ব্রিটিশদের ‘বর্জ্য’! খড়গপুর রেল কলোনিতে মুছে গেছে অ্যাংলো জীবনের ঘ্রাণ

Anglo Indians of Kharagpur: খড়গপুরের অ্যাংলো বসতির মানচিত্র শুরু হয় হিজলি স্টেশন থেকেই। রেলওয়ে কলোনি ছাড়া অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা থাকত জাপাতাপুর এবং ঝোলি-তে।

পাথুরে অনাবাদি জমি আর গহিন সবুজ অরণ্যে ঘেরা ছিল হিজলি নগর। মাটিতে লবণ বেশি থাকায় চাষবাস বিশেষ হতো না। তবে ১৬৮৭ সালের এক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসাবে হিজলির নাম পাওয়া যায়। পাশের নদীর নাম রসুলপুর। তখন সেখানে তাজ খানের রাজত্ব, যিনি ছিলেন পীর মকদ্রম শাহ চিশতীর শিষ্য। এরপর এসেছিল পাল-কুশান বংশও। মুঘল ইতিহাসেও হিজলির নাম আছে। এই হিজলিকে কেন্দ্র করেই ব্রিটিশদের হাত ধরে পরবর্তীতে তৈরি হলো বৃহত্তর রেলওয়ে টাউন, খড়গপুর।

ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে রুডইয়ার্ড কিপলিং সাহেব তখন তরুণ সাংবাদিক। তিনি ঘুরছেন, গল্প খুঁজছেন রেললাইনের আশপাশ ধরে। এমন করেই একদিন তাঁর পছন্দ হলো রেললাইনের পাড়ে ছোট্ট এক শহর- জামালপুর। রেল কলোনিকে ঘিরে সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে শহর। পাশে রাস্তা, খেলার মাঠ।
তাই তিনি এর নাম দিলেন ‘পারফেক্ট ইংলিশ ভিলেজ’। সমসাময়িক সময়েই তৈরি হওয়া রেলপাড়ার শহর, খড়গপুর। রাজধানী কলকাতা থেকে ১৩৭ কিমি দূরে।

এই রেল কলোনিকে ঘিরেই ছিল বেশ কয়েক ঘর অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের বাস। কলোনি তৈরি হয়েছিল অ্যাংলো রেলকর্মী এবং ইঞ্জিন-চালকদের নিয়ে। এখানেও ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্য ছিল একই, ব্রিটেনে অভিবাসন বন্ধ করানো এবং এই বৃহত্তর রেলওয়ে স্টেশন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় এক পরিশ্রমী বাহিনী, যারা মোটামুটি ইংরেজি লেখাপড়ায় স্বচ্ছন্দ। তাদের জন্য তৈরি হয়েছিল কিছু ইংরেজি মাধ্যম স্কুলও। তাদের মাথায় ছিল ‘আদর্শ ইংল্যান্ড’-এর শৃঙ্খলার ধারণা, শোনানো হয়েছিল অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজাদের গল্প, তাদের মাতৃভাষা ছিল ইংরেজি।

আরও পড়ুন- ম্যাকল্যাস্কিগঞ্জ, অ্যাংলো স্মৃতিবেদনার এক হারিয়ে যাওয়া শহর

খড়গপুরের প্রথম দিকের অধিবাসীরা ছিল মূলত নিম্নবর্গের হিন্দু। তারা সুবিধাজনক দূরত্ব বজায় রাখত ‘ফিরিঙ্গি’-দের থেকে। লরা বেয়ার দেখিয়েছেন, এখানে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা পরিচিত ছিল ইউরেশিয়ান, ফিরিঙ্গি, রেড-ফেসড, ইস্ট-ইন্ডিয়ানস ইত্যাদি নানা নামে।

