সময় পেরলেও মরচে পড়েনি এতটুকুও, ভারতের এই মন্দিরে আজও রয়েছে পরশুরামের কুঠার

Tanginath Dham Parshuram Axe : সিঁদুর, ফুল লাগানো এই লোহার অস্ত্রটি নাকি হাজার হাজার বছর ধরে এভাবেই এই জায়গায় রয়েছে। মরচে পড়েনি এতটুকুও।

inscript
৩ মিনিট
সময় পেরলেও মরচে পড়েনি এতটুকুও, ভারতের এই মন্দিরে আজও রয়েছে পরশুরামের কুঠার

ভারতের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে সভ্যতার নানা নিদর্শন। রয়েছে নানা ধর্মীয় স্থান, ঐতিহাসিক স্থাপত্য। আর সেরকমই বেশকিছু স্থাপত্য ঘিরে রয়েছে মিথ আর রহস্যের চাদর। সেসবের টানে আজও এই স্থানগুলিতে ভিড় করে সাধারণ মানুষ। সেই কাহিনি শুনলে চোখ কপালে উঠে যায় অনেকের। বাংলার পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ডেও রয়েছে সেরকমই একটি জায়গা। যে মন্দির ঘিরে রয়েছে নানা ইতিহাস, নানা মিথ, আর পুরাণের বর্ণনা।

সেই জায়গায় পা দেওয়ার আগে আরেকজনের সম্পর্কে একটু আলোচনা করা যাক। তিনি পরশুরাম। শাস্ত্র অনুযায়ী, বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম অমর। তাঁর মৃত্যু নেই; আজও তিনি এই পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কথিত আছে, বাবা ঋষি জমদগ্নির আদেশ মেনে তিনি নিজের মা-কে হত্যা করেন। তারপর ঋষি জমদগ্নি খুশি হয়ে বর দিতে চাইলে, তিনি ফের মা-কে জীবিত করার কথা বলেন। পুরাণ বলে, পরশুরামই প্রথম যোদ্ধা ব্রাহ্মণ। তাঁর সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে মহাদেব শিব তাঁকে এই বিশাল কুঠার দিয়েছিলেন। সেই কুঠারই ছিল তাঁর অস্ত্র, তাই দিয়েই শত্রু সংহার করতেন তিনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
৯ ডিগ্রি কোণে হেলানো মন্দির! রহস্যময় এই শিবমন্দির কেন চলে যায় জলের তলে?

Ratneshwar Mahadev Mandir: পিসার হেলানো টাওয়ারটি ৪ ডিগ্রি কাত হয়ে রয়েছে, আর রত্নেশ্বর মহাদেব মন্দিরের হেলে রয়েছে ৯ ডিগ্রি!

শাস্ত্র তো বলে, পরশুরাম অমর। আর তাঁর কুঠার? আজও নাকি সেই লোহার বিশালাকৃতির কুঠার রয়েছে এই দেশে। মাটিতে পোঁতা রয়েছে সেই কুঠার, স্রেফ তার শীর্ষভাগ বেরিয়ে আছে। এর জন্য আপনাকে যেতে হবে ঝাড়খণ্ডের গুমলা জেলায়। রাঁচি থেকে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার দূরের এই জেলাতেই অবস্থিত ডুমরি এলাকার একটি পাহাড়ের ওপর রয়েছে বিশেষ মন্দির। স্থানীয় মানুষ বলেন, এটি বাবা টাঙ্গিনাথ ধাম। মূলত শিবের মন্দির এটি। পাহাড়ের ওপরে গেলে দেখা যাবে, মন্দির চত্বরের বাইরেই অজস্র শিবলিঙ্গ ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি পড়ে রয়েছে। তবে আসল জিনিসটি মূল মন্দিরের ঠিক বাইরেই অবস্থিত।

মন্দিরের বাইরেই একটি জায়গায় মাটির ভেতর পোঁতা বেশ কয়েকটি ধারালো লোহার অংশ। দেখতে অনেকটা ত্রিশূলের মতো। তবে সেই ত্রিশূলের অন্যদিকে একটি সূচালো অংশ বেরিয়ে রয়েছে। যেন কোনও বিশাল বড় কুঠারের তীক্ষ্ণ অংশটির খানিকটা বেরিয়ে আছে। বলা হয়, এটিই নাকি পরশুরামের সেই কুঠার! সিঁদুর, ফুল লাগানো এই লোহার অস্ত্রটি নাকি হাজার হাজার বছর ধরে এভাবেই এই জায়গায় রয়েছে। মাটির ভেতরেও তার অনেকখানই অংশ রয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেবদেবী নয়, পুজো করা হয় ব্যাঙকে! রহস্য-মিথে ভরা ভারতের ২০০ বছরের প্রাচীন এই মন্দির

Frog Temple of India : যেখানে দেবদেবী নন, প্রাধান্য পায় ব্যাঙ! বলা ভালো, ভারতের একমাত্র ব্যাঙের মন্দির!

