কেউ অ্যাসিড-আক্রান্ত, কেউ রূপান্তরকামী || বইয়ের বদলে মানুষ পড়া যাবে এই লাইব্রেরিতে

কেমন হতো, যদি, অবসর সময়ে চায়ের বা কফির কাপে চুমুক দিয়ে মুখের সামনে বই তুলে পড়ার বদলে আপনি নিজের চিন্তা, ধারণা ‘বই’-কে জানাতে পারতেন? আবার, বইও উল্টে আপনার সন্দেহ দূর করতে পারত, আপনাকে মতামত দিতে পারত, আপনার অনুভূতিগুলোকে বুঝতে পারত? আকাশ-কুসুম কল্পনা মনে হচ্ছে তাই না? এ আবার কখনও সম্ভব ! বই কখনও কথা বলে?

 

আপনারা নিশ্চয়ই ই-বুক, অডিওবুকের নাম শুনেছেন। কিন্তু কখনও এমন ‘বই'য়ের কথা শুনেছেন, যে মানুষের মতো কথা বলে?

 

হিউম্যান লাইব্রেরি, অর্থাৎ মানুষের গ্রন্থাগার, বা বই-মানুষ। নামটা শুনে হয়তো অনেকেই অবাক হবেন, আবার অনেকের কাছে এই কনসেপ্টটা খুবই চেনা-পরিচিত। হিউম্যান লাইব্রেরি নামেই লাইব্রেরি, তবে সেখানে থরে থরে বই সাজানো থাকবে না। যেখানে বইয়ের পরিবর্তে গল্প বলবে মানুষ।

 

আরও পড়ুন: বাঙালির ব্যবসা করতে না পারার দুর্নাম ঘুচিয়ে দিয়েছে একশো ছুঁই ছুঁই বোরোলিন

 

কী এই হিউম্যান লাইব্রেরি, কোথা থেকেই বা এর সূত্রপাত
কমিউনিকেশন একটি শক্তিশালী যোগাযোগের মাধ্যম, যদি সেটা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে আমাদের জীবনের অনেক ফাঁক পূরণে সাহায্য করে। তাই, নিজস্ব জ্ঞান, ধারণা, চিন্তা ইত্যাদি ভাগ করে নেওয়ার প্রাচীন ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে ‘হিউম্যান লাইব্রেরি’। যেখানে বেশিরভাগ লাইব্রেরিতে বই হাত দিয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখার অনুমতি দেওয়া হয়, সেখানে মানুষের গ্রন্থাগারে একজন মানুষকে পরীক্ষা করার অনুমতি দেওয়া হয়। একটি বই পড়ার পরিবর্তে আপনি একটি অনন্য, ইন্টারঅ্যাক্টিভ কথোপকথনে অংশগ্রহণ করবেন, যেখানে আপনার কাছে সুযোগ থাকবে অন্যদের গল্প শোনার- যাদের জীবনধারা আপনার থেকে অনেকাংশে আলাদা।

 

এই হিউম্যান লাইব্রেরির প্রথম পথ চলা শুরু হয় ১৯৯৩ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরে। তখন তাদের নাম ছিল 'Stop the Violence',  যা তাদের এক বন্ধুর হত্যার ঘটনা দ্বারা অনুপ্রাণিত। ২০০০ সালের মধ্যে এই ইভেন্টের ৩০,০০০ সদস্য নথিভুক্ত হয়। এটি একটি অস্থায়ী ইভেন্ট হিসেবে শুরু হয়, যা মাত্র চারদিনের জন্য আট ঘণ্টা করে খোলা থাকত। ডেনমার্কের সাংবাদিক রনি অ্যাবেরগেল, এবং তার ছোট ভাই ড্যানি ও তাদের সহকর্মী আসমা মৌনা এবং ক্রিস্টোফার এরিকসনের সাথে এই অর্গানাইজেশান প্রতিষ্ঠা করেন। আজ থেকে ২২ বছর আগে ২০০০ সালে পুরোপুরি ভাবে তারা 'Stop the violence' কে পরিবর্তিত করে হিউম্যান লাইব্রেরির নাম দেয়। রনির কথায়, "I figured that if we could make people sit down with a group attached to a certain stigma they don’t like or even know about for that matter, we could diminish violence."