উপকথার সূত্র ধরে এগোলে খড়গপুর শহরের নামকরণ হয় ‘খড়গেশ্বর শিব’ মন্দিরের নাম থেকে। আবার অনেকে বলেন, মহাভারতের রাজা খড়গ সিং পাল তৈরি করেছিলেন এই জায়গা। আবার অন্য কিছু উপকথা অনুযায়ী, এই খড়গপুর শহরেই রাক্ষস হিড়িম্বকে হত্যা করেছিলেন ভীম। খড়গপুরের ঘন জঙ্গলে, রাক্ষসের বোন হিড়িম্বার সঙ্গে প্রেম হয় ভীমের। আবার ইসলামিক ইতিহাসে আছে হিজলির সম্রাট তাজ খানের কথা।

খড়গপুরের অ্যাংলো বসতির মানচিত্র শুরু হয় এই হিজলি স্টেশন থেকেই। রেলওয়ে কলোনি ছাড়া অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা থাকত জাপাতাপুর এবং ঝোলি-তে। তবে রেলওয়ে বসতির মতো অত সুসজ্জিত ছিল না এই জায়গাগুলি। এখানকারই এক অ্যাংলো অধিবাসীর কথায়, “রেলওয়েতে একসময় ‘অন্য ভারতীয়’-দের একচেটিয়াপনা বেড়ে যায়”। তাই ঝোলি-র অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হন তারা।

বরাবরই মিশ্র জাতির সহবাস থাকায় খড়গপুরের নগর পরিকল্পনায় এক ‘হিন্দু-ফিরিঙ্গি’ দ্বন্দ্বের আভাস পাওয়া যায়। রেলওয়ে কলোনি বা অ্যাংলো মানুষদের বসবাসের জায়গা ছিল খড়গেশ্বর শিব মন্দিরের দক্ষিণে- একেবারে শেষ প্রান্তে। যে জায়গা নির্দিষ্ট ছিল নিম্নজাত ও ‘দূষিত পেশা’-র মানুষদের। স্বাধীনতা লাভের পর এই রেলওয়ে কলোনির গা ঘেঁষেই তৈরি হলো খড়গপুর ‘ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি’। অনেকেই লিখেছেন, স্বাধীনতাউত্তর সময়পর্বে খড়গপুরে ভিন্ন ভাষা, রুচি ও জাত অনুযায়ী, অঞ্চল বিভাজন এত বেশি হয়েছে যে, সামাজিক ইতিহাসের সূত্র গুলিয়ে যাওয়ার সম্ভবনা আছে। লরা বেয়ার এই অবস্থা বোঝার জন্য ‘হেটেরোপিয়া’ তত্ত্বের ব্যবহার করেছেন। ‘হেটেরোপিয়া’ অর্থাৎ নাগরিক বা আঞ্চলিক জীবনের কিছু জীবন, বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসকে আলাদা করে নির্মাণ এবং অনুশীলন করা, যাতে সমান্তরাল সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি না হয়। কম-বেশি সব জায়গাতেই স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থেকেছিল অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা। তাই তাদের খুব বেশি জমি ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি স্বাধীন খড়গপুরের ভূমিপুত্ররা।

আরও পড়ুন- অ্যাংলো বন্ধুদের সঙ্গে টিফিন ভাগ করা ছিল মানা…

খড়গপুরের পুরনো বাসিন্দারা খুব কষ্ট করে মনে করতে পারে, রেলওয়ে কলোনির অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের কথা। “ষাটের দশকে এই রেলওয়ে নগরে যে বড় হয়েছে সেই মনে করতে পারবে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের কথা। সেই লাল মুখওয়ালা লোকগুলো, যারা সারাদিন ক্রিকেট খেলত আর প্রচুর নেশা করত। ওরা রেললাইনের ধারে বদ্ধ, অস্বাস্থ্যকর ফ্ল্যাটে থাকত। আলোবাতাস ঢুকত না ওদের বাড়িতে। গর্ব করার মতো ওদের কাছে কিছুই ছিল না। খুব খুঁজলে স্টিলের ফ্রেমে বাঁধানো ক্রিকেট ম্যাচের ছবি আর যদি কোনও দূর-বহুদূর সম্পর্কের জাতভাই সত্যিকারের সাদা মানুষদের দেশে যেতে পারত, তার গল্প।"

