আমফান, বুলবুল অথবা মোকা, কেন বারবার বঙ্গোপসাগরেই জন্ম নেয় মারণ ঘূর্ণিঝড়

Cyclone at Bay of Bengal : আমফান, বুলবুল অথবা মোকা, কেন বারবার বঙ্গোপসাগরেই তৈরি হয় বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়গুলি?

inscript
৩ মিনিট
আমফান, বুলবুল অথবা মোকা, কেন বারবার বঙ্গোপসাগরেই জন্ম নেয় মারণ ঘূর্ণিঝড়

শেষ কয়েক বছরের মে মাস মনে করুন, একের পর এক ঝড়ের নাম আসবে ফ্ল্যাশব্যাকে। আজকের মোকা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বুলবুল, ইয়াশ, আমফানদের তালিকায় কেবল একটা নতুন সংযোজন মাত্র। প্রসঙ্গত, গতকালই মায়ানমারের সিতওয়া উপকূলে আছড়ে পড়ে সুপার সাইক্লোন ‘মোকা’। ঝড়ের দাপটে শুরু হয় তছনছ প্রক্রিয়া। ল্যান্ডফলের সময় মোকার সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১০ কিলোমিটার। মায়ানমার ছাড়াও বাংলাদেশের একাধিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছে সুপার সাইক্লোন মোকা। একইভাবে এর আগে বাংলাদেশ সহ এপার বাংলার দক্ষিণবঙ্গেও প্রবল আঘাত হেনেছিল অন্যান্য ঘূর্ণিঝড়গুলি। ইয়াশ, আমফান অথবা বুলবুলের সেই ঘা আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন উপকূলবাসী।

কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করে দেখেছেন কি, এই যে ঘূর্ণিঝড়গুলি বছর বছর ধেয়ে আসছে সেগুলির বেশিরভাগই সংঘটিত হয় বঙ্গোপসাগরে। কিন্তু এর কারণ কী? কেন বেশিরভাগ ঘূর্ণিঝড়ের টার্গেট হতে হয় এই অঞ্চলকে? প্রশ্নগুলোর উত্তরে ঐতিহাসিক সুনিল অমৃতের বঙ্গোপসাগরকে নিয়ে একটি বর্ণনা খুবই প্রাসঙ্গিক। বর্ণনাটি খানিক এই রকম, বঙ্গোপসাগর মানেই এক বিস্তীর্ণ জলরাশি, যা জানুয়ারিতে একেবারে শান্ত এবং নীল‌; আর গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে এটির রূপ একেবারে ভিন্ন। যেন ফুঁসতে থাকা ঘোলা জলের সমূদ্র।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মোকা-পর্ব শেষ! জানেন পরের ঘূর্ণিঝড়ের নাম হতে চলেছে কী?

Name of Next Cyclone: ঘূর্ণিঝড়ের প্রস্তাবিত নাম রাজনীতি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং লিঙ্গ নিরপেক্ষ হওয়া উচিত।

মূলত ভারত মহাসাগরের উত্তর অংশ, আরব সাগরের একটি বড় অংশ এবং বঙ্গোপসাগরে কোনও ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি শুরু হলে তার দিকে কড়া নজর রাখে ইন্ডিয়ান মেটেরোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট। সেই মতো প্রস্তুত করা হয়েছে নামের একটি তালিকাও। ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, পাকিস্তান, মলদ্বীপ, ওমান, শ্রীলঙ্কা, তাইল্যান্ড, ইরান, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইয়েমেন এই ১৩টি দেশের দেওয়া ১৩টি করে নাম নিয়ে প্রস্তুত হয়েছে তালিকা। আয়লা, আমফান, বুলবুল, হুদহুদ, ফণী, অশনি, এমনকী আজকের এই মোকা - এই সবকটি নামই এসেছে ওই তালিকা থেকে।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, উপরে উল্লিখিত এই বিশেষ বিশেষ বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়গুলির মধ্যে সিংহভাগই বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট। আবহাওয়াবিদদের মতে, সামুদ্রিক জলোচ্ছাস সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ নেয় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবেই। আর এই জলোচ্ছ্বাস সবচেয়ে প্রবল হয়ে উঠে অবতল আকৃতির অগভীর উপসাগরে। মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ের তীব্র বাতাস যখন এরকম জায়গায় সাগরের জলে ঠেলা দিতে থাকে, তখন ফানেল বা চোঙার মধ্যে তরল যে আচরণ করে, এখানেও ঠিক তাই ঘটে। সাগরের ফুঁসে উঠা জল চোঙা বরাবর ছুটতে থাকে। আর এই ভৌগলিক রূপের উপযুক্ত উদাহরণ হচ্ছে বঙ্গোপসাগর।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মনে করাচ্ছে আমফান, ঠিক কোথায় কতটা তাণ্ডব চালালো মোকা?

Cyclone Mocha : ঠিক কোথায় কোথায় তাণ্ডব চালাল প্রবল শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় মোকা? পরিস্থিতি এখন কেমন?

উত্তর ভারত মহাসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের মূল তফাৎ হল উষ্ণতার। আর এটাই অধিক ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃত কারণ। জলোচ্ছ্বাস সংক্রান্ত কারণের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে অতিরিক্ত যুক্ত হয় বাড়তি কিছু বৈশিষ্ট্য। যার মধ্যে অন্যতম হল সমুদ্রের উপরিতল বা সারফেসের তাপমাত্রা। আবহাওয়া দফতরের এক অধ্যাপক ডি মহাপাত্র জানান, এটাই পরিস্থিতিকে আরও বিপদজনক করে তোলার জন্য দায়ী। যেহেতু, বঙ্গোপসাগর অন্যান্য সাগরের তুলনায় বেশি উষ্ণতা ধারণ করে তাই এই সমুদ্রের বাতাসে জমা হয় প্রচুর পরিমাণ জলীয় বাষ্প। ক্রমাগত বৃষ্টিপাত এই আর্দ্রতাকে ধরে রাখে। ফলে নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় এবং ঘূর্ণিঝড় থেকে মহাঘূর্ণিঝড় অথবা সাইক্লোনে পরিণত হতে বেশি সময় লাগে না এই সমুদ্রে। পাশাপাশি, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রকোপও এখানে মারাত্মক আঘাত হেনেছে, যার জেরে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা বেড়েছে বঙ্গোপসাগরের।

উল্লেখ্য যে, ‘ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড‌’ নামের একটি ওয়েবসাইটে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ৩৬টি মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ের তালিকা রয়েছে। এই তালিকার মধ্যে ২৬টি ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তিস্থলই হল বঙ্গোপসাগর। এই সমস্ত ঘূর্ণিঝড়গুলির ক্ষয়ক্ষতির হিসেবের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। তারপরেই আসে মায়ানমার এবং পশ্চিমবঙ্গের নাম। গত ২০০ বছরে পৃথিবীর ৪২ শতাংশ ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় তাণ্ডব চালিয়েছে বাংলাদেশে। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২০ লাখ মানুষ। ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের ভোলায় যে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল, সেটি এখনও পর্যন্ত বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড়। মারা যান প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ। যদিও এই মনুষ্যকুলের উপর ক্ষতির পরিমাণের আরও একটি বড় কারণ হল অন্যান্য সাগরের তুলনায় বঙ্গোপসাগর উপকূলেই পৃথিবীর সবথেকে বেশি মানুষ বসবাস করেন। আবহাওয়াবিদরাও তাই মনে করেন, বিশ্বের আর যে কোনও উপকূলের চাইতে বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে এই ধরনের জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি সর্বাধিক।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?