাক্স রহস্য' বেতার নাটক করার সময় বিকাশ রায়কে নিলেন অভিনয়ে, কিন্তু সিনেমায় বিকাশ রায়কে দিয়ে উনি অভিনয় করাননি কিন্তু।

'অশনি সংকেত'-এর শুটিংয়ে গিয়েছিলাম আমি, আমার ভগ্নিপতি সুবীর গুহ 'জনঅরণ্য'-র প্রযোজক ছিলেন। সব মিলিয়ে ওঁর সঙ্গে আমার বেশ হৃদ্যতা হয়ে গিয়েছিল। পাপিয়া চক্রবর্তী 'রয়েল বেঙ্গল রহস্য' নিয়ে নাটক করবেন, গৌতম চক্রবর্তী ফেলুদা হবেন। কারও সাহস নেই গিয়ে কনট্র্যাক্ট সই করাবে। আমিই গেলাম। আমাকে বললেন, "টেলিভিশন হলে কিন্তু অনুমতি দিতাম না, রেডিও বলেই দিচ্ছি, আর তুমি বলছ বলে।" খুবই খোলামেলা মানুষ ছিলেন সত্যজিৎ। আমি তাই একবার শম্ভু মিত্রকে পর্যন্ত বলেছিলাম, "আপনার থেকে সত্যজিৎ রায়ের কাছে যাওয়া সোজা।" শম্ভু মিত্রর সাক্ষাৎকার কেউ নিতে চাইলে, সে সাক্ষাৎকার নেওয়ার যোগ্য কি না প্রমাণ করতে তাকে আরেকটা সাক্ষাৎকার দিতে হত। সত্যজিৎ কিন্তু ছিলেন স্পষ্টবাদী ও সাদামাটা মানুষ।

লিখেছেন
Jagannath Basu
Jagannath Basu
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মাছ-ভাত খেয়ে দেবী বরণ আর কী কী বিশেষ রীতি পালন করা হয় ২২০ বছরের রাজকৃষ্ণ মিত্র বাড়ির দুর্গাপুজোয়?

Rajkrishna Mitra House Durga Puja: দর্জিপাড়ার রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোতে ২২০ বছর ধরে একই রীতি মেনে পুজো হয়ে আসছে। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, দেবীর ভোগ, নৈবেদ্য, পারিবারিক খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দশমীর বরণ; প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নিজস্ব কিছু নিয়ম। যার মধ্যে অন্যতম, দশমীর দিন মাছ-ভাত খেয়ে দেবীকে বরণ করেন বাড়ির মহিলারা। আবার যে পুজোয় একসময় বলির রীতি ছিল, সেই পুজোতেই এখন বলির পরিবর্তে দেওয়া হয় চিনির নৈবেদ্য।

ইস্টবেঙ্গলের জয়ে কোমা ভেঙে চোখ মেলেছিলেন শচীনকর্তা

S D Burman's love for East Bengal: শচীনকর্তার একমাত্র পুত্র ‘পঞ্চম’ বাবার কানের কাছে চিৎকার করে উঠলেন— “বাবা… ইস্টবেঙ্গল জিতসে… পাঁচ-শূন্য!” আর তারপরই ... যে মানুষটি নির্জীব পড়েছিলেন, যাঁর স্নায়ু কোনো ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না—তাঁর চোখের কোণ সামান্য কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে শচীনকর্তা তাঁর অক্ষিপট মেলে তাকালে। ব্যাস, ওইটুকুই। এর পর আর কোনোদিন তিনি চোখ খোলেননি।

যে দুর্গাপুজোয় সাধারণের প্রবেশ ছিল নিষেধ, সেখান থেকেই যেভাবে হলো সর্বজনীন পুজোর শুরু

history of Durga Puja in Kolkata: ব্রিটিশ কলকাতায় সেই পুজোর ধরন বদলাতে শুরু করল; বদলাল গেট-টুগেদারের ধরনও। আর কলকাতার দুর্গাপুজো আদতে হয়ে উঠল কোম্পানির পুজো। মানে কোম্পানির লোকেদের তোয়াজের জন্য করা পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান। সেই পুজোর থেকে ইংরেজদের মনোরঞ্জন করা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।

প্রেমে, ঈর্ষায়, ভ্রমণে মারিয়া কোদামার চোখে কেমন ছিলেন বোর্হেস?