লরা বেয়ার তাঁর খড়গপুরের এক বন্ধুকে অ্যাংলো মেয়েদের কথা জিজ্ঞাসা করায় সে বলেছিল,

“তুমি কেন সাদা চামড়ার দেশ থেকে এসেছ, লরা? এই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের খোঁজ নিতে? আমি বলছি, এদের সম্পর্কে আসলে কিছুই জানার নেই। এই খড়গপুরেই আমার কিছু অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বান্ধবী আছে। আমাদের মধ্যে ন্যূনতম কোনও মিল নেই। তাদের সঙ্গে তোমার সবসময়ই ঝগড়া হবে শুধুমাত্র বিছানার সময় ছাড়া। তারা মুখের ওপর মিথ্যা কথা বলে। আমি নির্লিপ্ত ভাবে ‘জুলিয়াস সিজার’ বা ‘মিডসামার নাইট’স ড্রিম’ তাদের পড়ে শোনাতাম। এসব ইংরেজি সাহিত্য পড়তে গিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি থেকে বোধহয় অনেক বেশি দূরে চলে এসেছি। কিন্তু একটি অ্যাংলো মেয়েকে আমি ভুলতে পারি না”। (দ্য জাদু হাউস, ২০০০)

আবার একজন জানিয়েছিল, এখানকার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা “...মাদকাসক্ত, আর জুয়াখোর। রেলওয়ে কলোনিতে এই আধা-ইংরেজগুলো প্রায়ই অশান্তি বাঁধাত”। কিন্তু বেয়ার নিজে অ্যাংলো মেয়েদের সম্পর্কে লিখেছেন, রেলওয়ে কলোনির অ্যাংলো মেয়েরা অত্যন্ত ভদ্র ও পরিশ্রমী। তারা সবরকমের কাজই পারে। পরের দিকে তারা যৌনকর্মীর পেশায় যায়, তবে তা সত্য নাকি মৌখিক ইতিহাসের নির্মাণ, তাই নিয়ে তাঁর সন্দেহ আছে। তিনি দেখিয়েছেন, আসলে এই ক্রমাগত অপরায়ণে নির্মাণ হয় উভয়পক্ষেরই। একদিকে অ্যাংলো সমাজজীবনের এক নিকৃষ্ট চরিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে ‘পিতৃভূমি’-র ভাষা-সংস্কৃতিতে নিজের অধিকার সুস্পষ্ট করে বাঙালি গোষ্ঠী।

পিতৃভূমি?

ম্যাকলাস্কি স্যর লিখেছিলেন,

“প্রত্যেক ভারতীয়, সে যেখানেই অভিবাসিত হোক না তার কাজের সূত্রে, সর্বদা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তার ‘পিতৃভূমি’। নিজস্ব মুলুক। যেখানে আছে তার ‘স্যুইট হোম’। আমরা জন্মেছি, খেয়ে-পরে বেঁচে আছি এই ভারত ভূখণ্ডেই, কিন্তু তা কি আমাদের পিতৃভূমি?"

অটো দেভির স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, “একসময়ের আধা পরিকল্পিত খড়গপুর টাউনের ফাঁকা সবুজ পরিবেশে ক্লান্তিহীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর কথা, ক্রিসমাস উৎসব, নিউ ইয়ার বল, রেলওয়ে স্কুল, ইউনিয়ন চার্চ ও স্পোর্টস ডে-র কথা। জাপাতাপুর স্টেশন থেকে বেরিয়ে যে জায়গা হিজলি রোডের সঙ্গে মিশছে, সেই মনোরম জায়গার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘রোজ ডিয়েন’।

রোজ ডিয়েন

আরও পড়ুন- ডার্ক লিপস্টিক, ছোট স্কার্ট! অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মেয়ে মানেই যৌন উন্মাদনা?

