ভেসে এল দুটো পাথর, স্বপ্নাদেশে তাই হলো রাধা-কৃষ্ণর মূর্তি! গঙ্গার ঘাটগুলোতে লুকিয়ে যে ইতিহাস

গঙ্গার ঘাটের চেহারা বিভিন্ন জায়গায় আলাদা। মনে হতেই পারে, গঙ্গার বিভিন্ন রূপ হতে পারে, সেটা ভূগোল বই পড়ে বোঝা যায়, কিন্তু ঘাট আবার আলাদা হবে কী করে? সব ঘাট দেখতে তো একইরকম। সিমেন্টে বাঁধানো একটা জায়গা, কয়েকটা সিঁড়ি আর দুই একটা নৌকো বাঁধা। কিন্তু আদতে ঘাট স্থানবিশেষে কিছুটা আলাদা হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে কিছুটা বদলে গেলেও গঙ্গার ঘাটগুলো নিজস্ব ইতিহাস, রূপ আর না-বলা অসংখ্য গল্প নিয়ে চুপ করে বসে থাকে।

 

গঙ্গার ঘাটের নামের মধ্যেই অনেক ইতিহাস এবং অজানা গল্প লুকিয়ে থাকে। জমিদার এবং রানি রাসমনির স্বামী বাবু রাজচন্দ্র দাসের নাম থেকে বাবুঘাট, সম্রাট অশোকের শিলালিপির পাঠোদ্ধারকারী জেমস প্রিন্সেপের নামে প্রিন্সেপ ঘাট এখনও ইতিহাসের গল্প বলে। আর্মেনিয়া দেশের মানুষের নামে আর্মেনিয়ান ঘাটের নাম শুনলে মনে হতেই পারে যে, কলকাতায় তো ব্রিটিশদের শাসন ছিল, তাহলে ব্ল্যাক আর হোয়াইট টাউন ছেড়ে গ্রে টাউনে থাকা এই আর্মেনিয়ানরা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? সেটা কি শুধুই ব্রিটিশ এবং ধনী বাঙালিদের ব্যবসা এবং অন্যান্য কারণে সুদে টাকা ধার দেওয়া এবং তার ফলে দুই পক্ষের সঙ্গে সখ্যর পুরস্কার? লোকমুখে শোনা যায় যে, কুমোরটুলির প্রতিমা তৈরির জন্য নৌকো করে বিচালি আসত। তাই বাগবাজারের একটি ঘাটের নাম বিচালি ঘাট।

 

গঙ্গার ঘাটের নামের খেলা কিন্তু শুধু কলকাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। খড়দহের শ্যামসুন্দর ঘাটের নাম বেশিরভাগ মানুষ জানেন না। জানা যায় যে, বহু বছর আগে একটা খড়ের গাদায় দুটো পাথর এই ঘাটে ভেসে এসেছিল। স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেই পাথর থেকেই রাধা-কৃষ্ণের মূর্তি এবং মন্দির তৈরি হয়। জনশ্রুতি এটাই যে, খড়দহ এবং শ্যামসুন্দর ঘাট সেই ঘটনা থেকেই নিজেদের পরিচয় পায়। এই এলাকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খুব পছন্দের জায়গা ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ঘাটের কাছেই তাঁর বাগানবাড়ির স্মৃতিফলক দেখে। এই ঘাটে যাওয়ার রাস্তায় ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের বাড়ি দেখা যায়। খড়দহের রাসখোলা ঘাটের নামের অবশ্য তার কাছেই বিশাল রাসমঞ্চ দেখে সহজেই অনুমান করা যায়। কাঁকিনাড়া থেকে নৈহাটি যাওয়ার পথে ভাটপাড়া কালীমন্দির ঘাট বা বলরাম সরকারের ঘাট প্রায় সমান অবাক করা একটি অচেনা ঘাট। ঘাট-লাগোয়া কালীমন্দির থেকে কালীমন্দির ঘাট নাম হয়েছে, এই কথাটা মানতে খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা না, কিন্তু বলরাম সরকার কে? ভাটপাড়া অথবা তখনকার হিসেবে ভট্টপল্লী মানে ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণদের পল্লিতে এই সরকার কীভাবে এত প্রভাব বিস্তার করলেন সে ব্যাপারে কেউই প্রায় কিছুই বলতে পারে না। লালবাগানের দুর্গাচরণ রক্ষিতের তৈরি চন্দননগরের জোড়া ঘাট ছবি দেখে চন্দননগরের স্ট্র্যান্ডের একটা ঘাট হিসেবে প্রায় সবাই চিনতে পারলেও নাম হয়তো জানে না। দেওয়ান দুর্গাচরণ বা তাঁর তৈরি জোড়া ঘাটের আসল কাঠামো আজ নেই। যদিও বর্তমান যে কাঠামো আমরা দেখতে পাই, সেটা অবিকল আসল কাঠামোর মতো তৈরি করা হয়েছে।

 

আরও পড়ুন: শিখতেন স্বামী বিবেকানন্দও, কেমন আছে বাঙালির কুস্তির আখড়াগুলো?

 

গঙ্গার পাড়ের এই প্রত্যেকটা ঘাটের নিজস্ব এবং আলাদা রূপ আছে। বিকেলে দ্বিতীয় হুগলি সেতুর কাছের ঘাটে বসে সূর্যাস্ত দেখা অথবা সন্ধের আলোঝলমলে বাঁধানো রাস্তার প্রিন্সেপ ঘাট থেকে দূরে হাওড়া ব্রিজ দেখা থেকে শীতের দুপুরে ভাটপাড়ার শান্ত গঙ্গার ঘাটে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে গল্প করার মধ্যে সেই রূপ খুঁজে পাওয়া যায়। ভাটপাড়ার কালীমন্দির ঘাট থেকে গঙ্গার মাঝে একটা বিশাল চরা দেখতে পাওয়া যায়। বহু বছর ধরে পলি জমে এই চরা তৈরি হয়েছে। এলাকার বয়স্ক মানুষরা বলেন যে, তাঁরা নাকি ছোটবেলায় ডুবসাঁতার দিয়ে ওই চরা অবধি যাওয়ার প্রতিযোগিতা করতেন। শীতকালে জল কম থাকার দরুন নৌকো ভাড়া করে ওই চরায় বনভোজন করা হতো। এখন সবকিছুই প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমাদের চোখে দেখে গুরুত্বহীন, আগাছাপূর্ণ ওই চরা কিছুক্ষণের জন্য সেই বয়স্ক মানুষগুলোকে নিজেদের ছোটবেলা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। চন্দননগরের জোড়া ঘাটের কাছে গঙ্গার ওপরে সম্প্রসারিত অংশের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সুবিশাল, শান্ত, গভীর নদী দেখে যে অনুভূতি হয় উত্তরপাড়া এবং হিন্দমোটরের মাঝে সবুজ ঘাসে ঢাকা এক নাম না-জানা ঘাটে গঙ্গার ভাঙন দেখে তার বিপরীত অনুভূতি হলেও দুটোই যেন নিজের মতো করে সুন্দর। খড়দহ রাসখোলা ঘাটের কাছে দোল খেলা থেকে সন্ধেবেলায় বাগবাজার ঘাটে বসে ঘটিগরম খাওয়ার মধ্যে আনন্দ কোথাও কম হয়নি।


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদল হলেও গঙ্গার ঘাটের ভূমিকা সম্ভবত বছরের পর বছর একই থাকবে। মানুষ আসবে, যাবে গঙ্গার ঘাট চুপ করে বসে তাদের গল্প শুনবে আর জমিয়ে রাখবে ।

More Articles

;