Jorge Luis Borges: ২০১৯ সালে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে লেখকের বিধবা স্ত্রী মারিয়া কোদামা তাঁদের অনন্য সম্পর্ক ও একান্ত যাপনের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। মারিয়া কোদামা মৃত্যুবরণ করেন ২০২৩ সালের ২৬ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন পাবলো হিয়েনেরা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৯ সালে, পরে লা নাসিয়ন (La Nacion) পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন স্প্যানিশ সাহিত্য ও বোর্হেসবিশেষজ্ঞ কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন।

এনসিইআরটি-র নতুন ইতিহাসের বই হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চাকে নতুন জায়গা করে দিচ্ছে?

NCERT Class 9 Book controversy: নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বই 'আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি'-র 'রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স' অধ্যায়ে সপ্তম শতক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আরব, তুর্কি, মুঘল ও ইউরোপীয় আক্রমণের ধারাবাহিকতা, ধর্মীয় উদ্দেশ্য ও হিন্দু রাজাদের দেবী-প্রদত্ত তলোয়ারের উল্লেখ রয়েছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাঠ-শিখ-রাজপুত-অহোম প্রতিরোধের বর্ণনা। হিন্দুত্ববাদী লেখক জে. সাই দীপকের 'মধ্যপ্রাচ্যের ঔপনিবেশিকতা'র ধারণা ও হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদ মীনাক্ষী জৈনের গবেষণার ছায়ায়, এভাবেই তৈরি হচ্ছে নতুন সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চার পরিসর।

‘গ্রাহক পঞ্চায়েত’-এর সভায় ছুরি কোথা থেকে এল?

SRFTI Kolkata clash: সমাজমাধ্যমে যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে, তা লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে—এক ব্যক্তি হঠাৎ পিছন থেকে এসে এক শিক্ষার্থীকে সজোরে লাথি মারছে। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেও পিছনের দেওয়ালে ভারতমাতা ও স্বামী বিবেকানন্দের ছবি দেওয়া ব্যানারটি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ঝুলছিল। অর্থাৎ, যে ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগকে সামনে এনে এত প্রচার চালানো হচ্ছে, তখনো পর্যন্ত সেই ব্যানারে কোনো আঁচড়ও পড়েনি।

চার-পাঁচ বছর নিয়েছিল তৃণমূল, বিজেপি মাত্র চারমাস

SRFTI incident: গোটা দেশে যখন মানুষের বিজেপির প্রতি মোহভঙ্গ ঘটতে শুরু করেছে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এল। অথচ একসময় গর্বের সঙ্গে বলা হতো—“হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো।” আজ তা যেন উল্টে গিয়েছে।

মাতঙ্গিনী হাজরা ও তমলুকের বিদ্রোহ: এক বৃদ্ধার মৃত্যু যেভাবে বদলে দিয়েছিল আন্দোলনের গতিপথ

Matangini Hazra death: ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২। তমলুক শহরের দিকে পাঁচ দিক থেকে ধেয়ে এল জনতার উত্তাল মিছিল। সরকারি দপ্তর ঘিরে ফেলতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষের এক বিরাট বাহিনী এগিয়ে আসছিল শহরের উত্তর দিক থেকে—ফৌজদারি আদালতের পথ ধরে। আর সেই বাহিনীর পুরোভাগে ছিলেন প্রায় বাহাত্তর বছর বয়সি মাতঙ্গিনী হাজরা।