 

রনি অ্যাবেরগেলের এই উদ্যোগে অভিভূত হয়ে ভারতে এর প্রসার ঘটানোর পিছনে যে নারীর অবদান মনে রাখার মতো, তিনি হলেন, আন্দালিব কুরেশি, যিনি পেশায় একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আন্দালিবের কথায়, "২০১৪ সালে তিনি যখন প্রথম এই উদ্যোগের ব্যাপারে জানতে পারেন, তখন তিনি কিছুদিনের জন্য তার চাকরি থেকে বিরতি নিচ্ছেন এবং এই উদ্যোগ তার ব্যক্তিগত জীবনেও ছাপ ফেলেছিল‌।" তাঁর কথায়, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভারতীয়দের আরও ভালো জীবনের অভিজ্ঞতার জন্য আরও খোলা মনের হতে হবে এবং কেবল বাইরের রূপ-গুণ দেখে পরস্পরকে বিচার করা উচিত বলে তিনি মানতেন না। সেই চিন্তার ফলেই তিনি মুম্বইতে প্রথম হিউম্যান লাইব্রেরি করার সিদ্ধান্ত নেন, যা মানুষের মন পরিবর্তনের একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।" তিনি বলেন, "প্রথম দিনের রেসপন্স দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। ২০-৬০ বছর বয়সি সকল সম্প্রদায়ের মানুষ বিনা মূল্যে এই ইভেন্টের জন্য সাইন আপ করেছিলেন এবং যা যা ঘটেছিল, তা সকলের মধ্যে থেরাপির কাজ করেছিল।"

 

আন্দালিবের হাত ধরেই ভারতে প্রথম হিউম্যান লাইব্রেরি প্রবেশ করেছিল। তারপর এই সংস্থা ধীরে ধীরে ইন্দোর, তারপর হায়দরাবাদ, দিল্লি, পুনে, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, সুরাত, সেই সঙ্গে কলকাতাতেও প্রবেশ করে।

 

কলকাতা হিউম্যান লাইব্রেরি
২০১৯ সালে প্রথম কলকাতার রাজারহাট-নিউটাউনে এই হিউম্যান লাইব্রেরির আসর বসেছিল। যেখানে পিন ড্রপ সাইলেন্স বা তাক থেকে বই নিয়ে খাতায় এন্ট্রি করার কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না। বরং এখানে মানুষ কথা বলে যেতে পারে অনর্গল। প্রশ্ন করতে পারে সরাসরি। এই হল বই-মানুষ। ঘণ্টাচারেকের জন্য গল্প শোনাতে এসেছিল সমাজের নানা স্তর থেকে আসা মানুষ। এঁদের কেউ সিঙ্গল মাদার, কেউ রূপান্তরকামী, কেউ লড়াই করছেন সমাজের জীর্ণ ধারণার বিরুদ্ধে। এঁরাই বলেছেন আর বলবেন জীবনের গল্প। প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করার গল্প, বিধিনিষেধ পেরোনোর গল্প। আসল জীবন থেকেই তো তৈরি হয় গল্প। তাই কাহিনির থেকে অনেক বেশি জীবন্ত সে।

 

হিউম্যান লাইব্রেরি কলকাতা চ্যাপ্টারের উদ্যোক্তা দেবলীনা সাহা বললেন, "সমাজের চেনা ছক ভাঙতেই এমন উদ্যোগ নিলাম। আমার নিজের কোনওদিন এই লাইব্রেরির অভিজ্ঞতা হয়নি। দেশের নানা শহরে হচ্ছে, আমরা পারব না কেন? বরাবর ট্যাবু ভাঙতে চেয়েছি, এইবার সেই সুযোগ এল। যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা যায় না, সেই গল্প কাউকে তো বলতে হবে।" তাঁর কথায়, "ধরা যাক, কোনও অ্যাসিড-আক্রান্ত মহিলা। তাঁর দিকে তো এখন কেউ ফিরেও তাকায় না। তাঁর কথা কে শুনবে বলুন। তাঁর বাঁচার লড়াইয়ের গল্প, হাসপাতাল থেকে ফিরে আইনি লড়াইয়ের গল্প। তিনিই এই লাইব্রেরির বই। যাঁরা এই লাইব্রেরিতে আসবেন, তাঁদের জীবনটাই একটা গল্পের মতো। এখানে বইয়ের বদলে গল্পকারকে ধার দেওয়া হবে। এই লাইব্রেরিতে তাঁদের পরিচয় শুধু বই। তাঁদের কোনও ব্যক্তিগত জীবন প্রকাশ পাবে না।" দেবলীনা জানালেন, গল্প শোনার পর শ্রোতার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সিদ্ধান্ত একান্ত ‘বই'য়ের থাকবে।

