বিনা দোষে গেছে প্রাণ! বাংলাদেশে 'চাকরি চাওয়া কি অপরাধ', ছেলেহারা মা-কে উত্তর দেবে কে?

Bangladesh Quota Protest Deaths: পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়তে শুরু করলেও সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর এক হাতে ছিল লাঠি।

inscript
৩ মিনিট
বিনা দোষে গেছে প্রাণ! বাংলাদেশে 'চাকরি চাওয়া কি অপরাধ', ছেলেহারা মা-কে উত্তর দেবে কে?

রাজনীতিতে নেই, আন্দোলনে নেই, কোনও বিক্ষোভেও নেই। তবু প্রাণ গেল শাহজাহানের। বাংলাদেশের ঢাকার শাহজাহান সামান্য এক বিক্রেতা, ফুটপাথেই দোকান। কোটা সংশোধনের আন্দোলনে উত্তাল বাংলাদেশে প্রাণ গিয়েছে ৬ জনের। শাহজাহান তাঁদেরই একজন। মঙ্গলবার দুপুর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় কোটা সংশোধন আন্দোলনে যুক্ত পড়ুয়াদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। আন্দোলনে শামিল না হয়েও, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার দরুন মারধরের শিকার হয়ে দুই যুবকের মৃত্যু হয় সেখানে। তাঁদেরই একজন ২৫ বছরের মহম্মদ শাহজাহান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সন্ধে নাগাদ শাহজাহানকে সিটি কলেজের সামনের রাস্তায় আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখান থেকে তাঁকে উদ্ধার করে পাশের পপুলার মেডিকেল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়ে শাহজাহানকে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয় ঠিকই কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে বসে ডুকরে কেঁদে ওঠেন শাহজাহানের মা আয়েশা খাতুন। ছেলেহারা মায়ের একটাই প্রশ্ন, "আমার ছেলে তো কোনও রাজনীতি করত না। ফুটপাতে ব্যবসা করত। আমার নিরীহ ছেলেকে মারল কে?” উত্তর নেই এই প্রশ্নের। এমন মৃত্যু স্তব্ধ করে দিয়েছে শাহজাহানের স্ত্রী ফাতিহা খাতুনকেও। ঢাকা মেডিকেলে যখন শাহজাহানের দেহ নিয়ে আসা হয়, তখনও তাঁর পরিচয় 'অজ্ঞাতপরিচয় যুবক'। বেশ কিছুক্ষণ মা আয়েশা খাতুন এসে ছেলের লাশ শনাক্ত করেন। বহু ঝড়ঝাপ্টা সয়ে যে ছেলেকে বড় করেছেন তাঁর অকালমৃত্যুতে বিচার চাইছেন পুত্রহারা মা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলাদেশের কোটা ব্যবস্থা ঠিক কী? কেন এর বিরোধিতায় প্রাণ হারালেন পড়ুয়ারা?

Bangladesh Quota System: পড়ুয়ারা কিন্তু সবরকমের কোটা তুলে দেওয়ার পক্ষে নন। জাতিগত সংখ্যালঘু এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য চাকরি সংরক্ষণে সমর্থন রয়েছে তাঁদের।

শাহজাহানের বয়স যখন দুই বছর, তখনই স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় আয়েশা খাতুনের। দুই বছরের ছোট্ট শাহজাহানসহ চার সন্তান নিয়ে আয়েশার জীবনসংগ্রাম শুরু হয়। বুটিকের কাজ করে যে আয় করতেন, তাই দিয়েই সংসার চলত। ছোট ছেলে শাহজাহানের বিয়ে হয় দুই বছর আগে। স্ত্রী ফাতিহা খাতুনকে নিয়ে কামরাঙ্গীরচরে বাড়িভাড়া নিয়ে থাকতেন শাহজাহান, পাশেই একটি বাসায় থাকেন তাঁর মা।

