রাশভারী ব‍্যক্তিত্ব, এদিকে মুখে অনর্গল অশ্লীল কথা? কাঁচা খিস্তির ক্লাস নিতেন কমল মিত্র ও বিকাশ রায়

প্রথম দিনেই চমক। এ তো যে সে ক্লাস নয়! প্রথম পাঠ শেখাচ্ছেন কমল মিত্র—বাংলা ভাষায় খিস্তি ঠিক কত ধরনের। শুধু খিস্তি না, কাঁচা খিস্তি।

Sindhu Som
৪ মিনিট
রাশভারী ব‍্যক্তিত্ব, এদিকে মুখে অনর্গল অশ্লীল কথা? কাঁচা খিস্তির ক্লাস নিতেন কমল মিত্র ও বিকাশ রায়

জীবনে অনেক অদ্ভুত ঘটনাই ঘটে। কত চরিত্র, কত ওঠানামা, বোঝাপড়া… কত তাদের রহস্য— এমন হাজারো উপাদান দিয়েই তো জীবন। তবে তারই মাঝে এক বিশ্বাসঘাতক লুকিয়ে রয়েছে। প্রায়শই ঠকে যেতে হয় সেই ঠাঁইয়ে। বড় বেশি ভরসা করা হয় বলেই সে আরও পেয়ে বসে। ভাবছেন কী? আমাদের দু'টি চোখ। ঘটনা হোক, চরিত্র হোক- এক নজর দেখে নিয়েই সে মেপে ফেলতে চায়। আর তাতেই যত ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত। পরে মনের সংস্পর্শে সে চরিত্র এলে মন বলে কই, এমনটা তো নয়। ব্যস! চোখে আর মনে নারদ নারদ। এর মাঝখানে ভোম্বল হয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। বাংলা ছবির কথাটাই ধরুন। বাইরে তার কত জৌলুস! বড় বড় তারকা, বিলাসী জীবনযাপন, বিভিন্ন লোকেশনে শুটিং, পাঁচতারা হোটেলে মোচ্ছব— চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কিন্তু এর অন্তরালে দৃষ্টি যায় না। একটি ছবি তৈরি যে কী পরিমাণ খাটনির কাজ, তা একমাত্র যারা ছবির সঙ্গে জড়িত তাঁরাই বোঝেন। তবে দিনশেষে পাওনার মাপটা বড় লোভনীয়, তাই সারাদিনের ক্লান্তি অতটা গায়ে লাগে না। আর্টের তৃপ্তি, সৃষ্টির উত্তেজনা, লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালবাসা- শিল্পীর কাছে এই তো সব। আবার এই হাড়ভাঙা খাটনির মধ্যেও গড়ে ওঠে পারিবারিক সম্পর্ক, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা, রাগ, ঘৃণা, ঈর্ষা। বাস্তব জগতের সমান্তরাল এই পরিসরে জন্ম নেয় কতশত গল্প। চেনা মানুষ বলে যাদের মনে হয়েছে এতকাল, দেখা যায় তাদের পর্দায় ফুটিয়ে তোলা চরিত্রগুলি আমরা চিনি মাত্র।

কমল মিত্র এমনই চরিত্র। রাশভারী জমিদার, অত্যাচারী, মেজাজি… অথবা গম্ভীর পিতার চরিত্র, কখনও খলনায়ক- এই রূপেই মোটামুটি আমরা তাঁকে চিনি। কিন্তু তাঁর যে 'পাড়ার দাদা' গোছের আরেকটি মূর্তি ছিল, তার খবর রাখে কতজন! আজ সে কথাই বলব।