ঠিক কত লম্বা এই ‘কুঠার’? ভক্তরা বলেন, তার পরিমাপ নাকি এখনও পাওয়া যায়নি। কেউই জানে না এই রহস্য। এই বিশেষ কুঠার বা টাঙ্গি থেকেই মন্দিরের নাম ‘টাঙ্গিনাথ’। তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরেকটি কাহিনি। তবে সেজন্য ফিরে যেতে হবে রামায়ণের যুগে। সেটা ছিল সীতার স্বয়ম্বর সভা। জনকরাজার দরবারে হাজির হয়েছেন বিভিন্ন জায়গার রাজা, রাজপুত্ররা। সেখানেই ছিলেন রামচন্দ্র। স্বয়ম্বর সভাতেই হরধনু ভঙ্গ করে সীতাকে বিয়ে করেন তিনি। এদিকে হয়ে যায় আরেকটি সমস্যা। হরধনু অর্থাৎ শিবের থেকে পাওয়া এই ধনুকটি আদতে পরশুরামের। তিনিই এটি জনকরাজকে দিয়েছিলেন।

এদিকে হরধনু ভেঙে ফেলায় পরশুরাম ভয়ংকর রেগে যান। তিনি সেখানে এলেই সামনে চলে আসেন স্বয়ং লক্ষ্মণ। দুজনের মধ্যেই চলে তীব্র বাদানুবাদ। একটা সময় পর হুঁশ ফেরে পরশুরামের। তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারেন। তারপরই কোনও এক পাহাড়ের উপর তপস্যা করতে চলে যান। তার আগে পাহাড়ের ওপরই তাঁর বিশাল কুঠারটিকে পুঁতে দিয়ে যান। জনশ্রুতি, ঝাড়খণ্ডের টাঙ্গিনাথ ধামই হল সেই জায়গা। তাই আজও কুঠারটি রয়েছে। সেইসঙ্গে ভক্তরা মনে করেন, এই স্থানেই পরশুরাম শিবের আরাধনা করেন। তাঁর পায়ের ছাপ আজও নাকি দেখতে পাওয়া যায়।

এই লোহার কুঠার বা টাঙ্গি নিয়ে বিস্ময়ের শেষ নেই। হাজার হাজার বছর ধরে এভাবে খোলা হাওয়ায়, ঝড়-জলের মধ্যে পড়ে রয়েছে এটি। কিন্তু আজও এক ফোঁটাও মরচে পড়েনি এখানে! পাশাপাশি এই বিশেষ স্থানটিকে নিয়ে রয়েছে অজস্র মিথ। বলা হয়, এই কুঠারটি এর আগে অনেকেই নিয়ে যেতে চেয়েছে। খোঁড়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু যারা করেছে, তাদের কারও নাকি ভালো হয়নি! বলা হয়, একসময় লোহার উপজাতির মানুষেরা এই কুঠারটিকে না নিতে পেড়ে এর একটি অংশ কেটে নিয়ে যায়। তারপর থেকে ওই জাতির একের পর এক মানুষ মারা যেতে শুরু করে। ভয়ে লোহার উপজাতির মানুষেরা এই স্থান বরাবরের মতো ত্যাগ করে। এমনকী, আজও তাঁরা এই তল্লাটের ধারেকাছেও ঘেঁষে না।

সত্যি না মিথ্যে, সেটা জানা যায় না। এই লোককথা, মিথ, রহস্য – এসবই টাঙ্গিনাথ ধামের মাহাত্ম্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পরশুরামের কুঠারও তাঁরই মতো অমর হয়ে আছে ভক্তদের মনে। মহাশিবরাত্রির মেলায় সবাই আসেন এখানে; তিনদিন ধরে চলা মেলায় অংশ নেন। ভারতের মতো প্রাচীন সভ্যতার বুকে এমনই মিথ, রহস্য, পুরাণ আর বাস্তব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ঝাড়খণ্ডের টাঙ্গিনাথের এই মন্দিরে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।