একজন খুনি, বারো জন বিচারক! বাংলা নাট‍কের দর্শককে ভাবাবে 'এক থেকে বারো'

Bengali Theatre: একটি খুন ও খুনিকে কেন্দ্র করে বারো জন জুরির বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে এই নাটক আবারও বাংলা নাট্যমঞ্চ মাতাতে প্রস্তুত।

Rajarshi Dhara
৪ মিনিট
একজন খুনি, বারো জন বিচারক!  বাংলা নাট‍কের দর্শককে ভাবাবে 'এক থেকে বারো'

'নান্দীকার' তথা বাংলা থিয়েটারে একটা দীর্ঘ সময় অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত। কেবল অভিনয় নয়, নির্দেশনা, নাট্য-সংগীত এবং নাট্যরচনায় অবাধ বিচরণের সাক্ষী আপামর নাট্যপ্রেমী বাঙালি তথা নাট্যপ্রেমী ভারতীয়। ২০২১ সালে স্বাতীলেখার প্রয়াণের পর নান্দীকার-এর যাত্রাপথ ছিল কিছুটা বিক্ষিপ্ত। নান্দীকার তাদের পুরনো প্রোডাকশন, যেমন ‘মানুষ’ বা ‘মাধবী' (স্বাতীলেখা নির্দেশিত) অভিনয় করেছে কিছুবার, তবে নান্দীকার এই সময়কালে কোনও নতুন প্রযোজনা নিয়ে মানুষের কাছে আসেনি। এবার যখন তারা নতুন অভিনয় নিয়ে মঞ্চে ফিরলেন, সেই নতুন প্রোডাকশনটিও হলো সম্পূর্ণ 'Out of the box'.

গত শতকের নয়ের দশকে একটা সময় স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত শারীরিক কারণে থিয়েটার থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই সময়কালে তিনি রেজিনাল্ড রোজ রচিত বিখ্যাত আমেরিকান টিভি নাটক ‘12 Angry Men’ বাংলায় অনুবাদ করেন। তৎকালীন নান্দীকারের তরুণরা সেটি অভিনয়ও করে।স্বাতীলেখার প্রয়াণের পর ওঁর জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করতে গিয়ে সপ্তর্ষি মৌলিক এই নাটকটির স্ক্রিপ্ট নতুন করে খুঁজে পান এবং তার থেকেই গড়ে ওঠে নান্দীকারের নবতম প্রযোজনা ‘এক থেকে বারো’।

মূল আমেরিকান নাটক ও তার বহু অনুবাদেই পাওয়া যায়, নাটকটির মূল চরিত্রসংখ্যা ১২ এবং ১২ জনই পুরুষ। কিন্তু নান্দীকারের নাটকে সেই সংখ্য ৯ জন পুরুষ ও ৩ জন নারী। একে বাস্তবের মাটিতে কর্মক্ষেত্রে পুরুষ-মহিলা অনুপাত ৯:৩-এর প্রতিরূপ হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে।

‘এক থেকে বারো’ দিয়ে নান্দীকারে তথা বাংলা থিয়েটার জগতে এক নতুন পরিচালকের পদার্পণ ঘটল। তিনি সপ্তর্ষি। সপ্তর্ষি একাধারে সুদক্ষ অভিনেতা তো বটেই, তার সঙ্গে নাটককারও বটে। এবং এই নতুন (নির্দেশকের) ভূমিকায় তিনি যে সমানভাবে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তা যাঁরা নাটকটি দেখেছেন, তাঁরা একবাক্যে স্বীকার করবেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হিংসাই শেষ কথা নয়! স্বাধীনতার ইতিহাসকে অন্য চোখে দেখাবে 'দিল্লি চলো'

Theatre Review: 'নাট‍্য আনন'-এর 'দিল্লি চলো' প্রসঙ্গে কী বলছেন অভিনেতা ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়?

একটা কথা এখানে অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই, এই নাটককে নাট‍্য হতে অনেকটা সাহায্য করেছে স্বাতীলেখা অনূদিত টেক্সটটি। নাটকটিকে text হিসেবে দেখলে কখনওই মনে হয় না এটি একটি বিদেশি নাটকের অনুবাদ, বরং অনেকাংশে মনে হয় নাটকটি আবার পুনর্গঠন করেছেন স্বাতীলেখা তাঁর ভারতীয় মনন দিয়ে। এখানে নাটকের আখ্যান নিয়ে বেশি কথা বলব না, যদিও যাঁরা মূল টিভি নাটকটি দেখেছেন, তাঁরা গল্পটির চলনের সঙ্গে পরিচিত।