 

কলকাতায় হওয়া প্রথম চ্যাপ্টারে একজন পাঠকের বক্তব্য ছিল, "আমি একজন ‘বই’-এর (সেক্স ওয়ার্কারের) সঙ্গে কথা বলেছিলাম, কিন্তু আমি প্রথমে অতটা উৎসাহী ছিলাম না, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে। পরে, তিনি যখন আমাকে তাঁর জীবনের সমস্ত ঘটনা বললেন, যে তিনি কীভাবে এই পেশায় এসেছেন, তাঁর কীরকম বিপদ ছিল, কী কী চ্যালেঞ্জের তিনি মোকাবিলা করেছেন, তখন আমি বুঝতে পারি, আমি কতটা ভুল ছিলাম। আমি ওঁর সঙ্গে কথা না বললে জানতেই পারতাম না একজন সেক্স ওয়ার্কারের জীবনও কতটা কষ্টের হতে পারে, তাঁরাও তো মানুষ। যখন আমি জাতিগত বিচ্ছিন্নতা, অনার কিলিং এবং দেশে হওয়া নানা জঘন্য অপরাধের কথা জানতে পারি, তখন মনে হয় যে, মানুষ ভুলেই গেছে নিজের জীবনকে সম্মান করার অর্থ, আর অন্যের জীবন তো ছেড়ে দিন।"

 

লাইব্রেরিতে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করলে পাঠককে দেওয়া হবে একটি লাইব্রেরি কার্ড। একজন পাঠক দু'-টি বই বেছে নিতে পারবেন। একজন বই প্রতি সেশনে ৬-৭ জন করে পাঠকের সামনে নিজের কাহিনি তুলে শোনাবেন।

 

হিউম্যান লাইব্রেরিতে মানুষ-ই বই। বৈচিত্র্যময় এই বইয়ের পরতে পরতে উঠে আসে নানা গল্প। কোনও গল্প সামাজিক সংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা, কোনও গল্প পারিবারিক নির্যাতনের। এই গল্প বলার ধরন ভিন্ন, কারণ তাকে গল্প বলার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। এই উত্তর পাঠককে সংস্কারমুক্ত হতে সাহায্য করে, নন-জাজমেন্টাল হতে শেখায়। পুরো হিউম্যান লাইব্রেরির থিমটাই দাঁড়িয়ে আছে নন-জাজমেন্টাল দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করার চিন্তা নিয়ে। এটি একটি ব্যতিক্রমী, কিন্তু যুগোপযোগী ধারণা, যার মাধ্যমে মানুষ তার চারপাশের মানুষ নিয়ে ভাবতে শিখবে। মানুষ তাঁর আশপাশের বৈচিত্র্যময় জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা রাখে না বলেই চিরাচরিত বদ্ধমূল ধারনা দিয়ে মানুষদের বিচার করে। হিউম্যান লাইব্রেরি মানুষকে সেই বৈচিত্র্যকে জানার সুযোগ করে দেয়।

 

আজকের ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমরা সবাই খুব ব্যস্ত, কিন্তু সেইসঙ্গে আমরা একাকীও। প্রাণ খুলে গল্প-আড্ডা-গান সব কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। সেই একঘেয়ে জীবন। এই একাকিত্ব ও একঘেয়েমি থেকে অন্য মোড়কে সবাই ফিরে পেয়েছে নতুন বন্ধু ‘হিউম্যান লাইব্রেরি’-কে। যেখানে ছাপার অক্ষরের বদলে কাঁধে হাত রাখার মানুষ আছে, যে আপনার কথা শুনবে, বুঝবে কিন্তু আপনাকে বিচার করবে না; ঠিক যেন বইয়ের মতো। যদিও এই কনসেপ্টটা এখনও নতুন ভারতের কাছে। তবুও ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে শক্তিশালী সামাজিক কাঠামো গড়তে সহানুভূতি অপরিহার্য, যা হিউম্যান লাইব্রেরির মাধ্যমে সম্ভবপর। আর হিউম্যান লাইব্রেরির স্লোগানই তো হল– ‘Never Judge a Book by its cover’.

 

More Articles

;