ভাষার মারপ্যাঁচে গলদঘর্ম বাঙালির! জানেন কি চেয়ার-টেবিলের বাংলা প্রতিশব্দ?

Bengali Language : ইংরেজির দাপটে হারাচ্ছে প্রকৃত বাংলা শব্দ

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
ভাষার মারপ্যাঁচে গলদঘর্ম বাঙালির! জানেন কি চেয়ার-টেবিলের বাংলা প্রতিশব্দ?

ধরা যাক আপনাকে কেউ বলল, মেজ থেকে অমুক বইটা এনে দিতে, তবে হয়তো আপনার অবস্থা হবে খানিক অপ্রস্তুত। খানিক অন্ধের মতো হাতড়ে মরা ছাড়া উপায় তো নেই! এবার ধরুন কেউ বললো, কুর্সিতে গিয়ে বসতে। ব্যাস আবারও পড়লেন মহা বিপদে। সারা বাড়িতে একটা কুর্সি কোথায় মিলবে তা খুঁজতে গিয়ে অনেকখানি ঘাম ঝরিয়ে ফেললেও কুর্সির তো দেখা নেই। অথচ প্রশ্নকর্তা বারবার বলছেন সামনেই আছে! হ্যাঁ ঠিকই বলছেন প্রশ্ন কর্তা। আমার আপনার বাড়িতে একেবারে চোখের সামনেই রয়েছে মেজ আর কুর্সি। কেবল আজকের বাঙালিদের কাছে সেসব অধরা। অথচ ইংরেজি প্রতিশব্দ বললেই কপাল চাপড়ে বলবেন হয়তো, ‘ইস!’

কী খুব জানতে ইচ্ছে করছে তো নামগুলো? ধাঁধার উত্তর খুবই সহজ। যে বইটা আপনাকে আনতে বলা হয়েছিল সেটি রয়েছে ঘরের টেবিলে আর আপনাকে বসতে বলা হয়েছিল চেয়ারে। শুধু একটু বাংলায় বলা হয়েছিল এই যা! তাতেই গলদঘর্ম অবস্থা। চেয়ার আর টেবিল শব্দ দুটি ইংরেজি হলেও এমনভাবেই বাংলা অভ্যাসে জাঁকিয়ে বসেছে যে তার দাপটে মুখ লুকিয়েছে খোদ বাংলা অভিধান। চেয়ারের ওপর একটি বাংলা প্রতিশব্দ হল কেদারা, যদিও সেটি কালেভদ্রে ব্যবহার করেন কেউ কেউ তবে কুর্সি আর মেজ শব্দদুটো একেবারেই হারিয়ে গিয়েছে চিরাচরিত অভ্যাস থেকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলা ভাষা একটি চব্বিশ ঘণ্টার বিনোদন প্যাকেজ

International Mother Language Day: তিরিশ বছর আগেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি ভালো স্কুল বলতে বুঝত হিন্দু, হেয়ার, বেথুন, বালিগঞ্জ কি উত্তরপাড়া গভর্নমেন্ট, পুরুলিয়া কি নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন ইত্যাদি বহু প্রতিষ্ঠানকে

বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলে বাংলার নম্বরটা কম দেখে ছাত্রের মা হঠাৎ এক গুরুতর প্রশ্ন করে বসলেন, “স্কুলে কেন বেঙ্গলিটা পড়ায় না ইংলিশে?” - কবি অপূর্ব দত্তের ‘বাংলা টাংলা’ কবিতার এই শেষ পংক্তিটি যেন আজকের সময়ের এক জীবন্ত দলিল। সময়ের স্রোতে ধাক্কা খেতে খেতে আমরা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যে সময়ে এ প্রশ্ন মোটেই আর অবাক করায় না আমাদের! পথে-ঘাটে এখন ইংরেজি বলাই দস্তুর। ‘ইংরেজি সুইট, সাইন্টিফিক’, একথা মনে করেন অভিভাবকরাও। সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তি করাতে না পারলে জীবন তো বৃথা! তাই ছোট থেকে ইংরেজি গেঁথে দেওয়া হচ্ছে মর্মে মর্মে। কিন্তু এসবের মধ্যেই হারিয়ে যাচ্ছে অনেকে। অনেক অনেক বাংলা শব্দরা আজ অস্তাচলে। দুম করে যদি সেই বাংলা শব্দগুলো বলে বসেন কেউ, তবে রীতিমত চোখ কপালে উঠবে বাঙালিরই।

ভাষা হল বহমান স্রোতের মতো। জীবনের নিয়ত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভাষাও বদলে বদলে যায়। বদলে যায় ভাষা ব্যবহারের অভ্যাসও। পরিবেশ পরিস্থিতির দায়ও এক্ষেত্রে অনেকখানি। তবে যে কোনও ভাষাতেই অন্য ভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এমন অনেক শব্দই অভিধানে যোগ হয় যা একেবারেই ভিন্ন ভাষার। বাংলাও ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন সময়ে যেসব দেশ এখানে উপনিবেশ স্থাপন করেছেন তাদের বেশি কিছু শব্দও রেখে গিয়েছেন এখানে। ফরাসি, পর্তুগিজ, চিনা শব্দেরা প্রায়শই তাই ঘোরাফেরা করে আমাদের চোখের সামনে। কিন্তু ইংরেজির দাপট একেবারেই আলাদা। আধুনিক হতে গিয়ে ভাষার ওপর যে হতে প্রভাব পড়ছে তাতে বাংলাভাষার চোখে জল আসে স্বাভাবিক।

তবে চেয়ার এবং টেবিল এই শব্দদুটোর ব্যবহার বাংলায় অনেক আগে থেকেই। মেজ-কেদারা ছেড়ে অনেকদিন হল বাঙালিরা চেয়ার টেবিল বসছে। ইউরোপীয় ভাষার শব্দভাণ্ডার থেকে প্রবেশ করার পর আমাদের কথ্য ও লিখিত ব্যবহারে এই দু’টি শব্দ বাংলাই যেন হয়ে গিয়েছে এখন। শুধু তাই নয় সাহিত্যের ভাষাতেও লেখক ভুলেও ব্যবহার করেন না মেজ-কেদারা-কুর্সির মতো শব্দগুলি। পুরনো কিছু পুঁথি ঘেটে হয়তো খুঁজে পেতে পারেন তবে আজকের বাংলা সাহিত্যে? নৈব নৈব চ!

কালের স্রোতে বিলীয়মান কুর্সি, কেদারা, মেজ-এর মতো শব্দগুলি। পরিবর্তে চেয়ার, টেবিল বলতেই আমরা স্বচ্ছন্দ। এখানেই ভাষার বহমানতা। তবে বাংলা ভাষার চোখের জল মোছানোর দায় কি নেই কারোর? এ যুগের বিদ্যাসাগর হওয়ার দায় নেবে কে! তাই ইউনেস্কোর তরফে ২০১০ সালে বাংলা ‘পৃথিবীর সব চেয়ে মিষ্টি ভাষা’-র স্বীকৃতি পেলেও তার ব্যবহারে বাঙালিরই এত অনীহা দেখে আশঙ্কাই হয়, এই বুঝি বাংলা ভাষাকে তারা পুরোপুরি কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঝেড়ে ফেলে দিল।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।