নাটকটি আজকের সময়ে মঞ্চস্থ হওয়া আলাদা তাৎপর্য যোগ করে। আজ যে সময় ও সমাজব্যবস্থায় বসবাস করছি বা করতে বাধ্য হচ্ছি আমরা, সেখানে প্রত্যেকে খুব রেগে আছে। সেখানে কিছু জন শিক্ষা ও রুচির অজুহাতে সামাজিকতা ও শালীনতার মুখোশ পরে থাকে আর কিছু জন যেখানে-সেখানে নিজেদের রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেগুলো অযৌক্তিকভাবে ভুল জায়গায় হয়)। এই রাগের অনবরত বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখে চলেছি সোশ্যাল মিডিয়া নামক সার্কাসের মঞ্চে। ঠিক একইভাবে এই নাটকের ১২টি চরিত্রই রেগে। বিভিন্ন কারণে রেগে, তাদের রাগের ভঙ্গিও পৃথক, তবে সবাই প্রচণ্ড রেগে। এই কমন রাগটাই আজকের সময়ে নাটকটিকে আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক করে দেয়।

নান্দীকারের এই মুহূর্তে যে তরুণ গ্রুপটি কাজ করছে, আমি এই গ্রুপটিকে (সাধন পাড়ুই-কেও সংযুক্ত করে) একটি স্বয়ংক্রিয় ইউনিট হিসেবে দেখি। সেট (অয়ন), আবহ (সপ্তর্ষি ও অর্ঘ্য), প্রযোজনা নিয়ন্ত্রণ (অনিন্দিতা), সহ-নির্দেশনা (অর্ঘ্য), আলো (সাধন), নির্দেশনা- পুরো ব্যাপারটাই এই স্বয়ংক্রিয় ইউনিট দ্বারাই পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। এবং এঁরা প্রায় প্রত্যেকেই নান্দীকারের অভিনেতা, যাঁরা এই নাটকে অভিনয় করছেন। এর সঙ্গে ‘এক থেকে বারো’-তে এমন অনেকে অভিনয় করেছেন, যাঁরা নান্দীকার থিয়েটার ওয়ার্কশপ থেকে উঠে আসা এবং যাঁরা জীবনে প্রথমবারের জন্য মঞ্চে অভিনয় করছেন। এটিও বাংলা থিয়েটারের একটি বড় পাওয়া।

‘এক থেকে বারো’ নাটকটির এমন একটি দিক আছে, যা একাধারে যেমন সুবিধার দিক, একই সঙ্গে অসুবিধারও। প্রথমে সুবিধার কথাটা বলি, এই নাটকের ঘটনাপ্রবাহ একটিমাত্র রাত্রে একটিইমাত্র ঘরের মধ্যে ঘটে চলে। এই স্থান ও কালের কোনও প্রভেদ না থাকায় নাটকটির থিয়েটার হিসেবে গড়ে ওঠা সহজ হয়। কিন্তু এই ব্যাপারটাই এর অসুবিধার দিকও হয়ে উঠতে পারত। ২০২২-এর দর্শক অনেকটা পরিবর্তিত, প‍্যানডেমিকের পরে তো আরওই, এক্ষেত্রে কোর্টরুম আর ড্রইংরুম ড্রামার মিশেলে এই নাটক দর্শককে কতখানি ধরে রাখতে পারবে- তা নিয়ে একটা সংশয় দেখা দিচ্ছিল মনে। তবে এই কৃতিত্ব নির্দেশক ও প্রত্যেক অভিনেতার যে, তাঁরা দর্শকদের মনের সঙ্গে সুতোটা ঠিকঠাকভাবে গেঁথে রাখতে পেরেছেন। যখন চরিত্ররা মানসিকভাবে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করছে তখন দর্শকদের উচ্ছাস আর প্রতিক্রিয়া দেখেই অভিনেতাদের দর্শক ধরে রাখার সফলতা আঁচ করা যায়।

এই নাটকের দু'টি বিষয় নিয়ে আলাদা করে কথা বলতেই হয়, প্রথমটি অর্ঘ্য দে সরকারের অভিনয়। তিনি যে চরিত্রটিতে অভিনয় করছেন, সেটি তাঁর নিজস্ব বয়সের থেকে অনেকখানিই বেশি। তবে তাঁর শরীরী অভিনয়, তাঁর বাচনভঙ্গি ও অভিব্যক্তি এতটাই যথাযথ যে, তা বহুদিন মনে থেকে যেতে বাধ্য। দ্বিতীয়টি হলো, মঞ্চনির্মাণে দাবার ছকের মতো দেখতে একটি কার্পেটের ব্যবহার, যে কার্পেটটি মঞ্চ থেকে নেমে আসে অডিটোরিয়ামের মেঝেতে। ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, সাদা-কালোর এই দ্বন্দ্ব কার্পেটের মাধ্যমে আলাদা মাত্রা পেয়েছে এই নাটকে।

একটি খুন ও খুনিকে কেন্দ্র করে বারো জন জুরির বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে এই নাটক আবারও বাংলা নাট্যমঞ্চ মাতাতে প্রস্তুত। বিগত কিছু অভিনয়ে এই নাটক বাংলা থিয়েটার দর্শকের মনে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, তা যথাযথই নান্দীকার-সুলভ।

লিখেছেন
Rajarshi Dhara
Rajarshi Dhara
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।