আয়েশা খাতুন জানিয়েছেন, নিউমার্কেটের বলাকা সিনেমা হলের সামনের ফুটপাতে পাপোশ বিক্রি করতেন শাহজাহান। মাস কয়েক আগে ফুটপাত থেকে তাঁদের উঠিয়ে দেওয়া হয়। বেকার হয়ে পড়েন। তারপর ছোটখাটো নানা কাজ করে সংসার চালাচ্ছিলেন। এদিন সকালেও কাজের উদ্দেশেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। দুপুরে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথাও হয় শাহজাহানের। কথা ছিল তাড়াতাড়ি ফিরবেন।

শাহজাহানের স্ত্রী ফাতিহা খাতুন টিভিতে প্রথম গন্ডগোলের খবর দেখেন। দুপুরে স্বামীর সঙ্গে কথাও হয়। তখনও সব ঠিকঠাক। এরপর সন্ধ্যায় আয়েশা খাতুনের মোবাইলে শাহজাহানের নম্বর থেকেই ফোন আসে। অন্য একজন ফোনের ওপ্রান্ত থেকে বলেন, শাহজাহানের মাথায় গুলি লেগেছে। পপুলার মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাঁকে। পরে আয়েশা জানেন, ছেলেকে গুলি করে মারা হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গুলি, রক্ত, মৃত্যু! কোটা আন্দোলনে উত্তাল বাংলাদেশে শহিদ ৬ জন কারা?

Bangladesh Quota Movement: চট্টগ্রামে এই হিংসায় তিনজনের মারা যান। মুরাদপুর থেকে ষোলশহর পর্যন্ত এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষের এই তিনজনের প্রাণ যায়।

গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ (২২)। কোরবানির ইদের ছুটিতে শেষবার বাড়ি ফিরেছিলেন। তারপর বাড়ি ফিরেছে ছেলের লাশ। মা মনোয়ারা বেগম পুত্রহারা, দিশেহারা। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সামনের সারিতে নেতৃত্বে ছিলেন আবু সাঈদ। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে পশ্চিমে ১১ কিলোমিটার দূরে মদনখালি ইউনিয়ন পরিষদের বাবনপুর নালিপাড়া গ্রামে আবু সাঈদের বাড়ি। 'ভালো ছেলে' বলেই চেনে পাড়ার সকলে। 'ভালো ছেলে' তখন মৃত। 'ভালো ছেলে' তখন গুলি খাওয়া লাশ।

মা মনোয়ারা বেগমের আছাড়িপিছাড়ি কান্নার মাঝে ভেসে আসে একটাই প্রশ্ন, "মোর বাবাটাক পুলিশ গুলি কইরা মারল ক্যান? ও তো কাউকে মারতে যায় নাই। চাকরি চাওয়াটা কি অপরাধ?” সারাজীবন কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করেছেন আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন, মা মনোয়ারা। আশা ছিল, ছেলে চাকরি করলে শেষ বয়সে শান্তিতে বাঁচবেন। ছেলের মৃত্যুতে অনাথ হলেন মা-বাবা।

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া আবু সাঈদ ছিলেন কোটা সংশোধন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক। পড়ুয়াদের মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্কের মোড়ে এলে তিনিই ছিলেন সবার আগে। পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়তে শুরু করলেও সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর এক হাতে ছিল লাঠি।

হতদরিদ্র পরিবারে ৯ ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম ছিলেন সাঈদ। রংপুরে প্রাইভেট টিউশনি পড়িয়ে নিজের পড়াশোনা চলতেন, বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখতেন। তাঁর উদ্যোগেই এলাকায় গড়ে উঠেছে, ‘বাবনপুর স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সদস্যরা মাসিক চাঁদা দিয়ে এলাকার গরিবদের বিপদে পাশে দাঁড়ান। সেই নিরীহ আবু সাঈদের দেহ আসে রাতে, বাড়িতে। দরিদ্র, মেধাবী আবু সাঈদ শুধুই 'লাশ' এখন। ২২ বছর, ২৫ বছরের কত কত মৃতদেহের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কোটা আন্দোলন।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।

সিজেপির কর্মসূচির আগে ৬ হাজার পুলিশ, দুর্ভেদ্য দুর্গ কনট প্লেস

Connaught Place protest: সিজেপির কর্মসূচির আগে কনট প্লেস এবং তার আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে দিল্লি পুলিশ। কনট প্লেসের আশপাশে ৬ হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?