কানন দেবী যখন নিউ থিয়েটার্সে কাজ করতেন, সেসময় থেকেই নিজের একটি প্রযোজনা সংস্থা খোলার ইচ্ছে তাঁর ছিল। শেষ অবধি সে রূপ পেল, 'শ্রীমতী পিকচার্স'-এ। নিউ থিয়েটার্সের পিএন রায় কানন দেবীকে ডাকতেন 'শ্রীমতী' নামে। তার থেকেই নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থার নাম রাখলেন, 'শ্রীমতী পিকচার্স'। স্বামী ভট্টাচার্যসাহেব পরিচালক। যে সময়ের কথা, তখন শ্রীমতী পিকচার্স সবে 'নববিধান'-এর কাজ শুরু করেছে। কমল মিত্র এলেন সেই ছবিতে কাজ করতে। লম্বা দোহারা চেহারা, ভারী গলা যেন গমগম করছে, স্পষ্টবাদী, মুখের ওপর যা তা বলে দিতে পারতেন, আবার স্নেহও করতেন। অমোঘ ব্যক্তিত্ব। আর ছিল তাঁর সময়জ্ঞান, লোকে বলাবলি করত, কমলবাবুকে দেখে ঘড়ি মেলানো যায়। সেটের লোকজনের কাছে কমলদা একটু ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধাভক্তির পাত্র। সেসময় তরুণ মজুমদার শ্রীমতী পিকচার্সে বিনা বেতনে কাজ করেন। মূলত অবজার্ভার। কাজ শেখেন বলা চলে। একেবারে আম টেকশিয়ানদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা। এটা-ওটা টুকরোটাকরা কাজ করে দেন। তাঁর ওপরেই ভার পড়ল কমল মিত্রকে ডায়লগ পড়ানোর।

এই সুযোগে দু'জনের পরিচয় বন্ধুত্বে বদলে গেল। মাত্র কয়েকদিনেই কমলবাবু থেকে 'কমলদা'-তে উত্তরণ। একদিন ডেকে বললেন, "আরে! তুই তো নেহাৎ দুধু-ভাতু টাইপের দেখছি। এই ফিলিম্ লাইনে টিঁকবি কী করে? তোর ভালোর জন্যেই তোকে একটু পাকানো দরকার। মাঝে মাঝে আমার কাছে আসবি। ক্লাস নেব।" ভালো কথা। একেবারে টেনিদামার্কা নির্দেশ। ফেলার উপায় নেই। তরুণ মজুমদার মাঝে মাঝে 'ক্লাস করতে' যাওয়া শুরু করলেন। কিন্তু প্রথম দিনেই চমক। এ তো যে সে ক্লাস নয়! প্রথম পাঠ শেখাচ্ছেন কমল মিত্র—বাংলা ভাষায় খিস্তি ঠিক কত ধরনের। শুধু খিস্তি না, কাঁচা খিস্তি। সে সিলেবাসের সামনে পড়ে তরুণ মজুমদারের রীতিমতো নাকানিচোবানি অবস্থা। একে অনভ্যস্ত কান, তার ওপরে শিক্ষকের আসনে কমল মিত্র। যার মুখ দিয়ে অমন শব্দ বেরতে পারে, তা কল্পনার অতীত। কমলবাবুর অবশ্য সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। বাল্মীকির ধৈর্য নিয়ে তিন ময়দানে নেমেছেন। ছাত্রকে একেবারে শিখিয়ে-পড়িয়ে নিয়ে, তবেই ছাড়বেন। এদিকে তরুণের প্রাণ ওষ্ঠাগত। বেশিরভাগই আদিরসাত্মক, সঙ্গে নানা রকম যৌন রেফারেন্স। ছাত্র ইতস্তত করছে দেখে বললেন, "প্রথমটায় তোর এমনটা হবে, যেমন এখন হচ্ছে। পরে দেখবি কত উবগার এতে। আরে, পক্সের টিকা দেওয়া হয় পক্স আটকাবার জন্য। সেটাও তো লো ডোজে পক্সেরই জার্ম। এই যে তৈরি করে দিচ্ছি তোকে, ফিউচারে আর কোনও...-এর (একটি কাঁচা খিস্তি) সাধ্যি নেই তোর মাথাটি‌ খায়।"

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হাসপাতালের বেডে শুয়ে মিনিট পাঁচেকে 'পলাতকে'র গানে সুর দিয়েছিলেন হেমন্ত

কিছুক্ষণের মধ্যে সুর দিয়ে ফেলার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল হেমন্তের। শোনা যায় দিনে তিন চারটে গানে সুর দিতে পারতেন। প্রত্যেকটাই হিট।