১৯৬০ সালের পর থেকেই খড়গপুর থেকে মুছে যেতে থাকে অ্যাংলো স্মৃতি বিজড়িত এই রেলওয়ে কলোনি। স্বাধীনতার পর দ্রুত পাল্টেছিল খড়গপুরের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আবহ। গল্প, মানচিত্র ও ছবি মিলিয়ে ১৯০০-১৯৫০ সালের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কলোনির এক আদর্শ প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় ‘খড়গপুর ডায়াস্পরা ইউনাইটেড (KDU)-এর তথ্য থেকে। KDU-এর তথ্যসূত্র অনুযায়ী এর অভিবাসিত সদস্যদের স্মৃতিবেদনায় এই শহর থাকলেও, বিগত পঞ্চাশ বছরে কেউই ফিরে আসেননি, ঘুরে দেখেননি আরেকবার এই শহরকে।

অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের যে কোনও জায়গা থেকে সরে যাওয়ারই সাধারণ কারণ হলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। তাদেরকে ব্রিটিশ সমাজের ফেলে যাওয়া ‘বর্জ্য’ বলে চিহ্নিত করা, যে ব্রিটিশরা এতদিন ধরে অত্যাচার চালিয়েছে ভারতীয়দের উপর। আবার একসময়ে খড়গপুরে বাড়তে থাকে গোঁড়া হিন্দুত্ববাদ। পঞ্চাশের দশকের পর থেকেই আর তাদের জন্য সুবিধাজনক ছিল না এই শহরের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। পুরনো প্রজন্ম মেতে রইল রেলওয়ে পাড়ার ক্লাব, মিশনারি স্কুল, ক্রিসমাস রাতের স্মৃতিবেদন নিয়ে। আর নতুন প্রজন্ম বেরিয়ে আসতে চাইল ওই শহর থেকে, কাজ ও উন্নততর জীবনের আশায়। খড়গপুরের ভৌগলিক ও ধর্মীয় পরিবেশ যে ‘পারফেক্ট ইংলিশ ভিলেজ’ বানানোর জন্য একেবারেই উপযুক্ত ছিল না তা বুঝতে আধা ইংরেজি-শিক্ষিত ইঞ্জিন ড্রাইভারদের তিন প্রজন্মের বেশি সময় লাগেনি। আজ এই শহরে রয়েছে মাত্র ২০০ জন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান।

ভারতবর্ষে বসবাসকারী অন্য সম্প্রদায়ের মতো অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা কোনওদিনই গৃহঅঞ্চলকে ‘পিতৃভূমি’ বা ‘পুণ্যভূমি’ হিসাবে দেখেনি। এই অনুভব তৈরি হয় বহুযুগের একত্র বসাবাসে, ভাব-ভাবনার আদানপ্রদানে, সাংস্কৃতিক উষ্ণতায়। তৈরি হয় আত্মীয়তা। কিন্তু অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা বরাবরই থেকেছে বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী হিসাবে। অভিবাসনের চাপ কমাতে ও মধ্যমানের ইংরেজি চলন-বলনে সক্ষম ব্রিটিশ অনুগত এক কর্মঠ শ্রমিকবাহিনী তৈরি করতে খড়গপুর, জামালপুর, আসানসোল, আদ্রা ইত্যাদি বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পনামাফিক অ্যাংলো বসতি নির্মাণ করা হয় কিন্তু কোথাওই তৈরি হতে পারে না তাদের সাত-পুরুষের, ‘স্যুইট হোম’। তাদের আবেদন টিকে থাকে স্মৃতিবেদনায়, ভৌগোলিক পরিখার বাইরে গিয়ে এক সমবেত গৃহসুখের স্বপ্নে।

More Articles