পাড়ার সেইসব নববর্ষের সন্ধে ছিল ইন্দ্রজালের মতো

Debshankar Haldar
৩ মিনিট
পাড়ার সেইসব নববর্ষের সন্ধে ছিল ইন্দ্রজালের মতো

পয়লা বৈশাখ হোক, পয়লা জানুয়ারি হোক, পুজোআচ্চা হোক বা গরমের ছুটি- আমাদের ছোটবেলায় পুরো পাড়া মুখিয়ে থাকত যাতে এসব পার্বণের দিনে আমরা পাড়ায় থিয়েটার করতে পারি। যেহেতু আমাদের বাড়িতে একটা নাটকের চর্চা ছিল, আমার বাবা যেহেতু অভিনেতা ছিলেন, ফলত, আমরা চার ভাইই নাটকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম। আমরা পাড়ায় একাধিক থিয়েটার করেছি, একাধিক সময়ে। বছরে অন্তত চার-পাঁচবার তো বটেই! তার মধ্যে অবশ্যই পয়লা বৈশাখও ছিল। আমাদের সময় তো পরীক্ষা অনেক আগে হয়ে যেত, ডিসেম্বর মাস নাগাদ। ফলে এই সময়টা একটা মেজাজ থাকত, ছুটির মেজাজ, পরীক্ষার চাপহীন মেজাজ। হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার একটা ব্যাপার ছিল বটে, কিন্তু সেটাকে আমরা অত পাত্তা দিতাম না।

এই যে আমাদের চেনা মাঠটা আস্তে আস্তে পালটে যাচ্ছে, সেখানে বাঁশ পড়ছে, মঞ্চ তৈরি হচ্ছে, এবং সেই মঞ্চ নির্মাণের সাক্ষী থাকছি আমরা, আমরা এক জায়গায় মহড়া দিচ্ছি, এবং একদিন ওই মঞ্চের ওপর উঠে নাটক করছি- এই যে আমার চৌহদ্দির মধ্যেই আমি সবটাকে পালটে ফেলে পয়লা বৈশাখের এমন সন্ধেবেলায় মেতে উঠছি- এটা আমাদের কাছে একটা ইন্দ্রজালের মতো, ম্যাজিকের মতো ছিল! সেইসব সন্ধেগুলো মোহময় ছিল আমাদের কাছে।

আমাদের পরের প্রজন্মও এমন করে নাটক করেছে, কিন্তু সময় যত অতিক্রান্ত হল, তত ধীরে ধীরে এই ম্যারাপ বেঁধে নিজের চৌহদ্দির মধ্যে নাটক করা, এটা একটু পালটে গিয়ে কাছাকাছি কোনও অডিটোরিয়ামে অভিনয় হওয়া শুরু হল। আমার পাড়া যেখানে, পাইকপাড়া, তার কাছে ছিল হাতিবাগানের মঞ্চগুলো বা সাধারণ রঙ্গালয়গুলো। সেখানে অনেক অনুষ্ঠান হতে দেখেছি। সেটাও যে মন্দ লাগত, তা বলব না। তখন ঝড়বৃষ্টি-কালবৈশাখীর কারণে আমাদের পাড়ায় জলও জমত, ফলে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানগুলোতে একটু সমস্যা হত। সেজন্য কেউ কেউ মঞ্চে চলে গেলেন। কিন্তু সেই মঞ্চ তো অন্য পাড়ায়, তা যেন ঠিক নিজের বলে মনে হয় না। এতদসত্ত্বেও সেসব দিনগুলো খারাপ ছিল না।

তবে এই যে একটু দূরে চলে গেল বিষয়টা, পাড়ার বাইরে চলে গেল, এই যেন আরও দূরে যাওয়ার শুরু। পরে দেখলাম, পাড়ার এই অনুষ্ঠানগুলো যেন আমাদের মন থেকেই হারিয়ে গেল। এই যে আমরা যারা খাচ্ছি-দাচ্ছি, চকচকে ব্লেডে দাড়ি কামাচ্ছি, ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাচ্ছি- সেই আমরা যে কখনও কখনও একজন অন্য মানুষ হয়ে উঠে সেটিকে প্রকাশ করতে পারি নাটকের মধ্যে, আমার প্রতিদিনের যে চেহারা, তার বাইরে গিয়ে- এই ইচ্ছেটাই পাড়ার ছেলেমেয়ে এবং তাদের অভিভাবকদের মন থেকে হারিয়ে গেল। তার নানাবিধ সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কারণ আছে, হয়তো। কিন্তু মোদ্দায় দেখলাম, সেগুলো কেমন যেন উধাও হয়ে গেল। সেই হওয়াটা প্রথমদিকে বেশ যন্ত্রণা দিয়েছে বটে, কেন আগের মতো পাড়ার নাটক হয় না, এগুলো আমরা বলতাম-টলতাম, কিন্তু নিজেরাও তেমন কিছু আয়োজন করতে পারিনি। কিংবা মনে হয়েছে, কালের নিয়মে এমনটা ঘটাই স্বাভাবিক। বরং সেই সন্ধেতে টেলিভিশনের কোনও অনুষ্ঠানের দিকে মানুষের আকর্ষণ চলে গেল। বাড়ির বাইরের অনুষ্ঠান যে কেউ কেউ করেনি, তা নয়, কিন্তু সেখানে ততটা উৎসাহ দেখা গেল না।

কিন্তু এরপরেও একটা আশাব্যঞ্জক কথা বলতে পারি। আমি কিন্তু বেশ কয়েকবছর যাবৎ দেখছি, আমাদের পাড়ায় আবার বেশ কিছু জলসার আয়োজন হচ্ছে। হয়তো মঞ্চটা আগের চেয়ে অন্যভাবে বাঁধা হচ্ছে, হয়তো অনুষ্ঠানের চরিত্র পাল্টেছে, কিন্তু আমি দেখছি, এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বসন্ত উৎসব করছেন, কখনও কখনও দেখছি তাঁরা পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে গানবাজনা করছেন, কিন্তু নাটক হয়তো সবসময় করে উঠতে পারছেন না। নাটক করতে গেলে যে একটা দীর্ঘমেয়াদি যূথবদ্ধতার অনুশীলন চাই, সেই সময়টা, এবং সেই মানসিকতাটা, আমার ধারণা, এখনও আবার নতুন করে তৈরি হয়নি, সেই চেতনাটা হারিয়েছে। একসঙ্গে থাকা, একে অন্যকে মূল্য দেওয়া- যেটা থিয়েটারের অন্যতম দাবি- তার কিঞ্চিৎ অভাব এইসময়ে রয়েছে। হয়তো ফেরত আসবে, এই যে পয়লা বৈশাখে গান এবং নাচ ছেলেমেয়েরা করছেন, সেটা হয়তো তাদের আবার নাটকের দিকে ঠেলে দেবে।

অতিমারী আমাদের যে দূরে দূরে থাকা শিখিয়েছে, তার উল্টোদিকে যে বেঁধে বেঁধে থাকা, শঙ্খ ঘোষের ভাষায় বলতে গেলে, তার মজাটাও কিন্তু মানুষ আবার আস্বাদন করতে চাইছেন। তাই হয়তো আবার পাড়ার আয়োজনগুলো ফিরে ফিরে আসছে, অন্তত আমার পাড়ায় তো তাই দেখছি।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।