সত্যিই সাধ্যি নেই। প্রথম দিনের লো ডোজেই তরুণের মাথা ভার। দিলীপ মুখার্জি, শচীন মুখার্জির সঙ্গে তখন খুব দোস্তি। কোনওরকমে 'ক্লাস' থেকে 'সটকে' এসে বন্ধুদ্বয়কে বললেন সেকথা। ও বাবা! এ তো উল্টোসুরে গায়। দু'জনেই লাফিয়ে উঠলেন, "তাই নাকি? তাহলে তো আমরাও যাব। এমন ক্লাস মিস করতে আছে?" এড়িয়ে যাবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু বন্ধুবান্ধবের উৎসাহের চোটে তরুণের পক্ষে নিয়মিত 'ক্লাস' করা ছাড়া উপায় থাকল না। এদিকে এমন মনোযোগী ছাত্র পেয়ে কমল মিত্রের সে কী উৎসাহ! পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, "শোন্, অশ্লীল কথা বলার কত উপকার তা জানিস? পেটের মধ্যে চেপে রাখিস তাহলে এসব বাজে জিনিসপত্তর ভেতরেই জমা হয়ে দিন-কে-দিন পচে ফুলে আরও 'পয়জনাস্' হয়ে উঠবে। তার থেকে মুখ দিয়ে ভুর ভুর করে বাইরে বের করে দে, বাতাসে মিশে যাক। দেখবি, ভেতরটা ফুরফুরে আর হেলদি লাগে।"

এমন কোবরেজি ব্যাখ্যা শুনে তিন ছাত্রই বাক্যহারা। বটেই তো, বটেই তো। বেশ একটা নতুন ব্যাপার শেখা গেল। কমলবাবুই নাকানিচোবানি খাওয়াচ্ছিলেন, তাঁর সঙ্গে আবার এসে জুটলেন বিকাশ রায়। এ-ব্যাপারে কমল মিত্রের স্ট্রং সাপোর্টার। বয়সে তরুণদের প্রায় দ্বিগুণ। গুরুবাক্যের চাপে ছাত্রদের খাবি খাওয়া অবস্থা। অথচ এই লোকদু'টিই আর পাঁচজনের সামনে আদ্যোপান্ত গম্ভীর, মেজাজি লোক। সকলের মাঝখানে দেখে ভুল করেও কেউ এই চেহারার কথা ভাবতে পারবে না। তবে খিস্তির ক্লাসে পাঠদান ছিল সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক। সঙ্গে ঋষিসুলভ নিরাসক্তি। 'কুবাক্য' মনে হওয়ার জো নেই। বরং তিনজনের মনে হতো, মহাপুরুষের মুখনিঃসৃত পবিত্র বাণী তাঁদের কানে সুধা ঢেলে দিচ্ছে। চারদিককে ধূপের ধোঁয়ার মতো নির্মল করে তুলছে।

টোল বেশ ভালোই চলছিল, কিন্তু কপাল মন্দ। 'নববিধান'-এর শুটিং একদিন শেষ হলো। কমল মিত্রর সেটে আসার প্রয়োজন ফুরোল। পণ্ডিতের অভাবে টোল ছত্রাখান। হতভাগ্য তিন ছাত্রের প্রাইমারি-সেকেন্ডারি পাঠ শেষ হয়েছিল বটে, কিন্তু গ্র‍্যাজুয়েশনের স্বপ্ন অধরাই রয়ে। বাংলা খিস্তির ডিগ্রিটা তাদের কপালে জুটল না।

প্রতি সেটেই এমন কিছু গল্প থাকে। আর যেহেতু তরুণ মজুমদার মাটি থেকে শুরু করেছিলেন, তাঁর জীবনের নানা ঘটনায় সেই মেঠো সুর। জীবনের আনাচকানাচ। আজ সেই ছাত্ররা বেঁচে নেই কেউ। বেঁচে নেই শিক্ষকরাও। তবু গল্প রয়ে যায়। গল্পের সেতু বেয়ে অতীতের চরিত্ররা পাশে এসে বসে, হাতে হাত রাখে, হাসিকান্নার আরও ডজন ডজন গল্পের সৃষ্টি হয়। যেদিন গল্প থেমে যাবে, জীবন বলে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।

তথ্য ঋণ:

সিনেমাপাড়া দিয়ে (দু'খণ্ড), তরুণ মজুমদার, দে'জ প্রকাশনী

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।